শিশু যৌন শোষণে আন্তর্জাতিক চক্র | চ্যানেল আই অনলাইন

শিশু যৌন শোষণে আন্তর্জাতিক চক্র | চ্যানেল আই অনলাইন

বাংলাদেশে শিশু পর্নোগ্রাফির কোনো বাণিজ্যিক বাজার না থাকলেও আন্তর্জাতিক চক্র সক্রিয় রয়েছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তথ্য অনুযায়ী, গত কয়েক বছরে এসব চক্রের সঙ্গে জড়িত কমপক্ষে পাঁচজনকে গ্রেপ্তার করেছে আইন শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী।

পর্নোগ্রাফি নিয়ন্ত্রণ আইন, ২০১২ অনুযায়ী শিশু পর্নোগ্রাফি তৈরি, সংরক্ষণ ও প্রচারে কঠোর শাস্তির বিধান থাকলেও অপরাধ থামছে না।

আন্তর্জাতিক অপরাধচক্রগুলো সংগঠিত নেটওয়ার্ক গড়ে তুলে বিভিন্ন অনলাইন প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করে এই অপরাধ পরিচালনা করছে বলে জানিয়েছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী।

চ্যানেল আই অনলাইনের অনুসন্ধানে জানা গেছে বাংলাদেশসহ দক্ষিণ এশিয়ার কয়েকটি দেশকে এই চক্রের টার্গেট হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। বিশেষ করে দরিদ্র ও ঝুঁকিপূর্ণ পরিবারের শিশুদের নানা প্রলোভন বা ভয় দেখিয়ে এই অপরাধে যুক্ত করা হচ্ছে।

শিশুদের ব্যবহার করে তৈরি করা আপত্তিকর কনটেন্ট ছড়িয়ে দিতে একটি শক্তিশালী আন্তর্জাতিক চক্র সক্রিয় রয়েছে। এসব চক্র ডার্ক ওয়েব, এনক্রিপ্টেড মেসেজিং অ্যাপ এবং সোশ্যাল মিডিয়াকে ব্যবহার করে কনটেন্ট তৈরি, সংরক্ষণ ও বাণিজ্যিকভাবে ছড়িয়ে দিচ্ছে।

আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর একটি সূত্র জানায়, সাম্প্রতিক অভিযানে একাধিক আন্তর্জাতিক চক্রের সঙ্গে জড়িত স্থানীয় সহযোগীদের শনাক্ত করা হয়েছে। তারা বিদেশি নেটওয়ার্কের নির্দেশে শিশুদের ছবি ও ভিডিও সংগ্রহ করে পাঠাতো।

আন্তর্জাতিক বিভিন্ন সংস্থার তথ্য অনুযায়ী—প্রতি বছর বিশ্বজুড়ে লাখ লাখ শিশু অনলাইনে যৌন শোষণের শিকার হচ্ছে। শিশুদের নিয়ে তৈরি আপত্তিকর কনটেন্টের সংখ্যা কয়েক মিলিয়নের বেশি বলে ধারণা করা হয়। ইন্টারপোল ও অন্যান্য সংস্থার ডাটাবেজে হাজার হাজার ভিকটিম শনাক্ত হয়েছে, যাদের অনেকেই এখনো উদ্ধার হয়নি। গত কয়েক বছরে অনলাইন প্ল্যাটফর্মগুলোতে শিশু নির্যাতন সংক্রান্ত কনটেন্ট শনাক্তের হার উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে।

বাংলাদেশেও সাইবার ক্রাইম ইউনিটের ডাটাবেজে শিশু নির্যাতন ও পর্নোগ্রাফি সংক্রান্ত অভিযোগের সংখ্যা বাড়ছে।

একটি গবেষণায় দেখা গেছে, শিশুর যৌন শোষণের বিষয়টি বাংলাদেশে অনেকটা নিষিদ্ধ বিষয়ের মতো। অনেক ক্ষেত্রে পতিতালয়, হোটেল এবং রাস্তায় যৌন ব্যবসায় যুক্ত শিশুর যৌন শোষণ শুরু হয় মাত্র ১০ বছর বয়স থেকেই। পতিতালয়ের অনেক শিশুই যৌনদাস হিসেবে কাজ করতে বাধ্য হয়। আনুমানিক ৪০ হাজার পথশিশু এ ধরনের শোষণের শিকার হওয়ার ঝুঁকিতে আছে; এর মধ্যে আনুমানিক ১০ শতাংশ কেবল বেঁচে থাকার জন্য যৌন ব্যবসায় থাকতে বাধ্য হচ্ছে কিংবা তাদের জোরপূর্বক বাধ্য করা হচ্ছে ।

তথ্য ও উপাত্ত বিশ্লেষণ করে জানা যায়, ২০২৫ সালের জুনে শিশু পর্নোগ্রাফি ভিডিও তৈরি ও সংরক্ষণের অভিযোগে মো. এখলাছ আলীকে গ্রেপ্তার করে সিআইডি। এর আগে ২০২৪ সালের ২ জুলাই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে শিশু পর্নো কনটেন্ট বেচাকেনার অভিযোগে সবুজ হোসেনকে গ্রেপ্তার করে ডিএমপির কাউন্টার টেররিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম (সিটিটিসি)। তার কাছ থেকে ৫৩৯ জিবির বেশি দেশি-বিদেশি শিশু পর্নোগ্রাফি কনটেন্ট উদ্ধার করা হয়। তদন্তে আন্তর্জাতিক চক্রের সদস্যদের সঙ্গে তার যোগাযোগের প্রমাণ পাওয়া গেছে।

