রাত ১২টার পর দোকান বন্ধ নিশ্চিত করতে নিকুঞ্জ-টানপাড়ায় ওসির রাতভর পরিদর্শন

দোকান বন্ধ

বিশেষ প্রতিনিধি: রাত ১২টার পর রাজধানীর খিলক্ষেতের নিকুঞ্জ-টানপাড়া এলাকায় দোকানপাট বন্ধ রাখার দাবির বাস্তবায়ন দেখতে নিজেই মাঠে নেমেছেন খিলক্ষেত থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) মুহাম্মদ সোহরাব আল হোসাইন। শনিবার গভীর রাতে নিকুঞ্জ-টানপাড়ার বিভিন্ন সড়ক ও গুরুত্বপূর্ণ স্থান ঘুরে দোকান বন্ধের অগ্রগতি, রাতের পরিবেশ এবং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি সরেজমিনে পর্যবেক্ষণ করেন তিনি।

এ সময় তাঁর সঙ্গে ছিলেন নিকুঞ্জ টানপাড়া কল্যাণ সোসাইটির সভাপতি ও জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক জাহিদ ইকবালসহ সোসাইটির অন্যান্য নেতৃবৃন্দ। খিলক্ষেত থানার ১ নম্বর বিটের ইনচার্জ এসআই সালাউদ্দিন রাসেল, এসআই মোয়াজ্জেমসহ পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারাও এ সময় উপস্থিত ছিলেন।

স্থানীয় বাসিন্দাদের দীর্ঘদিনের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে রাত ১২টার পর নিকুঞ্জ-২ ও টানপাড়া এলাকার দোকানপাট বন্ধ রাখার বিষয়ে গত তিন দিন ধরে খিলক্ষেত থানা থেকে ব্যবসায়ীদের সতর্ক করা হচ্ছিল।

এরই ধারাবাহিকতায় শনিবার রাতে সোসাইটির নেতাদের সঙ্গে নিয়ে এলাকায় বের হন ওসি সোহরাব আল হোসাইন। রাত বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বিভিন্ন এলাকায় দোকানপাট বন্ধ হচ্ছে কি না, কোথাও অযথা আড্ডা বা সন্দেহজনক লোকজনের আনাগোনা রয়েছে কি না—এসব বিষয় তিনি সরেজমিনে দেখেন।

রাতের এই পরিদর্শনে টানপাড়ার বটতলা, ১ নম্বর রোডের ভেতরে আশার আলোর সামনে ও কাঁচাবাজারের আশপাশ, পুরো জামতলা রোড, জাহিদ ইকবাল চত্বর, জামতলা বালুর মাঠ, বিআরটিসি মসজিদসংলগ্ন সড়ক এবং আইজ্জার বস্তিসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্থান ঘুরে দেখা হয়। পাশাপাশি নিকুঞ্জ-২-এর কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ সড়কও পরিদর্শন করেন পুলিশের কর্মকর্তারা।

স্থানীয়দের অভিযোগ, গভীর রাত পর্যন্ত কিছু দোকান খোলা থাকাকে কেন্দ্র করে বিভিন্ন সময় আড্ডা, মাদকসেবন, ছিনতাইসহ নানা ধরনের অনাকাঙ্ক্ষিত কর্মকাণ্ডের আশঙ্কা তৈরি হয়। বিশেষ করে আবাসিক এলাকায় রাত গভীর হওয়ার পর দোকানপাট খোলা থাকলে সেখানে অপ্রয়োজনীয় লোকজনের আনাগোনা বাড়ে। এ কারণে রাত ১২টার পর দোকান বন্ধ রাখাকে শুধু একটি প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নয়, বরং এলাকাবাসীর নিরাপত্তার সঙ্গে সম্পর্কিত একটি জনদাবি হিসেবে দেখছেন স্থানীয়রা।

খিলক্ষেত থানার ওসি মুহাম্মদ সোহরাব আল হোসাইন বলেন, “রাত ১২টার পর কোনোভাবেই দোকান খোলা রাখা যাবে না। বিষয়টি এরই মধ্যে ব্যবসায়ীদের জানানো হয়েছে। এরপরও কেউ নির্দেশনা অমান্য করে দোকান খোলা রাখলে প্রয়োজন অনুযায়ী আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”

তিনি বলেন, “জননিরাপত্তার বিষয়টি সবার আগে। রাতের বেলায় কোনো দোকান যেন মাদকসেবন, আড্ডা বা অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের সুযোগ তৈরি করতে না পারে, সে বিষয়ে পুলিশ নজর রাখবে। শুধু একদিন অভিযান চালিয়ে থেমে গেলে হবে না; নিয়মিত মনিটরিং করা হবে।”

