নিজের প্রথম পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র ‘আদিম’ দিয়েই আলোচনায় উঠে আসেন স্বাধীন চলচ্চিত্র নির্মাতা যুবরাজ শামীম। ছবিটি জায়গা করে নেয় মস্কো আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসব-এর ৪৪তম আসরের প্রতিযোগিতা বিভাগে এবং অর্জন করে আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি। সেই সাফল্যের ধারাবাহিকতায় প্রায় চার বছর পর দ্বিতীয় চলচ্চিত্র ‘অতল’ নিয়ে আবারও একই উৎসবে হাজির হয়েছেন এই নির্মাতা। তবে এবার ‘অতল’ প্রতিযোগিতা বিভাগে নয়, প্রদর্শিত হচ্ছে উৎসবের ‘অ্যাপোক্যালিপস নাউ’ বিভাগে।
ইতোমধ্যে গত রবিবার (১৯ এপ্রিল) হয়েছে সিনেমাটির প্রিমিয়ার। সিনেমার চিত্রগ্রাহক ও প্রধান চরিত্রে অভিনয় করা নাঈম তুষার-কে সঙ্গে নিয়ে বর্তমানে মস্কোতেই অবস্থান করছেন যুবরাজ শামীম। আন্তর্জাতিক এই মঞ্চে নিজের নতুন কাজ ‘অতল’ নিয়ে অভিজ্ঞতা, ভাবনা ও প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন নির্মাতা—
মস্কোর ৪৮তম আসরে ‘অতল’ এর বিশ্ব প্রিমিয়ার হলো গত রবিবার। কেমন রেসপন্স পেলেন?
রেসপন্স আমার কাছে বেশ ভালোই মনে হলো। অন্যান্য ছবিগুলোতে প্রচুর দর্শক দেখেছি, আমাদের ‘অতল’-এর দর্শক কম ছিলো, কিন্তু যারাই দেখেছেন; বেশ ভালো রেসপন্স পেয়েছি।

‘অতল’ দেখার পর বিদেশি দর্শকদের তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া কেমন ছিল? কেউ কি বিশেষ কোনো দৃশ্য বা মুহূর্ত নিয়ে কথা বলেছেন?
প্রবাসী বাংলাদেশিদের তো অনেকেই ‘অতল’ দেখতে এসেছিলেন। তারা নানাভাবে সিনেমাটি নিজেদের মতো ভেবেছেন। কিন্তু মস্কোর স্থানীয় একজন দর্শক সিনেমা শেষে এসে নিজের প্রতিক্রিয়া জানিয়ে বলছিলেন, ‘এই মুহূর্তে মস্কোতে যে অস্থিরতা চলছে, এমন পরিস্থিতে আপনার সিনেমাটা খুব প্রাসঙ্গিক।’ কারণ এটি তো আসলে খুব মেডিটেটিভ সিনেমা! এবং তিনি এও বললেন, ‘অতল মস্কো উৎসবের এবারের খুব ভালো একটি সিলেকশন!’ আরো কয়েকজন সিনেমাটি নিয়ে তাদের মন্তব্য জানিয়েছেন, আবার অনেকে এই সিনেমা নির্মাণের প্রক্রিয়া নিয়ে জানতে চাইছেন, কী অনুভূতির ভেতর দিয়ে যাওয়ার পর ‘অতল’ নির্মাণ করলাম; এসবও জানতে চাইছেন- তবে এসবের মধ্যে মস্কোর স্থানীয় দর্শকের কথাগুলো ‘অতল’ কিংবা আমার জন্য বিশেষই বলবো।
আন্তর্জাতিক সমালোচকরা সিনেমাটির ভাষা, গতি বা নির্মাণশৈলী নিয়ে কী বলেছেন?
সিনেমাটি দেখার পরে দর্শকদের মধ্য থেকে একজন এসে আমাকে জিজ্ঞেস করলেন ‘আপনি তারকোভস্কির সিনেমা সম্পর্কে জানেন কিনা?’, উনার প্রশ্নে আমি তখন বলেছি ‘অবশ্যই, এবং আমি উনার কাজ খুব ভালোবাসি। বেলা তারকে আমার ভালো লাগে।’ এখন উনি সমালোচক কিনা, সেটা আমি জানি না।

