বাংলাদেশের জনপ্রিয় কথাসাহিত্যিক ও নির্মাণের মহান কারিগর হুমায়ূন আহমেদ বাংলা সাহিত্যে সৃষ্টি করেছেন অসংখ্য কালজয়ী চরিত্র। রসায়নের মতো কঠিন বিষয়ের অধ্যাপক হয়েও তিনি পাঠকদের উপহার দিয়েছেন বাকের ভাই, হিমু, শুভ্র ও মিসির আলির মতো অবিস্মরণীয় চরিত্র। তার লেখনির জাদু এমনই ছিল যে, শিশু থেকে প্রাপ্তবয়স্ক- সব বয়সী পাঠক-দর্শক মুগ্ধ হয়ে ডুবে যেতেন তার গল্পের জগতে। বিশেষ করে তার উপন্যাসগুলো তরুণদের কাছে একসময় প্রায় পূজিত হয়ে ওঠে। অনেক ভক্তই হিমু, রূপা, শুভ্র কিংবা মিসির আলির মতো হয়ে ওঠার স্বপ্ন দেখেন।
এই জনপ্রিয়তারই প্রতিফলন দেখা যায় ২০১৩ সালে, হুমায়ূন আহমেদের প্রথম মৃত্যুবার্ষিকীতে প্রতিষ্ঠিত ‘হিমু পরিবহন’ সংগঠনের মাধ্যমে। লেখকের একদল ভক্তের উদ্যোগে গড়ে ওঠা সংগঠনটি বর্তমানে হুমায়ূন আহমেদের জন্মদিন উদ্যাপন, নুহাশপল্লী ভ্রমণ এবং দেশজুড়ে ক্যানসার সচেতনতাসহ নানা সামাজিক কার্যক্রম পরিচালনা করে আসছে।
হুমায়ূনের সৃষ্ট চরিত্রগুলোর মধ্যে মিসির আলি এক অনন্য নাম। হিমুর মতোই জনপ্রিয় হলেও চরিত্রগত দিক থেকে তিনি সম্পূর্ণ বিপরীত। অনেকেই মনে করেন, মিসির আলির মধ্যে লেখক হুমায়ূন আহমেদেরই প্রতিফলন রয়েছে। যদিও হুমায়ূন আহমেদ নিজে এ ধারণা কখনোই স্বীকার করেননি। তবু তুলনার কারণও কম নয়। দুজনই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, দুজনেরই বিষয় বিজ্ঞান, দুজনই স্পষ্টভাষী এবং যুক্তিনির্ভর চিন্তাধারার অনুসারী। তবে মিসির আলি নিছক বাস্তব কোনো মানুষের প্রতিরূপ নন; তিনি লেখকের কল্পনায় নির্মিত এক স্বতন্ত্র ব্যক্তিত্ব।
উপন্যাসে মিসির আলিকে দেখা যায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মনোবিজ্ঞান বিভাগের খণ্ডকালীন অধ্যাপক হিসেবে। তিনি শান্ত, সংযত, পর্যবেক্ষণশীল এবং গভীরভাবে যুক্তিবাদী। সমাজে অতিপ্রাকৃত বা অলৌকিক বলে প্রচলিত ঘটনাগুলোর পেছনে তিনি খুঁজে ফেরেন বিজ্ঞানসম্মত ও যৌক্তিক ব্যাখ্যা। রহস্য, ভৌতিক অভিজ্ঞতা কিংবা অস্বাভাবিক আচরণ- সবকিছুকেই তিনি বিশ্লেষণ করেন পর্যবেক্ষণ, প্রকৃতি এবং বিজ্ঞানের আলোকে।
ব্যক্তিগত জীবনেও মিসির আলি অত্যন্ত সাদামাটা ও নিঃসঙ্গ। আত্মমর্যাদাবোধ প্রবল, কথাবার্তায় স্পষ্ট, আবার কিছুটা খেয়ালিও। তিনি ধূমপায়ী এবং নিজের সিদ্ধান্তে অনড়। রহস্য উদ্ঘাটনের জন্য প্রয়োজন হলে দিনের পর দিন ঘটনাস্থলে অবস্থান করতেও দ্বিধা করেন না। কোনো পারিশ্রমিকের প্রত্যাশা ছাড়াই, নিছক কৌতূহল ও সত্য অনুসন্ধানের নেশায় তিনি এসব কাজে যুক্ত হন। তবে নিজের ইচ্ছার বিরুদ্ধে তাকে দিয়ে কোনো কাজ করানো সম্ভব নয়।
তার বাসায় সাধারণত একটি কিশোর বা কিশোরী গৃহকর্মীর উপস্থিতি দেখা যায়, যাকে তিনি পড়াশোনা শেখানোর চেষ্টা করেন। কিন্তু সেই প্রচেষ্টা বেশিরভাগ সময়ই সফল হয় না। ছোট ছোট এই মানবিক ঘটনাগুলোই চরিত্রটিকে আরও জীবন্ত করে তোলে।
মিসির আলি প্রচলিত অর্থে কোনো গোয়েন্দা নন। তিনি অপরাধ তদন্তে অনুসরণ, ফরেনসিক পরীক্ষা বা প্রচলিত গোয়েন্দা কৌশলের ওপর নির্ভর করেন না। বরং মানুষের আচরণ, প্রকৃতির ইঙ্গিত এবং ঘটনার সূক্ষ্মতম দিকগুলো পর্যবেক্ষণ করে রহস্যের জট খুলতে চেষ্টা করেন। তার অনুসন্ধানের মূল শক্তি যুক্তি, বিশ্লেষণ এবং মনস্তত্ত্ব।
হুমায়ূন আহমেদের ভাষার সরলতা এবং গল্প বলার অসাধারণ ক্ষমতাই মিসির আলিকে পাঠকের কাছে এতটা বিশ্বাসযোগ্য ও প্রিয় করে তুলেছে। তাই চরিত্রটিকে পর্দায় তুলে ধরা সবসময়ই ছিল বড় চ্যালেঞ্জ। হুমায়ূন আহমেদের গল্প অবলম্বনে নির্মিত বিভিন্ন চলচ্চিত্র ও নাটকে আবুল খায়ের, হুমায়ুন ফরিদী, আবুল হায়াত, চঞ্চল চৌধুরীসহ মোট সাতজন গুণী অভিনেতা মিসির আলির চরিত্রে অভিনয় করেছেন। প্রত্যেকেই নিজস্ব দক্ষতার পরিচয় দিলেও পাঠকের কল্পনায় গড়ে ওঠা মিসির আলিকে যেন শতভাগ ধারণ করা সম্ভব হয়নি।
এটি অভিনেতাদের সীমাবদ্ধতা নয়; বরং হুমায়ূন আহমেদের লেখনির অসামান্য শক্তিরই প্রমাণ। শব্দের মাধ্যমে তিনি যে মিসির আলিকে নির্মাণ করেছেন, পাঠকের কল্পনায় সেই চরিত্র এতটাই জীবন্ত হয়ে উঠেছে যে, পর্দার কোনো রূপই তাকে পুরোপুরি ছাপিয়ে যেতে পারেনি। সেই অপূর্ণতাকেই এক অনন্ত আকাঙ্ক্ষায় পরিণত করে গেছেন বাংলা সাহিত্যের এই কিংবদন্তী কথাশিল্পী।




