অ্যালগরিদম যুগে সাংবাদিকতা | চ্যানেল আই অনলাইন

অ্যালগরিদম যুগে সাংবাদিকতা | চ্যানেল আই অনলাইন

আলোচনার বিষয় যখন ‘অ্যালগরিদম যুগে সাংবাদিকতা’ তখন বলতে হয়, আমরা এমন এক সময়ে দাঁড়িয়ে আছি, যখন মানুষের সংবাদ গ্রহণের ধরন দ্রুত বদলে যাচ্ছে। আগে যেখানে পত্রিকা বা টেলিভিশন ছিল খবরের প্রধান উৎস, আজ সেখানে সোশ্যাল মিডিয়া ও ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম সংবাদের জানালা হয়ে উঠেছে।

একসময় খবরের কাগজের প্রথম পাতায় বা টিভি সংবাদ বুলেটিনের শুরুতে কোন এবং খবরটি থাকবে, তা ঠিক করতেন একজন অভিজ্ঞ সম্পাদক। পাঠক বা দর্শক সেটাই মূল খবর হিসেবে ভাবতে বাধ্য হতেন। সাংবাদিকতার সেই ভূমিকা আজ অনেকটাই বদলে গেছে। বর্তমান ডিজিটাল বাস্তবতায় এই সিদ্ধান্ত নিচ্ছে কিছু গাণিতিক সূত্র বা অ্যালগরিদম।

এই অ্যালগরিদম নির্ধারণ করছে আমরা কোন খবর দেখব, কোনটা দেখব না। অর্থাৎ, সংবাদ নির্বাচনের যে দায়িত্ব একসময় সম্পূর্ণভাবে সম্পাদক বা সাংবাদিকদের হাতে ছিল, তা এখন অনেকাংশে প্রযুক্তির ওপর নির্ভরশীল।

অ্যালগরিদম যুগে সাংবাদিকতা | চ্যানেল আই অনলাইন
অ্যালগরিদম যুগে সাংবাদিকতা

সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্মগুলোর এই বিস্তৃতি সাংবাদিকতার মৌলিক কাঠামোগুলোকে চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলেছে। ফেসবুকের ‘নিউজফিড’, ইন্সটাগ্রামের ‘এক্সপ্লোর পেজ’ টিকটকের ‘ফর ইউ পেজ’ বা ইউটিউবের ‘রিকমেন্ডেশন সিস্টেম’ মূলত এক একটি জটিল অ্যালগরিদম দ্বারা পরিচালিত হয়। এই সিস্টেমগুলোর প্রধান লক্ষ্য হলো ব্যবহারকারীকে দীর্ঘক্ষণ স্ক্রিনে আটকে রাখা। ব্যবহারকারীর অতীত আচরণ, পোস্টে লাইক বা কমেন্ট করার প্রবণতা এবং একটি ভিডিও কতক্ষণ দেখা হচ্ছে; এসব উপাত্ত বিশ্লেষণ করে অ্যালগরিদম ঠিক করে কোন খবরটি কার সামনে যাবে।

এর একটি মারাত্মক ক্ষতিকর দিক হলো ‘ফিল্টার বাবল’ এবং ‘ইকো চেম্বার’ তৈরি হওয়া। অ্যালগরিদম ব্যবহারকারীকে কেবল তার নিজের মতাদর্শের সাথে মিলে যায় এমন খবরই বেশি দেখায়। এর পরিণতি কী সেটা আমরা জানি, চিন্তার মেরুকরণ বা ক্ষেত্র বিশেষে চরমপন্থী চিন্তাভাবনার প্রসার ঘটে। বাংলাদেশ ও বিশ্বের রাজনৈতিক বা সামাজিক প্রেক্ষাপটে এই ফিল্টার বাবলের প্রভাব অত্যন্ত গভীর, যা মানুষকে বস্তুনিষ্ঠ তথ্যের বদলে আবেগ বা পক্ষপাতদুষ্ট খবরের দিকে ঝুঁকতে বাধ্য করছে।

সাংবাদিকতার এই রূপান্তরের ফলে ট্র্যাডিশনাল বা প্রথাগত নিউজরুমগুলো এখন প্ল্যাটফর্ম-চালিত মডেলে পরিণত হয়েছে। মানুষের মনোযোগ দেওয়ার সময় বা ‘অ্যাটেনশন স্প্যান’ কমে যাওয়ায় দীর্ঘ খবরের জায়গা দখল করেছে শর্ট-ফর্ম ভিডিও। কিন্তু এই প্ল্যাটফর্ম-নির্ভর সাংবাদিকতা চিন্তার স্বাধীনতা ও বৈচিত্র্যকে নেতিবাচকভাবে প্রভাবিত করছে। অনেক সময় অ্যালগরিদমকে সন্তুষ্ট করতে গিয়ে মূলধারার গণমাধ্যমগুলোও ক্লিকবেইট বা চটকদার শিরোনামের ফাঁদে পা দিচ্ছে। ফলে মানুষের আবেগ নিয়ে খেলা করে এমন ভুয়া খবর বা ‘মিসইনফরমেশন’ সোশ্যাল মিডিয়ায় দাবানলের মতো ছড়িয়ে পড়ছে। শুধু সোশ্যাল মিডিয়া ইনফ্লুয়েন্সার বা ব্যক্তিনির্ভর সাংবাদিকতা নয়, প্রাতিষ্ঠানিক সাংবাদিকতাতেও আমরা এই নেতিবাচক প্রবণতা দেখছি।

বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে আমরা দেখছি, অনেক গণমাধ্যম এখন ক্লিক, ভিউ এবং এনগেজমেন্টের প্রতিযোগিতায় নেমেছে। এতে করে সংকুচিত হচ্ছে গভীর ও অনুসন্ধানী সাংবাদিকতার জায়গা। একইসঙ্গে অ্যালগরিদম-চালিত প্ল্যাটফর্মে ভুয়া খবর বা বিভ্রান্তিকর তথ্য দ্রুত ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকিও বেড়েছে, যা আমাদের সমাজ ও গণতন্ত্রের জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ।

এই বাস্তবতায় সাংবাদিকতার নৈতিকতা, সত্যতা যাচাই এবং জনস্বার্থ রক্ষার দায়িত্ব আগের চেয়ে আরও বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে| অ্যালগরিদম তথ্য সাজাতে পারে, কিন্তু সত্য-মিথ্যা নির্ধারণ বা প্রাসঙ্গিকতা বোঝার ক্ষেত্রে মানবিক বিচারবোধের কোনো বিকল্প নেই; এখানেই জনস্বার্থ সাংবাদিকতার মৌলিক শক্তি।

কিন্তু পরিবর্তনকে যেহেতু আমরা অস্বীকার করতে পারব না, তাই একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন: অ্যালগরিদম যুগে সাংবাদিকরা কীভাবে নিজেদের প্রস্তুত করবে? কেবল প্রচলিত রিপোর্টিং দক্ষতা নয়, এখন প্রয়োজন ডেটা লিটারেসি, অ্যালগরিদমিক বোঝাপড়া, ফ্যাক্ট- চেকিং টুলস ব্যবহার, এমনকি মৌলিক কোডিং বা ডিজিটাল অ্যানালিটিক্সের জ্ঞান। প্রযুক্তিকে ভয় না পেয়ে, বরং সেটিকে বুঝে এবং ব্যবহার করে কীভাবে সত্যকে আরও কার্যকরভাবে তুলে ধরা যায়; সেই সক্ষমতা গড়ে তোলাই হবে আগামী দিনের সাংবাদিকতার বড় চ্যালেঞ্জ।

এজন্য নিজস্ব প্রাতিষ্ঠানিক এবং সরকারি-বেসরকারি প্রশিক্ষণ কর্মসূচির পাশাপাশি আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর দিকেও নজর দিতে হবে। গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা শিক্ষায় প্রচলিত ও নতুন ধারার রিপোর্টিং ও এডিটিং যোগ্যতার সঙ্গে কেবল কলা ও সামাজিক বিজ্ঞানের ঐতিহ্যগত বিষয়গুলো (যেমন সাহিত্য, ইতিহাস, অর্থনীতি, রাষ্ট্রবিজ্ঞান, সমাজবিজ্ঞান, রিসার্চ মেথডলজি)’র সঙ্গে সমন্বিতভাবে যুক্ত করতে হবে ডেটা সায়েন্স, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, কম্পিউটার জ্ঞান, ইন্টারনেট ও সফটওয়্যার স্কিল। চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের এই সময়ে সাংবাদিকতা শিক্ষাকে একটি পূর্ণাঙ্গ প্রযুক্তিনির্ভর বিষয়ে রূপান্তর করতে হলে এমন ইন্টিগ্রেটেড কারিকুলাম অপরিহার্য।

সঙ্গে এটাও বলতে চাই, অডিয়েন্সের দিক থেকে বর্তমান সাংবাদিকতা যতই অ্যালগরিদমভিত্তিক হোক না কেন, এর মানে এই না যে, সংবাদ পুরোপুরিভাবে অ্যালগরিদমের দাসে পরিণত হয়েছে| এজন্য দরকার মিডিয়া হাউসগুলোর ‘এথিক্যাল অপটিমাইজেশন’। কারণ দীর্ঘমেয়াদে আস্থার কোনো বিকল্প নেই। ডেটা-নির্ভর সাংবাদিকতা এবং অডিয়েন্স অ্যানালিটিক্স ব্যবহার করে অডিয়েন্সের আগ্রহের বিষয়গুলোকে চিহ্নিত করে মানসম্মত কনটেন্ট দেওয়া সম্ভব।

এজন্য কি আমাদের কোনো নীতিমালা প্রয়োজন? বাংলাদেশে এই বিষয়ে সংলাপ জরুরি। নিয়ন্ত্রণমূলক না করেও কীভাবে সেটা করা সম্ভব, সরকারকেও তা বুঝতে হবে।

ভবিষ্যতের সাংবাদিকতায় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই-এর ভূমিকা আরও বাড়বে। খবর আরও পার্সোনালাইজড হবে। কিন্তু এই টিকে থাকার একমাত্র উপায় হলো ‘আস্থা-ভিত্তিক সাংবাদিকতা’। তাই আধুনিক নিউজরুমগুলোকে প্রযুক্তিকে এড়িয়ে গেলে চলবে না; বরং প্রযুক্তির ভাষা এবং অ্যালগরিদমের গাণিতিক সমীকরণগুলো গভীরভাবে বুঝতে হবে। সাংবাদিকতার মূল আদর্শের সাথে আপস না করে, সোশ্যাল মিডিয়াকে একটি টুল হিসেবে ব্যবহার করে সঠিক তথ্য মানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছে দেওয়াই হবে আগামী দিনের সাংবাদিকতার সবচেয়ে বড় সার্থকতা।

Scroll to Top