ইস্পাত, সিমেন্ট, কাচ কিংবা রাসায়নিক কারখানায় প্রতিদিন বিপুল পরিমাণ তাপ পরিবেশে নষ্ট হয়ে যায়। এতদিন এই তাপকে প্রায় অপ্রয়োজনীয় অপচয় হিসেবে দেখা হলেও এবার সেই বর্জ্য তাপকেই পরিচ্ছন্ন জ্বালানি উৎপাদনের উৎসে পরিণত করার পথ দেখিয়েছেন গবেষকরা। নতুন প্রযুক্তি সফল হলে কম খরচে, কম কার্বন নিঃসরণে এবং আরও দক্ষ উপায়ে হাইড্রোজেন উৎপাদনের নতুন যুগের সূচনা হতে পারে।
বিশ্বজুড়ে পরিচ্ছন্ন জ্বালানির সন্ধানে সবচেয়ে আলোচিত নামগুলোর একটি হলো হাইড্রোজেন। কারণ, এটি ব্যবহার করলে কার্বন ডাই-অক্সাইড নির্গমন হয় না এবং বিদ্যুৎ উৎপাদন থেকে শুরু করে ভারী শিল্প ও পরিবহন খাতে জীবাশ্ম জ্বালানির বিকল্প হতে পারে। তবে হাইড্রোজেন উৎপাদনের বর্তমান পদ্ধতিগুলোর বড় চ্যালেঞ্জ হলো উচ্চ ব্যয় এবং বিপুল শক্তির প্রয়োজন।
এই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় নতুন সম্ভাবনার খবর দিয়েছেন যুক্তরাজ্যের ইউনিভার্সিটি অব বার্মিংহামের বিজ্ঞানীরা। তারা এমন একটি প্রযুক্তি উদ্ভাবন করেছেন, যার মাধ্যমে শিল্পকারখানার অপচয় হওয়া বর্জ্য তাপ ব্যবহার করে তুলনামূলক কম তাপমাত্রায় পানি থেকে হাইড্রোজেন উৎপাদন করা সম্ভব। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, এই প্রক্রিয়ায় কার্বন ডাই-অক্সাইড নির্গমন হয় না। ফলে এটি প্রচলিত জীবাশ্ম জ্বালানিনির্ভর হাইড্রোজেন উৎপাদন পদ্ধতির তুলনায় অনেক বেশি পরিবেশবান্ধব।
গবেষণায় বিজ্ঞানীরা বিশেষ ধরনের BNCF পেরোভস্কাইট অনুঘটক (Perovskite Catalyst) ব্যবহার করেছেন। পরীক্ষায় দেখা গেছে, মাত্র ১৫০ থেকে ৫০০ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রায় কার্যকরভাবে পানি থেকে হাইড্রোজেন উৎপাদন সম্ভব। যেখানে প্রচলিত অনেক প্রযুক্তিতে আরও বেশি তাপমাত্রা প্রয়োজন হয়, সেখানে নতুন এই অনুঘটক অপেক্ষাকৃত কম তাপেই একই কাজ করতে সক্ষম।
গবেষণার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো অনুঘটকটির পুনর্ব্যবহারযোগ্যতা। এটি পুনরায় সক্রিয় করতে আগের প্রযুক্তির তুলনায় প্রায় ৫০০ ডিগ্রি সেলসিয়াস কম তাপমাত্রা প্রয়োজন হয়। ফলে শক্তি খরচ উল্লেখযোগ্যভাবে কমে আসে এবং পুরো উৎপাদন প্রক্রিয়াটি আরও সাশ্রয়ী ও অর্থনৈতিক হয়ে ওঠে।
