যুক্তরাষ্ট্রের নিউ জার্সির মেটলাইফ স্টেডিয়াম, বিশ্বকাপ ফাইনালের জন্য অপেক্ষায় পুরো বিশ্বের ফুটবলভক্তরা। একদিকে বর্তমান বিশ্বচ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনা, অন্যদিকে ইউরোপ সেরা স্পেন। ফুটবল ইতিহাসে এই প্রথমবার দুই মহাদেশের রাজত্বকারী দল মুখোমুখি হচ্ছে বিশ্বকাপের ফাইনালে।
একদিকে ৩৯ বছর বয়সেও দলের ভরসা হয়ে থাকা লিওনেল মেসির শেষ বিশ্বকাপ, অন্যদিকে লামিনে ইয়ামালদের নতুন প্রজন্মের স্পেন।
ম্যাচ শুরুর আগে দুই দলের ইতিহাস, গর্ব আর ব্যর্থতার গল্পটা একবার দেখে নেওয়া যাক।
আর্জেন্টিনা: তিনটি শিরোপা, দুটি ফাইনাল হার
আর্জেন্টিনার বিশ্বকাপ যাত্রা শুরু ১৯৩০ সালে, প্রথম বিশ্বকাপের ফাইনালেই। সেবার উরুগুয়ের কাছে হেরে রানার্সআপ হতে হয়েছিল তাদের।
এরপর প্রথম শিরোপার জন্য অপেক্ষা করতে হয় ১৯৭৮ সাল পর্যন্ত। নিজেদের মাটিতে অনুষ্ঠিত সেই বিশ্বকাপে ড্যানিয়েল পাসারেলার নেতৃত্বে প্রথমবার চ্যাম্পিয়ন হয় আর্জেন্টিনা, যদিও দেশে তখন সামরিক শাসন চলছিল বলে সেই শিরোপা নিয়ে বিতর্কও কম হয়নি।

১৯৮৬ সালে আসে সবচেয়ে আলোচিত বিশ্বকাপ। মেক্সিকোয় দিয়াগো ম্যারাডোনার হাতে লাগা সেই বিখ্যাত গোল আর তার ঠিক পরেই একা প্রায় পুরো ইংল্যান্ড দলকে কাটিয়ে করা গোল, দুটোই ফুটবল ইতিহাসের অংশ হয়ে আছে। সেবার দ্বিতীয় শিরোপা জেতে আর্জেন্টিনা।

এরপর লম্বা এক অপেক্ষার গল্প। ১৯৯০ সালে ফাইনালে পশ্চিম জার্মানির কাছে হার। মেসির প্রজন্ম নিয়ে ২০১৪ সালে আবার ফাইনালে ওঠা, কিন্তু সেবারও জার্মানদের কাছেই হার। মনে হচ্ছিল মেসির হাতে হয়তো কখনোই বিশ্বকাপ উঠবে না।
তারপর ২০২২ সালের কাতার। হুলিয়ান আলভারেজের গোল, পেনাল্টি শুটআউটে এমিলিয়ানো মার্তিনেজের বীরত্ব, আর মেসির হাতে অবশেষে বিশ্বকাপ ট্রফি। তৃতীয় শিরোপা।
তার সঙ্গে ২০২১ আর ২০২৪ সালের কোপা আমেরিকা শিরোপাও যোগ হয়েছে লিওনেল স্কালোনির দলের ঝুলিতে। এবার জিতলে টানা চারটি বড় টুর্নামেন্ট জেতা প্রথম দল হয়ে যাবে আর্জেন্টিনা, যা ফুটবল ইতিহাসে আগে কেউ করতে পারেনি।
এই বিশ্বকাপে ফাইনাল পর্যন্ত আর্জেন্টিনার পথটা মসৃণ ছিল না। নকআউট পর্বের চার ম্যাচেই তারা এক সময় পিছিয়ে বা সমতায় ছিল, তারপরও প্রতিবারই জিতে বেরিয়ে এসেছে।
স্পেন: ব্যর্থতার লম্বা তালিকা থেকে সোনালী যুগ
স্পেনের গল্পটা পুরোপুরি উল্টো। বহু বছর ধরে বিশ্ব ফুটবলে স্পেনকে বলা হতো ‘প্রতিভাবান কিন্তু হতাশাজনক’ দল। প্রতিটি বড় টুর্নামেন্টের আগে ফেভারিটের তকমা পেত, কিন্তু নকআউট পর্বে গিয়ে বারবার আটকে যেত।
২০০৮ সালে প্রথম বাঁক বদল। ইউরোতে জার্মানিকে হারিয়ে প্রথমবার বড় শিরোপা জেতে স্পেন। এরপর ২০১০ সালে দক্ষিণ আফ্রিকা বিশ্বকাপে জাভি হার্নান্দেজদের নিয়ন্ত্রিত পাসিং ফুটবল, যাকে বলা হতো ‘তিকিতাকা’, তাতে ভর করে প্রথমবার বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হয় স্পেন।