একই বছরের ২৩ এপ্রিল আন্তর্জাতিক শিশু পর্নোগ্রাফি চক্রের বাংলাদেশের মূলহোতা টি আই এম ফখরুজ্জমান ওরফে টিপু কিবরিয়াকে গ্রেপ্তার করে সিটিটিসি। তার কাছ থেকে প্রায় ২৫ হাজার ছবি ও এক হাজার ভিডিও কনটেন্ট উদ্ধার করা হয়। তিনি পথশিশুদের অর্থের প্রলোভন দেখিয়ে এসব কাজে যুক্ত করতেন এবং বিদেশি ক্লায়েন্টদের কাছে সরবরাহ করতেন।

তদন্তে চক্রের কার্যক্রম সম্পর্কে পুলিশ জানায়, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে গোপন গ্রুপের মাধ্যমে কনটেন্ট আদান-প্রদান করা হতো। পাশাপাশি বিদেশি নাগরিকদের সঙ্গে সমন্বয় করে বিদেশি অনলাইন প্ল্যাটফর্মে বিক্রি ও প্রচার করা হতো।

এ অবস্থায় আইন প্রয়োগের পাশাপাশি অভিভাবক সচেতনতা ও প্রযুক্তিনির্ভর নজরদারি আরও জোরদার করার ওপর গুরুত্ব দিচ্ছে পুলিশ।

পুলিশের অপরাধ ও তদন্ত বিভাগের (সিআইডি) বিশেষ পুলিশ সুপার (গণমাধ্যম) জসীম উদ্দিন খান চ্যানেল আই অনলাইনকে বলেন, আন্তর্জাতিক সংস্থা ইন্টারন্যাশনাল ক্রিমিনাল পুলিশ অর্গানাইজেশন (ইন্টারপোল), ন্যাশনাল সেন্টার ফর মিসিং অ্যান্ড এক্সপ্লোয়েডেড চিলড্রেন (এনসিএমইসি) এবং ন্যাশনাল সেন্ট্রাল ব্যুরোর সহযোগিতায় নিয়মিত নজরদারি চলছে। সাইবার ইন্টেলিজেন্সের মাধ্যমে আসামিদের শনাক্ত করে অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে।

আন্তর্জাতিক চক্রের এই নেটওয়ার্ক ভেঙে দিতে সমন্বিত উদ্যোগ ছাড়া এ ঝুঁকি মোকাবিলা করা কঠিন—এমনটাই মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

সাইবার নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞ ও সাইবার ক্রাইম অ্যাওয়ারনেস ফাউন্ডেশনের সভাপতি কাজী মুস্তাফিজ চ্যানেল আই অনলাইনকে বলেন, সাইবার অপরাধ প্রতিনিয়ত পরিবর্তন হয়। এই অপরাধ প্রতিরোধে শুধু আইন প্রয়োগই যথেষ্ট নয়; প্রয়োজন আন্তর্জাতিক সহযোগিতা, প্রযুক্তিগত সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং জনসচেতনতা।

বাংলাদেশে শিশুদের যৌন শোষণের ব্যাপকতা ও এর ক্ষতি সম্পর্কে মানুষকে অবহিত করে আচরণগত পরিবর্তন আনতে হবে এবং এ বিষয়ে সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গি বদলাতে হবে। এর মাধ্যমেই শিশু যৌন শোষণের চাহিদা কমানো এবং সমাজে এ ধরনের অপরাধের প্রতি সহনশীলতা বা গ্রহণযোগ্যতা বন্ধ করা সম্ভব।

দ্য ফ্রিডম ফান্ড বাংলাদেশের কান্ট্রি রিপ্রেজেন্টেটিভ খালেদা আক্তার চ্যানেল আই অনলাইনকে বলেন, “শিশুদের বাণিজ্যিক যৌন শোষণ প্রতিরোধের জন্য সমাজে বিদ্যমান ক্ষতিকর চিন্তাধারা পরিবর্তন করা অপরিহার্য। এর জন্য সমাজের প্রতিটি স্তরে দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তন প্রয়োজন। পরিবার, স্কুল, কমিউনিটি ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে একসাথে কাজ করতে হবে – সুরক্ষামূলক আচরণ গড়ে তোলা, শিশুদের অধিকার বজায় রাখা এবং তাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য, যাতে তারা বাণিজ্যিক যৌন শোষণ থেকে সুরক্ষিত থাকতে পারে।”

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী নজরদারি ও অভিযান জোরদার করলেও, একই সাথে বাণিজ্যিকভাবে শিশু যৌন শোষণে জড়িত অপরাধীদের লক্ষ্য করে সচেতনতা ও প্রতিরোধমূলক কার্যক্রম পরিচালনা করতে হবে যাতে এ ধরনের কার্যক্রমকে সামাজিকভাবে সম্পূর্ণ অগ্রহণযোগ্য হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করা যায় এবং মানুষের মধ্যে আচরণগত পরিবর্তন আসে। শিশুদের সুরক্ষায় সমন্বিত পদক্ষেপ, পুনর্বাসন ও সচেতনতা বাড়ানো জরুরি।

Scroll to Top