বিশ্বকাপের উন্মাদনায় ভাসছে পুরো বিশ্ব। বাংলাদেশও এর ব্যতিক্রম নয়। ফুটবল নেশন হিসেবে গড়ে উঠতে না পারলেও; ফুটবলের প্রতি প্রেম ভালোবাসার কমতি নেই বাংলাদেশে। ফিফা বিশ্বকাপের সময়ে দেশের ওলিগলি, বাড়ির ছাদ, ব্যবসা প্রতিষ্ঠান; এমনকি পরিবহনেও প্রিয় দলের পতাকা সাঁটিয়ে নিজেকে তুখোর সমর্থক হিসেবে জাহির করেন অনেকে।
বিশ্বকাপের সময়ে বাংলাদেশের ফুটবলপ্রেমীরা দুটি দলে বিভক্ত হয়ে পরেন। কেউ আর্জেন্টিনা আবার কেউ ব্রাজিলের জার্সি গায়ে প্রিয় দলের জন্য গলা ফাটান, চায়ের আড্ডায় প্রিয় তারকাদের নিয়ে গালগল্প করে সময় কাটান। এমন অনেকে আছেন- প্রিয় দলের জন্য তর্কে জড়িয়ে জীবন দিতেও দ্বিধা করেন না।
বিশ্বকাপের এবারের আসর শুরু পর থেকেই বাংলাদেশে ব্রাজিল-আর্জেন্টিনার সমর্থকরা বিশাল পতাকা টানিয়ে নিজেদের দলের প্রতি ভালোবাসা প্রকাশ করেন। একে অপরকে ছাড়িয়ে যাওয়ার প্রতিযোগিতায় মেতে ওঠেন।
রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় দেখা যাচ্ছে লিওনেল মেসির বিশাল মুখচ্ছবি। আর আর্জেন্টিনা ও ব্রাজিলের জার্সি কিনতে ফুটবলপ্রেমীদের ভিড় জমছে ঢাকার গুলশানের ক্রীড়াসামগ্রীর দোকানগুলোতে।
২০২২ সালে বাংলাদেশের ফুটবলপ্রেমীদের উন্মাদনা ফিফা এবং আর্জেন্টিনার খেলোয়াড়দের নজর কেড়েছিল। নিজেদের দেশ থেকে প্রায় ১৭ হাজার কিলোমিটার দূরের একটি দেশের মানুষদের কাছ থেকে এমন অকুণ্ঠ সমর্থন পেয়ে তারা অভিভূত হয়েছিলেন। আর বাংলাদেশে আর্জেন্টিনার প্রতি এই ভালোবাসার কেন্দ্রবিন্দুতে আছেন কিংবদন্তি ফুটবলার ডিয়েগো ম্যারাডোনা।
চলতি বছর বিশ্বকাপ শুরুর পর থেকেই বাংলাদেশের কোটি কোটি মানুষ আর্জেন্টিনা ও ব্রাজিলের পক্ষে সমর্থন জানিয়েছেন। এটি এমন এক ফুটবল উন্মাদনার চিত্র, যা জাতীয় সীমানার গণ্ডি পেরিয়ে গেছে।
ভৌগোলিক বা রাজনৈতিকভাবে বাংলাদেশের সঙ্গে লাতিন আমেরিকার দেশ আর্জেন্টিনার কোনো বিশেষ সম্পর্ক না থাকলেও, দেশটির প্রতি বাংলাদেশিদের টান প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে ছড়িয়ে পড়েছে। বিশ্বকাপ এলেই এই সমর্থন এতটাই তীব্র হয়ে ওঠে যে অনেক সময় ঘনিষ্ঠ বন্ধুরাও প্রতিপক্ষে পরিণত হয়।
যদিও বাংলাদেশে ফুটবল সমর্থনের মূল কেন্দ্রবিন্দু ব্রাজিল ও আর্জেন্টিনা, তবু বিশ্বকাপে অংশ নেওয়া অন্য দেশগুলোও মাঝে মাঝে মানুষের আগ্রহের কেন্দ্রবিন্দু হয়ে ওঠে।
ভারতীয় উপমহাদেশে ফুটবল খেলার প্রচলন শুরু হয় ১৯ শতকে। ব্রিটিশ শাসকেরা তৎকালীন অবিভক্ত ভারতের রাজধানী কলকাতায় প্রথম এই খেলার প্রচলন করেন। ষাট ও সত্তরের দশকে বাংলাদেশ (তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান) যখন রাজনৈতিক অস্থিরতার মধ্য দিয়ে যাচ্ছিল, তখন অনেক তরুণ ফুটবলের মধ্যে আনন্দ, আশা এবং অনুপ্রেরণা খুঁজে পেয়েছিলেন।
সেই সময়ের তরুণদের কাছে অনুপ্রেরণার প্রতীক ছিল ব্রাজিল। দলটি তখন ইতিহাসের সবচেয়ে সফল ফুটবল দলগুলোর একটি ছিল। সে সময় কিংবদন্তি ফুটবলার পেলে বাংলাদেশের মানুষের প্রিয় নায়কে পরিণত হন। তার খেলা ও সাফল্য দেশের পরবর্তী প্রজন্মের অসংখ্য ফুটবলারের অনুপ্রেরণা হয়ে ওঠে।
আশির দশকের মাঝামাঝি সময়ে বাংলাদেশে টেলিভিশনের ব্যবহার বাড়তে শুরু করলে ফুটবলের জনপ্রিয়তাও দ্রুত বাড়তে থাকে। অনেক বাংলাদেশির জন্য ১৯৮৬ সালের বিশ্বকাপই ছিল রঙিন টেলিভিশনে দেখা প্রথম বিশ্বকাপ। সেই বিশ্বকাপে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে আর্জেন্টিনার ফুটবলার ডিয়েগো ম্যারাডোনার ঐতিহাসিক গোল দুটি ফুটবলের গণ্ডি ছাড়িয়ে বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছিল। সাবেক ঔপনিবেশিক শক্তি ইংল্যান্ডের বিপক্ষে আর্জেন্টিনার সেই জয়কে অনেকেই প্রতীকী বিজয় হিসেবে দেখেছিলেন।
নতুন প্রজন্মের সমর্থকদের কাছে ডিয়েগো ম্যারাডোনার রেখে যাওয়া শূন্যস্থান পূরণ করেছেন আর্জেন্টিনার তারকা লিওনেল মেসি। অন্যদিকে, ব্রাজিল সমর্থকদের কাছে সবচেয়ে প্রিয় খেলোয়াড় হয়ে উঠেছেন নেইমার।