ওসি আরও বলেন, “এলাকার মানুষ নিরাপদে ঘুমাবে—এটাই আমাদের দায়িত্ব। কোনো ব্যক্তি, গোষ্ঠী বা অন্য কোনো চাপের কারণে জননিরাপত্তার বিষয়ে ছাড় দেওয়া হবে না। কেউ নিয়ম ভাঙলে তার বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”

পুলিশের এই উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়েছেন নিকুঞ্জ-টানপাড়ার বাসিন্দারা। তাঁদের মতে, রাত ১২টার পর দোকানপাট বন্ধের বিষয়টি দীর্ঘদিনের প্রত্যাশা। কারণ রাত গভীর হওয়ার পর আবাসিক এলাকায় অপ্রয়োজনীয় মানুষের চলাচল কমিয়ে আনতে পারলে মাদকসেবন, ছিনতাইসহ বিভিন্ন অপরাধের ঝুঁকিও কমবে।

নিকুঞ্জ টানপাড়া কল্যাণ সোসাইটির সভাপতি জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক জাহিদ ইকবাল বলেন, “রাত ১২টার পর দোকান বন্ধের দাবিটি কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে নয়; এটি এলাকার মানুষের নিরাপত্তার দাবিতে গড়ে ওঠা একটি জনদাবি। খিলক্ষেত থানার ওসি মুহাম্মদ সোহরাব আল হোসাইন বিষয়টিকে গুরুত্ব দিয়ে যেভাবে মাঠে নেমেছেন, তা অবশ্যই প্রশংসনীয়।”

তিনি বলেন, “বিশেষ করে একজন মানবিক ও দায়িত্বশীল পুলিশ কর্মকর্তা হিসেবে ওসি সোহরাব আল হোসাইনের এই ভূমিকা এলাকাবাসীর মধ্যে আস্থা তৈরি করেছে। আমরা চাই, রাত ১২টার পর দোকান বন্ধের এই কার্যক্রম শুধু কয়েক দিন নয়, নিয়মিত মনিটরিংয়ের মাধ্যমে অব্যাহত থাকুক।”

জাহিদ ইকবাল আরও বলেন, “জননিরাপত্তার প্রশ্নে কোনো দল-মত, পরিচয় কিংবা রক্তচক্ষুকে গুরুত্ব দেওয়ার সুযোগ নেই। আমাদের অবস্থান পরিষ্কার—মাদক, ছিনতাই ও অপরাধমুক্ত নিরাপদ আবাসিক এলাকা চাই। এই কর্মসূচির প্রতি এলাকাবাসীর পূর্ণ সমর্থন রয়েছে। পুলিশ প্রশাসনও যদি ধারাবাহিকভাবে পাশে থাকে, তাহলে নিকুঞ্জ-টানপাড়ায় রাতের নিরাপত্তা পরিস্থিতিতে স্থায়ী পরিবর্তন আনা সম্ভব।”

তিনি বলেন, “আমরা খিলক্ষেত থানার সহযোগিতাকে সাধুবাদ জানাই। একই সঙ্গে অনুরোধ থাকবে, যেসব এলাকায় অতীতে গভীর রাতে আড্ডা বা অপরাধের অভিযোগ ছিল, সেসব স্থানে নিয়মিত টহল ও আকস্মিক তদারকি অব্যাহত রাখা হোক। আজ যে উদ্যোগ শুরু হয়েছে, সেটি যেন কোনোভাবেই সাময়িক কর্মসূচিতে পরিণত না হয়।”

সোসাইটির নেতারা জানান, রাত ১২টার পর দোকান বন্ধের উদ্যোগ বাস্তবায়নে তাঁরা পুলিশকে সহযোগিতা করবেন। কোনো দোকানদারকে হয়রানি করা নয়, বরং আবাসিক এলাকার স্বাভাবিক পরিবেশ ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করাই তাঁদের মূল উদ্দেশ্য। একই সঙ্গে ব্যবসায়ীদেরও দায়িত্বশীল হয়ে নির্ধারিত সময়ের পর দোকান বন্ধ রাখার আহ্বান জানান তাঁরা।

এলাকাবাসীর প্রত্যাশা, রাত ১২টার পর দোকানপাট বন্ধের পাশাপাশি নিকুঞ্জ-২ ও টানপাড়ার গুরুত্বপূর্ণ সড়ক, অলিগলি ও আগে থেকে চিহ্নিত ঝুঁকিপূর্ণ স্থানগুলোতে পুলিশের নিয়মিত টহল থাকবে। এতে শুধু মাদক বা ছিনতাই নয়, রাতের অন্যান্য অপরাধও নিয়ন্ত্রণে আসবে বলে মনে করছেন তাঁরা।

স্থানীয়দের ভাষায়, রাত যত গভীর হবে, আবাসিক এলাকা তত নিরাপদ থাকবে—এটাই তাঁদের প্রত্যাশা। আর সেই প্রত্যাশা বাস্তবায়নে পুলিশ ও জনগণের সমন্বিত উদ্যোগই এখন সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন।

Scroll to Top