‘স্লো সিনেমা’ নিয়ে পশ্চিমা দর্শকের পাঠ আর বাংলাদেশের দর্শকের পাঠ, কোনো পার্থক্য দেখলেন?
প্রিমিয়ারে যতো দর্শক ছিলো, তারমধ্যে কয়েকজন সিনেমার মাঝখান থেকে উঠে চলে গেছে, অনেকের একটু ঘুমও পাইছে দেখলাম; কিন্তু মেক্সিমাম দর্শকই খুব মনযোগ দিয়ে সিনেমাটি দেখেছেন। আর প্রশ্নোত্তর পর্বে সাধারণত এতো মানুষ থাকে না, বেশীর ভাগ দর্শক সিনেমা শেষ হতে চলে যান; কিন্তু ‘অতল’ শেষ হওয়ার পর মোটামুটি অনেক দর্শকই ছিলেন, নানা বিষয়ে তারা প্রশ্নও করেছেন। সেই জায়গা থেকে বুঝতে পারি, এখানে স্লো সিনেমায় অভ্যস্ত দর্শক আছেন, যারা হয়তো নিয়মিত স্লো সিনেমা দেখেন। আর না থাকার কোনো কারণও নাই, এখানে তো বহু বিখ্যাত বিখ্যাত নির্মাতারা আছেন, যারা স্লো সিনেমা বানাইছেন। ফলে ‘অতল’ দেখে মস্কোর দর্শক খুব যে বোরড হইছেন, এমনটা আমার মনে হয় না। যেহেতু এই সিনেমা নিয়ে এখনো বাংলাদেশি দর্শকদের ডিল করি নাই, আমি এখনো জানি না বাংলাদেশি দর্শকরা এই সিনেমাটি কীভাবে দেখবে, দেখা যাক সামনে!
‘অতল’-এর প্রধান চরিত্র নাঈম তুষার, তার ব্যক্তিগত রূপান্তরের গল্প জেনে বিদেশি দর্শক বা সমালোচকদের প্রতিক্রিয়া কেমন ছিল?
সত্যি কথা বলতে, ‘অতল’-এর প্রথম প্রদর্শনীর পর প্রশ্নোত্তর পর্বে সিনেমা এবং নির্মাতা হিসেবে সবাই আমাকেই নানা বিষয়ে প্রশ্ন করেছেন। আসলে সিনেমা এবং এর নির্মাণ প্রক্রিয়া নিয়েই কৌতুহলী ছিলেন দর্শক। ফলে তুষার ভাইয়ের রূপান্তরের গল্পটা সেভাবে বলা হয়নি, বা জানানোর সুযোগও ছিলো না।

বাংলাদেশের দর্শক যখন ‘অতল’ দেখবে, আন্তর্জাতিক দর্শকের প্রতিক্রিয়ার সঙ্গে তার তফাত কোথায় হতে পারে বলে মনে হয়?
মানুষের মৌলিক চাহিদাগুলো পূরণ হওয়ার পরই মূলত বিনোদন, শিল্প ও সাহিত্য নিয়ে ভাবার সুযোগ তৈরি হয়। আমাদের দেশে তো আসলে মানুষের মৌলিক অধিকারের নিশ্চয়তাই নাই। যে মানুষ সারাক্ষণ বেঁচে থাকার জন্য যুদ্ধ করছে, পরিশ্রম করছে- সে তো আসলে ফুরসত পেলে নির্মল বিনোদন চাইবে। আর আমাদের এখানে সিনেমা এখনো প্রধানত বিনোদন হিসেবেই দেখা হয়; শিল্পমান বা আর্ট হিসেবে গ্রহণ করার সংস্কৃতি খুব একটা গড়ে ওঠেনি। তবুও এমন এক শ্রেণির দর্শক আছেন, যারা ভিন্নধর্মী, ভাবনাধর্মী সিনেমা দেখতে আগ্রহী। সেই জায়গা থেকে বলা যায়, ‘অতল’ তাদের জন্য একটি বিশেষ অভিজ্ঞতা হয়ে উঠতে পারে। আর বাংলাদেশের প্রেক্ষাগৃহে ‘অতল’-এর মুক্তি নিঃসন্দেহে এক নতুন ধরনের সিনেমাটিক যাত্রার সূচনা- এটুকু বলতে পারি।
মস্কোতে ‘অতল’-এর যাত্রা কবে শেষ হচ্ছে?
বুধবার (২২ এপ্রিল), এদিন মস্কোর স্থানীয় সময় দুপুর পৌনে ৩টায় ‘অতল’-এর দ্বিতীয় ও শেষ প্রদর্শনী।





