সংসদে প্রয়োজনীয় সংখ্যক ভোট না থাকলেও রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে প্রার্থী দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় জোট। জয়-পরাজয়ের হিসাবের চেয়ে নির্বাচনকে ঘিরে রাজনৈতিক বার্তা দেওয়াকেই বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে জোটটি। বিশেষ করে জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়ন এবং রাষ্ট্রপতি নির্বাচন পদ্ধতি নিয়ে নিজেদের অবস্থান স্পষ্ট করতেই তারা নির্বাচনে অংশ নিচ্ছে বলে জানিয়েছেন জোটের নেতারা।
জোটের প্রার্থী হিসেবে এলডিপি চেয়ারম্যান কর্নেল (অব.) অলি আহমদ বীরবিক্রমের নাম সামনে এসেছে। জোট গঠনের সময় তাকে রাষ্ট্রপতি প্রার্থী করার বিষয়ে জামায়াতের পক্ষ থেকে প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন। সংসদে প্রয়োজনীয় ভোট না থাকায় প্রার্থী হওয়ার বিষয়ে অলি আহমদের মতামত নেওয়া হলে তিনি আগ্রহ প্রকাশ করেন। এরপরই নির্বাচনে অংশ নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয় ১১ দল।
জোটের নেতাদের মতে, একজন খেতাবপ্রাপ্ত মুক্তিযোদ্ধাকে রাষ্ট্রপতি প্রার্থী করার মধ্য দিয়ে তারা রাজনৈতিকভাবে একটি ভিন্ন বার্তা দিতে চায়। বিশেষ করে মুক্তিযুদ্ধের সঙ্গে অলি আহমদের সংশ্লিষ্টতা এবং বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা জিয়াউর রহমানের সঙ্গে তার রাজনৈতিক সম্পর্ককে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
ভোটের সমীকরণে জয় বিএনপির
সংবিধানের ৪৮(১) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, সংসদ সদস্যদের ভোটে রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হন। ১৯৯১ সালের রাষ্ট্রপতি নির্বাচন আইন অনুযায়ী, সংসদের ৩৫০ জন সদস্য এ নির্বাচনের ভোটার। রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হতে প্রয়োজন ১৭৫ ভোট। বর্তমান সংসদে বিএনপির এককভাবে ২৪৭ জন সদস্য রয়েছেন। অন্যদিকে জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন জোটের এমপি সংখ্যা ৯০। ফলে ভোটের বর্তমান সমীকরণে বিএনপি মনোনীত প্রার্থীর জয় অনেকটাই নিশ্চিত বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। এছাড়া সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, দলীয় সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে ভোট দিলে সংশ্লিষ্ট সংসদ সদস্যের সদস্যপদ বাতিল হতে পারে। ফলে দলীয় প্রার্থীর বিপক্ষে ভোট দেওয়ার সম্ভাবনাও সীমিত।
জুলাই সনদকে সামনে আনতে চায় ১১ দল
১১ দলীয় জোটের নেতারা বলছেন, রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে অংশ নেওয়ার অন্যতম উদ্দেশ্য জুলাই জাতীয় সনদের বিষয়টি সামনে রাখা। তাদের দাবি, জুলাই সনদ অনুযায়ী রাষ্ট্রপতি নির্বাচন গোপন ব্যালটে হওয়ার কথা থাকলেও বর্তমান আইনে সংসদ সদস্যদের প্রকাশ্যে ভোট দেওয়ার বিধান রয়েছে। এনসিপির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম বলেন, বিএনপিসহ রাজনৈতিক দলগুলো আগে গোপন ব্যালটে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের বিষয়ে একমত হয়েছিল। কিন্তু বর্তমানে ১৯৯১ সালের আইনে প্রকাশ্য ভোটের বিধান রয়েছে। তার মতে, সংবিধান সংস্কারের আগে শুধু আইন সংশোধনের মাধ্যমে গোপন ব্যালটে ভোটের ব্যবস্থা করা সম্ভব। ১১ দল ও এনসিপির অভিযোগ, বিএনপি অন্যান্য বিষয়ের মতো রাষ্ট্রপতি নির্বাচনেও জুলাই সনদের অবস্থান মানছে না। এ বিষয়টি জনগণের সামনে তুলে ধরার জন্যই রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে অংশ নেওয়াকে রাজনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ মনে করছে তারা।