ফাইনালে আন্দ্রেস ইনিয়েস্তার শেষ মুহূর্তের গোলে নেদারল্যান্ডসকে হারায় তারা।
২০১২ সালে আবার ইউরো জিতে স্পেন হয়ে যায় ফুটবল ইতিহাসে টানা তিনটি বড় টুর্নামেন্ট জেতা প্রথম দল, ২০০৮ ইউরো, ২০১০ বিশ্বকাপ আর ২০১২ ইউরো।
কিন্তু এরপর আবার পতন। ২০১৪ বিশ্বকাপে গ্রুপ পর্ব থেকেই বিদায়। পরের কয়েকটা টুর্নামেন্টেও প্রি-কোয়ার্টার বা কোয়ার্টার ফাইনালেই থেমে যেতে হয় বারবার।
নতুন করে ঘুরে দাঁড়ানোর গল্প শুরু কোচ লুইস দে লা ফুয়েন্তের হাত ধরে। কিশোর লামিনে ইয়ামাল আর নিকো উইলিয়ামসকে নিয়ে গড়া তরুণ দল ২০২৪ সালে জেতে ইউরো শিরোপা।
২০২৬ বিশ্বকাপে এসে সেই দলই দেখাচ্ছে অবিশ্বাস্য নিয়ন্ত্রণ, পুরো টুর্নামেন্টে একবারও পিছিয়ে না পড়ে ফাইনালে উঠেছে স্পেন। বিশ্লেষক সংস্থা অপ্টার হিসাব বলছে, প্রতি ম্যাচে প্রতিপক্ষকে তারা যে পরিমাণ গোলের সুযোগ দিয়েছে সেটা ১৯৬৬ সালের পর যেকোনো দলের মধ্যে সবচেয়ে কম।
যে কিংবদন্তিদের এখনো মনে রাখে ফ্যানরা
আর্জেন্টিনার কথা উঠলেই যে কিংবদন্তির কথা মনে আসে, তিনি দিয়াগো ম্যারাডোনা। মেক্সিকোর আজতেকা স্টেডিয়ামে ম্যারাডোনার বিখ্যাত সেই বিতর্কিত গোল আর মিনিট চারেক পরই সেই একই মাঠে বল পায়ে পুরো ইংল্যান্ড দলকে একা কাটিয়ে যে গোলটা করলেন, ফুটবল সেটাকে আজও ডাকে শতাব্দীর সেরা গোল বলে। ম্যারাডোনার আগে অবশ্য আর্জেন্টিনার প্রথম শিরোপার নায়ক ছিলেন মারিও কেম্পেস, নিজের দেশের মাঠে ১৯৭৮ সালে টুর্নামেন্ট মাতিয়ে দলকে চ্যাম্পিয়ন বানিয়েছিলেন তিনি।
এরপর নব্বইয়ের দশকে গ্যাব্রিয়েল বাতিস্তুতার সময় এলো, বিশ্বকাপের পর বিশ্বকাপে গোল করে যাওয়া বাতিগোল আজও আর্জেন্টাইন ফুটবলপ্রেমীদের প্রিয় নাম। আর এই সময়ের গল্পটা তো পুরোপুরি লিওনেল মেসিকে ঘিরে, বছরের পর বছর প্রশ্ন উঠত বিশ্বকাপ ছাড়া তার কীর্তি অসম্পূর্ণ থেকে যাবে কিনা, কাতারে সেই প্রশ্নের জবাব দিয়ে তিনিই এখন দেশের সবচেয়ে বড় নাম।
স্পেনের বেলায় সবার আগে মনে পড়ে আন্দ্রেস ইনিয়েস্তার সেই গোল, ২০১০ বিশ্বকাপ ফাইনালে নেদারল্যান্ডসের জালে বল জড়িয়ে দেওয়ার মুহূর্তটা স্পেনের ফুটবল ইতিহাসের সবচেয়ে বড় মুহূর্ত হয়ে আছে। তার পাশেই থাকে জাভি হার্নান্দেজের নাম, বল নিজেদের পায়ে রেখে প্রতিপক্ষকে চাপে রাখার যে খেলা স্পেন খেলত তার নিয়ন্ত্রণ ছিল তার হাতে।
গোলপোস্টের নিচে ইকার কাসিয়াস ছিলেন সেই সোনালী প্রজন্মের অধিনায়ক, আর তারও আগে ফের্নান্দো তোরেসের একটা গোলই স্পেনকে প্রথম বড় শিরোপার স্বাদ দিয়েছিল, ২০০৮ ইউরোর ফাইনালে জার্মানির বিপক্ষে।
মুখোমুখি লড়াইয়ের পরিসংখ্যান
স্পেন আর আর্জেন্টিনা এর আগে ১৪ বার মুখোমুখি হয়েছে। দুই দলই জিতেছে ৬টি করে ম্যাচ, বাকি দুটি ড্র। অর্থাৎ ইতিহাসে দুই দলের লড়াই প্রায় সমান তালেই চলেছে।
এই ফাইনালের ফলাফলের সঙ্গে যেসব রেকর্ড অপেক্ষায়-
– আর্জেন্টিনা জিতলে হবে ফুটবল ইতিহাসে টানা চারটি বড় টুর্নামেন্ট জেতা প্রথম দল।
– টানা দুইবার বিশ্বকাপ জেতার কীর্তি এর আগে আছে শুধু ব্রাজিল (১৯৫৮, ১৯৬২) আর ইতালির (১৯৩৪, ১৯৩৮)।
– স্পেন জিতলে ২০১০ এর পর দ্বিতীয় বিশ্বকাপ শিরোপা যোগ হবে তাদের নামের পাশে, সঙ্গে থাকবে ইউরো ২০২৪ শিরোপাও।
এটাই ইতিহাসে প্রথম বিশ্বকাপ ফাইনাল যেখানে বর্তমান ইউরোপ ও দক্ষিণ আমেরিকা চ্যাম্পিয়ন মুখোমুখি হচ্ছে।




