দেশের পোল্ট্রি খাতের উন্নয়ন ও গবেষণার পরিধি বাড়াতে ১৩৪ কোটি টাকার মেগা প্রকল্প হাতে নেওয়া হলেও এর মূল উদ্দেশ্য মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়েছে। প্রকল্পের সিংহভাগ অর্থই গবেষণার বদলে ভবন নির্মাণ, ভূমি অধিগ্রহণ এবং সরঞ্জাম ক্রয়ে ব্যয় করা হয়েছে। শুধু তাই নয়, এই প্রকল্পের প্রকল্প পরিচালক (পিডি) ড. মো. সাজেদুল করিমের বিরুদ্ধে নিজের স্ত্রীকে নিয়মবহির্ভূতভাবে ফেলোশিপ দেওয়া, ওপেন টেন্ডার ছাড়া কোটি টাকার কাজ বণ্টন এবং ভুয়া ভাউচারে অর্থ আত্মসাতের গুরুতর অভিযোগ উঠেছে।
বাংলাদেশ প্রাণিসম্পদ গবেষণা ইনস্টিটিউট (বিএলআরআই) কর্তৃক বাস্তবায়নাধীন ‘পোল্ট্রি গবেষণা ও উন্নয়ন জোরদারকরণ (১ম সংশোধিত)’ প্রকল্পের নথিপত্র বিশ্লেষণ করে এসব অনিয়মের চাঞ্চল্যকর তথ্য সামনে এসেছে।
প্রকল্পের আর্থিক হিসাব অনুযায়ী, ২০২৫ সালের জুন পর্যন্ত মোট ১২০ কোটি ৫৭ লাখ টাকা খরচ দেখানো হয়েছে। এর মধ্যে প্রায় ৮১ কোটি ২৮ লাখ টাকা বা ৬৫ শতাংশই ব্যয় হয়েছে অবকাঠামো নির্মাণ ও ভারী সরঞ্জাম কেনায়। অথচ প্রকল্পের মূল প্রাণ যে গবেষণা ও ফেলোশিপ খাত, সেখানে বরাদ্দ থাকলেও ব্যয় হয়েছে মাত্র ৭ কোটি ৯৯ লাখ টাকা (মোট ব্যয়ের মাত্র ৫.৯৭ শতাংশ)।
নিয়ম অনুযায়ী গবেষণা খাতে ৬ কোটি ৩০ লাখ টাকা থাকার কথা থাকলেও শুধু পোল্ট্রির খাবার ও ফিড অ্যাডিটিভস কিনতে খরচ দেখানো হয়েছে ১২ কোটি ৪২ লাখ টাকার বেশি। এছাড়া ২০১৯ সালের জুলাইয়ে শুরু হওয়া এই প্রকল্পের মেয়াদ দুই বছর বাড়িয়ে ২০২৬ সালের জুন পর্যন্ত করা হলেও এর কোনো যৌক্তিক প্রশাসনিক ব্যাখ্যা পাওয়া যায়নি।
এই প্রকল্পের সবচেয়ে বড় আলোচিত অধ্যায় হলো প্রকল্প পরিচালক ড. মো. সাজেদুল করিমের স্ত্রী ড. ফারহানা শারমীনকে পোস্ট-ডক্টরাল ফেলোশিপ পাইয়ে দেওয়া। কোনো ধরনের উন্মুক্ত বিজ্ঞপ্তি বা বিজ্ঞাপন ছাড়াই সম্পূর্ণ গোপনীয়তার মাধ্যমে এই সুযোগ তৈরি করা হয়, যা ২০২২ সালের সরকারি তদন্তেও প্রমাণিত হয়েছে। বিএলআরআইয়ের স্থায়ী কর্মী না হওয়া সত্ত্বেও তিনি মাসিক ১ লাখ ২০ হাজার টাকা ভাতা নিয়েছেন এবং ফেলোশিপ খাতের মোট বরাদ্দের প্রায় ৬৫ শতাংশই একাই ভোগ করেছেন।
তাছাড়া, ট্রেনিং কোর্সের নির্দেশক নিজেই হওয়ার সুবাদে পিডি বড় অঙ্কের সম্মানীর বিপরীতে একাধিক সেশনের প্রশিক্ষক হিসেবে যুক্ত ছিলেন এবং তাঁর স্ত্রীকেও প্রশিক্ষক রাখা হয়।
ভুয়া ভাউচার: এক জুনিয়র ট্রেনিং সহকারী ও হিসাবরক্ষকের মাধ্যমে ভুয়া দোকানের নামে কোটি কোটি টাকার বিল ও সরবরাহ ভাউচার তৈরি।
দরপত্র ছাড়া কাজ: কোনো টেন্ডার ছাড়াই প্রায় সাড়ে ৩ কোটি টাকার রক্ষণাবেক্ষণ ও মেরামতের কাজ নির্দিষ্ট লোকজনকে বণ্টন।
অপ্রয়োজনীয় কেনাকাটা: গবেষণাগারে পর্যাপ্ত জায়গা না থাকা সত্ত্বেও ২ কোটি ১৫ লাখ টাকায় ৪টি ইনকিউবেটর ক্রয়।
যানের ব্যক্তিগত ব্যবহার: প্রকল্পের নামে বরাদ্দকৃত মোটরসাইকেল ও গাড়ি পিডি ও তাঁর পরিবার কর্তৃক ব্যক্তিগত কাজে ব্যবহার।
অভিযোগের বিষয়ে প্রকল্প পরিচালক ড. মো. সাজেদুল করিম সমস্ত অনিয়ম অস্বীকার করে দাবি করেছেন, প্রচলিত বিধি মেনেই সব কাজ সম্পন্ন করা হয়েছে। তবে রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে দায়িত্ব নেওয়া এবং স্ত্রীর ফেলোশিপ সংক্রান্ত সুনির্দিষ্ট প্রশ্নের কোনো সদুত্তর তিনি দেননি।
আরও পড়ুন : ২০২৬ সালে যে ৮ দক্ষতা আপনাকে সফলতা এনে দেবে
খাতসংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা বলছেন, প্রাণিসম্পদ গবেষণার মতো একটি সংবেদনশীল খাতে এমন স্বজনপ্রীতি ও রাষ্ট্রীয় অর্থের অপচয় নজিরবিহীন। অবিলম্বে এই প্রকল্পের সম্পূর্ণ অর্থ বরাদ্দ, কেনাকাটা ও ফেলোশিপ বিতরণের নিরপেক্ষ অডিট এবং দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) মাধ্যমে কঠোর আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণের জোর দাবি জানিয়েছেন তারা। অন্যথায় পোল্ট্রি খাতের টেকসই উন্নয়ন ও খাদ্যনিরাপত্তার স্বপ্ন কেবল কাগজ-কলমেই সীমাবদ্ধ থাকবে।



