বাংলাদেশে শ্রমজীবী মানুষের অধিকার ও সম্মান বেড়েছে—কিন্তু তা এখনও প্রত্যাশার তুলনায় অনেক ধীর, অসম এবং খণ্ডিত অগ্রগতি। আইন ও নীতিতে বড় কিছু ইতিবাচক পরিবর্তন এলেও বাস্তবে মজুরি, নিরাপত্তা ও সামাজিক সম্মানের ঘাটতি এখনও প্রকট।
১৮৮৬ সালের ১ মে যুক্তরাষ্ট্রের শিকাগোতে আট ঘণ্টা কর্মদিবসের দাবিতে ব্রিটিশ সমাজসংস্কারক রবার্ট ওয়েনের “আট ঘণ্টা কাজ, আট ঘণ্টা বিনোদন, আট ঘণ্টা বিশ্রাম” স্লোগানকে সামনে রেখে প্রায় ৪০ হাজার শ্রমিক আন্দোলন শুরু করেন। পরবর্তীতে পুলিশ–শ্রমিক সংঘর্ষে হতাহতের ঘটনার প্রতিবাদে ৪ মে হেমার্কেট স্কয়ারে সমাবেশে এক অজ্ঞাত ব্যক্তির বোমা নিক্ষেপে ৭ পুলিশ ও কয়েকজন বিক্ষোভকারী নিহত হন; ইতিহাসে এটি হেমার্কেট ম্যাসাকার নামে পরিচিত। প্রমাণের আগেই কয়েকজন শ্রমিক নেতার মৃত্যুদণ্ড শ্রমিক আন্দোলনকে বিশ্বব্যাপী নাড়িয়ে দেয়। এই ঘটনার স্মরণে ১৮৮৯ সালে আন্তর্জাতিক শ্রমিক নেতাদের কংগ্রেসে ১ মে-কে আন্তর্জাতিক শ্রমিক দিবস ঘোষণা করা হয়, যা আজ বিশ্বজুড়ে শ্রমিকের অধিকার, সংগ্রাম ও অর্জনের প্রতীক হিসেবে পালিত হচ্ছে।

আইন ও নীতিতে অগ্রগতি, বাস্তবে ফাঁক
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে শ্রম অধিকারকে ঘিরে নীতিগত পরিবর্তন হয়েছে সবচেয়ে বেশি। নতুন শ্রম আইন ও সংশোধনীগুলোতে কিছু গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি দেখা যায়। জাতীয় সংসদে “বাংলাদেশ শ্রম (সংশোধন) বিল—২০২৬” পাস হয়েছে, যার লক্ষ্য শিল্পখাতের অস্থিরতা কমানো এবং শ্রমিকদের অধিকারকে সুসংহত করা। এই আইনে গৃহকর্মী, কৃষিশ্রমিক ও নাবিকদের শ্রম আইনের আওতায় এনে তাদের অধিকারকে আইনি স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে। নতুন শ্রম আইন ২০২৬–এর মাধ্যমে ট্রেড ইউনিয়ন গঠনের শর্ত কিছুটা শিথিল, যৌথ দরকষাকষি ও প্রতিনিধিত্বের বিধান শক্তিশালী এবং কর্মক্ষেত্রে নিরাপত্তা, সামাজিক সুরক্ষা, মাতৃত্বকালীন সুবিধা ও ক্ষতিপূরণের বিধান আরও স্পষ্ট করা হয়েছে। নীতির দিক থেকে শ্রমজীবী মানুষের অধিকার আজ থেকে ১০–১৫ বছর আগের তুলনায় শক্ত ভিত্তিতে দাঁড়িয়েছে, কিন্তু প্রশ্ন থেকে যাচ্ছে বাস্তবায়ন কতটা হচ্ছে এবং এতে শ্রমজীবী মানুষের সম্মান আসলে কতটা বৃদ্ধি পাচ্ছে।
মজুরি, মূল্যস্ফীতি ও দারিদ্র্য: অধিকার কতটা বাস্তব হলো?