‘গণতান্ত্রিক চর্চা ফেরাতেই প্রার্থী’
জোটের নেতারা অবশ্য বলছেন, তাদের কাছে জয়-পরাজয়ের চেয়ে নির্বাচনী প্রক্রিয়ায় অংশগ্রহণই গুরুত্বপূর্ণ। তাদের দাবি, অতীতে টানা সাতবার রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে ভোট গ্রহণের প্রয়োজন হয়নি; ক্ষমতাসীন দলের মনোনীত প্রার্থীরা বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হয়েছেন। এবার সেই ধারার বাইরে গিয়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতামূলক নির্বাচন আয়োজনের সুযোগ তৈরি হয়েছে। এবি পার্টির সাধারণ সম্পাদক ব্যারিস্টার আসাদুজ্জামান ফুয়াদ বলেন, রাষ্ট্রপতিসহ গুরুত্বপূর্ণ সাংবিধানিক পদে দলীয় পরিচয়ের ঊর্ধ্বে উঠে সর্বজনগ্রাহ্য ব্যক্তিকে নিয়োগের প্রস্তাব ছিল সংস্কার আলোচনায়। তার দাবি, বিএনপি এখনো জাতির সামনে এমন কোনো সর্বজনগ্রাহ্য প্রার্থী হাজির করতে পারেনি।
অলি আহমদকে ঘিরে বিশেষ রাজনৈতিক হিসাব
জোটের প্রার্থী হিসেবে অলি আহমদকে বেছে নেওয়ার পেছনে রাজনৈতিক হিসাবও রয়েছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন। মুক্তিযুদ্ধের বীরবিক্রম খেতাবপ্রাপ্ত অলি আহমদের রাজনৈতিক পরিচয় এবং জিয়াউর রহমানের সঙ্গে তাঁর ঘনিষ্ঠতার বিষয়টি গুরুত্ব পাচ্ছে। জামায়াত দীর্ঘদিন ধরে মুক্তিযুদ্ধের বিরোধিতার অভিযোগে বিএনপিসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের সমালোচনার মুখে রয়েছে। জোটসংশ্লিষ্ট কয়েকজন নেতার মতে, একজন খেতাবপ্রাপ্ত মুক্তিযোদ্ধাকে সামনে এনে সেই রাজনৈতিক সমালোচনার মোকাবেলা করাও তাদের কৌশলের অংশ।
১১ দলীয় জোটের সমন্বয়ক ও জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল হামিদুর রহমান আযাদ বলেন, তারা মুক্তিযুদ্ধের বীরবিক্রম, যোগ্য, পরিচ্ছন্ন ও সর্বজন শ্রদ্ধেয় একজন ব্যক্তিকে রাষ্ট্রপতি পদে প্রার্থী করতে যাচ্ছেন। তার দাবি, দলীয় সংকীর্ণতার বাইরে গিয়ে রাজনীতি করছে জামায়াত।
৩৫ বছর পর আবার ভোটের লড়াই
সংসদীয় গণতন্ত্র পুনঃপ্রবর্তনের পর ১৯৯১ সালে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে সর্বশেষ সরাসরি প্রতিদ্বন্দ্বিতার মাধ্যমে ভোট হয়েছিল। ওই নির্বাচনে বিএনপির প্রার্থী আবদুর রহমান বিশ্বাস ১৭২ ভোট পেয়ে জয়ী হন। আওয়ামী লীগের প্রার্থী বিচারপতি বদরুল হায়দার চৌধুরী পান ৯২ ভোট। জাতীয় পার্টির ৩৫ জন সংসদ সদস্য ভোট দেওয়া থেকে বিরত ছিলেন। ওই নির্বাচনে জামায়াতের ১৮ জন এমপি বিএনপির প্রার্থীকে ভোট দিয়েছিলেন।
এরপর অনুষ্ঠিত রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে ক্ষমতাসীন দলের মনোনীত প্রার্থীরাই বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হয়েছেন। প্রায় ৩৫ বছর পর এবার বিরোধী জোট প্রার্থী দেওয়ায় রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে আবারও ভোটের প্রতিদ্বন্দ্বিতা হতে যাচ্ছে। ফলে জয়-পরাজয়ের সম্ভাবনা সীমিত হলেও ১১ দলীয় জোটের প্রার্থিতা রাষ্ট্রপতি নির্বাচনকে রাজনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ করে তুলেছে। জোটের নেতারা বলছেন, তাদের লক্ষ্য শুধু ভোটের লড়াই নয়; বরং জুলাই সনদ, নির্বাচন পদ্ধতি ও সাংবিধানিক সংস্কার নিয়ে নিজেদের অবস্থান স্পষ্ট করা।