গবেষণার প্রধান গবেষক অধ্যাপক ইউলং ডিং জানান, ইস্পাত, সিমেন্ট, কাচ এবং রাসায়নিক শিল্পে প্রতিদিন বিপুল পরিমাণ তাপ উৎপন্ন হলেও তার বড় অংশ কোনো কাজে ব্যবহার না হয়ে পরিবেশে নষ্ট হয়ে যায়। নতুন প্রযুক্তির মাধ্যমে সেই বর্জ্য তাপকেই শক্তির উৎস হিসেবে ব্যবহার করা সম্ভব হবে।
তার মতে, এই প্রযুক্তি ব্যবহার করে শিল্পাঞ্চলের কাছাকাছি সরাসরি হাইড্রোজেন উৎপাদন করা যাবে। এতে অতিরিক্ত জ্বালানির প্রয়োজন কমবে। একই সঙ্গে দূরবর্তী স্থান থেকে হাইড্রোজেন পরিবহন ও সংরক্ষণের ব্যয়ও উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস পাবে, যা ভবিষ্যতের হাইড্রোজেন অর্থনীতির জন্য গুরুত্বপূর্ণ সুবিধা।
গবেষণায় আরও বলা হয়েছে, এই প্রযুক্তিতে উৎপাদিত হাইড্রোজেনের সম্ভাব্য ব্যয় বর্তমানে ব্যবহৃত গ্রিন হাইড্রোজেন এবং ব্লু হাইড্রোজেন উভয়ের তুলনায় কম হতে পারে। যদি তা শিল্প পর্যায়ে বাস্তবায়ন করা যায়, তাহলে পরিচ্ছন্ন জ্বালানির বাজারে বড় ধরনের পরিবর্তন আসতে পারে। কম খরচে পরিবেশবান্ধব হাইড্রোজেন উৎপাদন সম্ভব হলে বিদ্যুৎ উৎপাদন, ভারী শিল্প, সার উৎপাদন, ইস্পাত শিল্প, জাহাজ ও ভারী পরিবহনসহ বিভিন্ন কার্বননির্ভর খাতে দ্রুত পরিচ্ছন্ন জ্বালানির ব্যবহার বাড়ানো সম্ভব হবে।
গবেষণাটি প্রকাশিত হয়েছে International Journal of Hydrogen Energy-এ। এটি ইউনিভার্সিটি অব বার্মিংহাম এবং ইউনিভার্সিটি অব সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজি বেইজিং (USTB)-এর যৌথ উদ্যোগে পরিচালিত হয়েছে। প্রযুক্তিটির পেটেন্টের জন্য ইতোমধ্যে আবেদন করা হয়েছে এবং শিল্প পর্যায়ে বাণিজ্যিক ব্যবহারের প্রস্তুতিও শুরু হয়েছে।
গবেষকদের মতে, বিশ্বজুড়ে শিল্পকারখানায় প্রতিদিন যে বিপুল পরিমাণ তাপ অপচয় হয়, সেটিকে যদি জ্বালানি উৎপাদনের সম্পদে রূপান্তর করা যায়, তাহলে একই সঙ্গে তিনটি বড় সুবিধা পাওয়া যাবে। প্রথমত, অপচয় হওয়া শক্তির ব্যবহার নিশ্চিত হবে। দ্বিতীয়ত, কম খরচে পরিচ্ছন্ন হাইড্রোজেন উৎপাদন সম্ভব হবে। তৃতীয়ত, কার্বন নিঃসরণ কমিয়ে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলায় কার্যকর ভূমিকা রাখা যাবে।
বিশ্ব যখন কার্বন নিরপেক্ষ অর্থনীতির দিকে এগোচ্ছে, তখন শিল্পকারখানার চিমনি থেকে বেরিয়ে যাওয়া অপচয় তাপকে নতুন জ্বালানির উৎসে পরিণত করার এই প্রযুক্তি ভবিষ্যতের টেকসই জ্বালানি ব্যবস্থায় একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হয়ে উঠতে পারে।
ভিডিও প্রতিবেদনে দেখুন:
https://www.youtube.com/watch?v=v7_zYs-jxb8