অধিকার ও সম্মান কতটা বাড়ছে, তা বোঝার গুরুত্বপূর্ণ সূচক হলো মজুরি ও জীবনযাত্রার ব্যয়ের সম্পর্ক। বৈশ্বিক অস্থিরতার প্রেক্ষাপটে আইএমএফ ২০২৫–২৬ অর্থবছরে বাংলাদেশের গড় মূল্যস্ফীতি ৯.২% হতে পারে বলে পূর্বাভাস দিয়েছে। অন্যদিকে বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস)-এর তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে সামগ্রিক মূল্যস্ফীতি ৯.১৩%—যা ১০ মাসের মধ্যে সর্বোচ্চ; খাদ্য মূল্যস্ফীতি ৯.৩০%, যা ১৩ মাসের মধ্যে সর্বোচ্চ। একই সময়ে আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার (আইএলও) -এর ‘এমপ্লয়মেন্ট অ্যান্ড সোশ্যাল ট্রেন্ডস’ ২০২৬’ শীর্ষক প্রতিবেদনে দেখা যায়, বিশ্বে প্রায় ২৮৪–৩০০ মিলিয়ন শ্রমিক চরম দারিদ্র্যে বাস করছেন, যাদের দৈনিক আয় ৩ ডলারেরও কম। ২০২৬ সালে প্রায় ২১০ কোটি শ্রমিক অনানুষ্ঠানিক খাতে কাজ করবেন, যেখানে সামাজিক সুরক্ষা ও চাকরির নিরাপত্তা সীমিত। বৈশ্বিক বেকারত্ব ৪.৯% থাকলেও “শোভন কাজ”-এর অগ্রগতি থেমে আছে এবং নিম্ন আয়ের দেশগুলোতে কর্মরত দারিদ্র্য বাড়ছে। আইএলও মহাপরিচালক গিলবার্ট এফ হংবো সতর্ক করেছেন—স্থিতিশীল প্রবৃদ্ধির আড়ালেও কোটি শ্রমিক এখনো দারিদ্র্য ও বঞ্চনায় আটকে আছেন। এই পরিসংখ্যানগুলো ইঙ্গিত করছে—আইনে অধিকার বাড়লেও বাজারে সেই অধিকার বাস্তবে মজুরি ও জীবনমান হিসেবে পুরোপুরি প্রতিফলিত হয়নি; বরং মূল্যস্ফীতির চাপ শ্রমজীবী মানুষের সম্মানজনক জীবনযাপনকে আরও কঠিন করে তুলেছে।

কর্মপরিবেশ, নিরাপত্তা ও স্বীকৃতি: বিস্তৃত হলেও অসম
শ্রমিক অধিকার শুধু মজুরি নয়, নিরাপদ কর্মপরিবেশ ও সামাজিক স্বীকৃতিও এর বড় অংশ। নতুন শ্রম আইন ২০২৬–এ কর্মক্ষেত্রে নিরাপত্তা, ক্ষতিপূরণ, কল্যাণ তহবিল ও মাতৃত্বকালীন সুবিধাকে শক্তিশালী করার কথা বলা হয়েছে, যা শ্রমিকের পেশাগত মর্যাদা ও নিরাপত্তাকে কিছুটা হলেও এগিয়ে দিয়েছে। আইনটির মাধ্যমে আগে আইন থেকে বাইরে থাকা গৃহকর্মী, কৃষিশ্রমিক ও নাবিকদের মতো প্রান্তিক শ্রমজীবী গোষ্ঠীগুলোর কাজকে ‘শ্রম’ হিসেবে রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে। এটি সম্মান বৃদ্ধির ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ কাঠামোগত পরিবর্তন, কারণ তারা এখন দাবি ও আইনি প্রতিকার চাওয়ার আনুষ্ঠানিক ভিত্তি পেয়েছে। বিভিন্ন রাজনৈতিক ও শ্রমিক সংগঠন শ্রমিক অধিকারকে জাতীয় রাজনীতির মূলধারায় আনার কথা বলছে, শ্রমিকদের মৌলিক অধিকার, ন্যায্য মজুরি, নিরাপদ কর্মপরিবেশ ও সামাজিক সুরক্ষা নিয়ে জাতীয় পর্যায়ে কনভেনশন অনুষ্ঠিত হচ্ছে—যা দেখায়, শ্রমিক প্রশ্ন আজ শুধুই কারখানার ভেতরের ইস্যু নয়, রাষ্ট্রীয় এজেন্ডার অংশ। তবে বাস্তবে শ্রমিক নির্যাতন, বকেয়া মজুরি, হঠাৎ ছাঁটাই, নিরাপত্তাহীন পরিবেশ ও দুর্ঘটনার খবর এখনও গণমাধ্যমে নিয়মিত আসে, যা প্রমাণ করে—সম্মান ও নিরাপত্তার প্রশ্নে অগ্রগতি হয়েছে, কিন্তু তা খণ্ডিত এবং সব খাতে সমানভাবে পৌঁছায়নি।
সম্মান ও মর্যাদা: রাজনৈতিক ভাষণ বনাম জীবনের বাস্তবতা
সামাজিক সম্মান বাড়ছে কি না, তা বোঝা যায় রাষ্ট্র, সমাজ ও রাজনৈতিক দলগুলো শ্রমজীবী মানুষকে কীভাবে উপস্থাপন করছে, এবং শ্রমিকরা নিজেদের কতটা ক্ষমতায়িত বোধ করছেন। রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে মে দিবসের বার্তায় শ্রমজীবী মানুষের ভূমিকাকে “অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ” বলা হচ্ছে এবং উন্নত, স্মার্ট বাংলাদেশ গড়তে উন্নত কর্মপরিবেশ ও শ্রমিকের সার্বিক অধিকার নিশ্চিত করার কোনো বিকল্প নেই—এ কথা উচ্চারিত হচ্ছে। এই স্বীকৃতি সম্মান বৃদ্ধির প্রতীক হলেও তা এখনও অনেকাংশে বক্তব্য–নির্ভর। একদিকে বলা হচ্ছে, সরকার ‘শ্রমিকের সার্বিক কল্যাণসাধনে নিরন্তর কাজ করছে’, অন্যদিকে সরকার–ঘোষিত মূল্যস্ফীতি ও মজুরি বৃদ্ধির তথ্যই দেখাচ্ছে—দ্রব্যমূল্য ও বেতনের ফাঁক শ্রমজীবীদের জীবনে এক ধরনের ‘অসম্মানজনক’ টানাপোড়েন তৈরি করেছে। বিভিন্ন রাজনৈতিক ও শ্রমিক সংগঠনের বক্তব্যে উঠে এসেছে, শ্রমিক সমাজের প্রত্যাশা খুব সামান্য—ন্যায্য মজুরি, নিরাপদ কাজ, নিয়মিত বেতন, কিছু সামাজিক সুরক্ষা—কিন্তু এই সামান্য চাহিদাটুকুও এখন পর্যন্ত কোনো সরকার পূরণ করতে পারেনি বলে সমালোচনা রয়েছে। অর্থাৎ, ভাষণে শ্রমজীবী মানুষের সম্মান অনেক বেড়েছে, কিন্তু জীবনযাত্রার প্রাত্যহিক অভিজ্ঞতায় সেই সম্মানের পরিমাণ এখনও সীমিত—বিশেষ করে নিম্ন আয়ের, অনানুষ্ঠানিক খাতের এবং নারী শ্রমিকদের ক্ষেত্রে।
ভবিষ্যত কর্তব্য ও দায়:
এখন প্রশ্ন—এই সব পরিবর্তন মিলিয়ে আমরা কি বলতে পারি যে শ্রমজীবী মানুষের অধিকার ও সম্মান উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে? উত্তরটি আংশিক হ্যাঁ, আংশিক না। হ্যাঁ, কারণ: আইন ও নীতিগত কাঠামো আজ অনেক বিস্তৃত, প্রান্তিক শ্রমিকদের স্বীকৃতি এসেছে, ট্রেড ইউনিয়ন, সামাজিক সুরক্ষা ও ক্ষতিপূরণের বিধান শক্তিশালী হয়েছে। শ্রমিক অধিকার এখন জাতীয় রাজনীতি, মিডিয়া ও নাগরিক আলোচনায় নিয়মিত আলোচ্য; শ্রমজীবী মানুষকে ‘অর্থনীতির চালিকাশক্তি’ হিসেবে স্বীকৃতিও বেশি উচ্চারিত হচ্ছে। না, কারণ: বাস্তব মজুরি মূল্যস্ফীতির সঙ্গে পাল্লা দিতে পারছে না; দীর্ঘস্থায়ী উচ্চ মূল্যস্ফীতির চাপে শ্রমজীবী মানুষের ক্রয়ক্ষমতা কমছে। অনানুষ্ঠানিক খাতের বিস্তার, চরম দারিদ্র্যের স্থিতাবস্থা এবং ‘শোভন কাজ’–এর অগ্রগতির স্থবিরতা দেখায়—অধিকারের মান অনেক ক্ষেত্রে কাগজেই সীমিত। আইন থাকলেও বাস্তবায়নের ঘাটতি, শ্রমিকনির্যাতন ও দুর্ঘটনা প্রতিরোধে দুর্বলতা এবং ট্রেড ইউনিয়নের ওপর নানামুখী নিয়ন্ত্রণ সম্মান বৃদ্ধির পথকে বাঁধাগ্রস্ত করছে। একটি উদাহরণ দিয়ে বিষয়টি বোঝা যায়: যখন গৃহকর্মীকে আইনগতভাবে শ্রমিক হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়, তখন এটি সম্মানের একটি কাঠামোগত স্বীকৃতি; কিন্তু যদি সেই গৃহকর্মীর মাসিক বেতন সময়মতো না আসে, নির্যাতনের বিচার না হয়, এবং সামাজিকভাবে তাকে ‘কাজের মেয়ে’ বলে তাচ্ছিল্য করা হয়—তখন বোঝা যায়, অধিকার ও সম্মানের প্রকৃত পথ এখনও অনেক দূর।
শ্রমজীবী মানুষের অধিকার কাগজে-কলমে, নীতিতে আর ভাষণে কিছুটা বিস্তার পেয়েছে ঠিকই; কিন্তু বাস্তব জীবন, ন্যায্য মজুরি, নিরাপত্তা ও সামাজিক আচরণে সেই সম্মান এখনো পূর্ণতা পায়নি। তাই এখন সবচেয়ে জরুরি নতুন আইন নয়—বরং বিদ্যমান আইনের কার্যকর বাস্তবায়ন, সংগঠিত শ্রমিকশক্তির বিকাশ এবং আমাদের সামাজিক মানসিকতার মানবিক পরিবর্তন।
(এই বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই–এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)






