মধ্যপ্রাচ্য, ইউরোপ ও আমেরিকার বাজারে রপ্তানী হচ্ছে রংপুরের জুতা | চ্যানেল আই অনলাইন

মধ্যপ্রাচ্য, ইউরোপ ও আমেরিকার বাজারে রপ্তানী হচ্ছে রংপুরের জুতা | চ্যানেল আই অনলাইন

এই খবরটি পডকাস্টে শুনুনঃ

বাংলাদেশের অর্থনীতি বদলে দিতে পর্দার নেপথ্যে কাজ করে যান কিছু সাহসী, স্বপ্নবাজ মানুষ। এই দেশের, এই মাটির শত শত দক্ষ যোদ্ধাদের সাথে নিয়ে সাহসী সেই মানুষগুলো যোগ্য নেতৃত্বে সাজিয়ে যান নতুন বাংলাদেশের মানচিত্র। তৈরি করেন নতুন স্বপ্ন দৃপ্ত প্রত্যয়ে। তেমনই দু’জন সাহসী ব্যাক্তিত্ব, আমেরিকা প্রবাসী সফল উদ্যোক্তা এবং বিজনেস লিডার মো. হাসানুজ্জামান ও মরহুম মো. সেলিম।

আশির দশকে আমেরিকা পাড়ি দেয়া নীলফামারী সদরের বাবুপাড়া গ্রামের এই দুই স্বর্ণসন্তান, আমেরিকায় সফল আবাসন ব্যবসার পর চিন্তা করেন দেশের মাটিতে বিনিয়োগের। সেই চিন্তা থেকেই তাদের হাতেই তৈরি হয় প্রায় ৩০০০ শ্রমিকের জুতা তৈরীর কারখানা। যেখান থেকে উৎপাদিত জুতা রপ্তানি হচ্ছে ভারত, দুবাই, পোল্যান্ড, জার্মানি, যুক্তরাজ্য, কানাডাসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে। মধ্যপ্রাচ্য, ইউরোপ ও আমেরিকার বাজারে শতভাগ রপ্তানিমুখি এ প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে দেশ আয় করছে বিপুল বৈদেশিক মুদ্রা। পাল্টে যাচ্ছে এলাকার জীবনযাত্রার মান।

রংপুরের তারাগঞ্জ উপজেলার ঘনিরামপুরের ব্লিং লেদার প্রোডাক্ট লিমিটেডের এই কারখানা সাড়ে পাঁচ একর জমির উপর প্রতিষ্ঠিত এই জুতা কারখানাটিতে কাজ করা ৩ হাজার শ্রমিকের প্রায় ৮০ শতাংশই নারী। যাতের হাতের সুনিপুন দেশেই তৈরি হচ্ছে বৈশ্বিক ব্রান্ডের পণ্য।

২০১৮ সালে ৩৫০ জন প্রশিক্ষিত শ্রমিক দিয়ে চালু হয় সিন্থেটিক জুতা উৎপাদনের কারখানাটি। চালুর পর দুই বছর করোনার ধাক্কা সামলিয়ে আমেরিকা প্রবাসী মো. হাসানুজ্জামান কারখানাটিকে আবারো ফেরান উৎপাদনে। ২০২৩ সালে বড় ভাই মো. সেলিম মারা গেলে বর্তমানে প্রতিষ্ঠানটির দক্ষ হাতে পরিচালনা করছেন মো. হাসানুজ্জামান। বর্তমানে প্রতিদিন ১৫ হাজার জোড়া জুতা উৎপাদন সক্ষমতার এই কারখানাটি বছরে আয় করছে প্রায় ৩০০ কোটি টাকা।

বর্তমানে ৩০০ শ্রমিকের থাকার জন্য আবাসিক ভবন যুক্ত এ কারখানায় তাইওয়ান থেকে আনা অত্যাধুনিক যন্ত্রপাতি দিয়ে তৈরি করা হয় আন্তর্জাতিক মানের জুতা।

শুক্রবার ১৪ ফেব্রুয়ারি উদ্বোধন হয় ব্লিং লেদার প্রোডাক্ট লিমিটেডের দ্বিতীয় ইউনিটের। ফিতা কেটে এই ইউনিটের উদ্বোধন করেন রূপালী ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও সিইও কাজী মো. ওয়াহিদুল ইসলাম। এ সময় উপস্থিত ছিলেন প্রতিষ্ঠানটির চেয়ারম্যান হাসানুজ্জামান ও নির্বাহী পরিচালক খাজা রেহান বখত।

প্রত্যন্ত গ্রামের মাঝে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে থাকা এই জুতোর কারখানা উত্তরের হাজারো মানুষের জীবনজীবিকার অবলম্বন পরিধি বেড়ে এ অঞ্চলের বেকারদের জন্য এটি একটি আশীর্বাদ।

তারাগঞ্জ উপজেলা সদর থেকে তিন কিলোমিটার দূরে ঘনিরামপুর গ্রামে মাথা তুলে দাঁড়িয়ে থাকা সাড়ে ৯ একর জমির ওপর নির্মিত ব্লিং লেদার প্রোডাক্টের চেয়ারম্যান মো. হাসানুজ্জামান বলেন, ভাইয়ের স্বপ্ন পূরণেই রংপুরে তৈরি করা হয়েছে এই ফ্যাক্টরি।

তিনি বলেন, দেশের জন্য কিছু একটা করার স্বপ্ন ছিল আমাদের দুই ভাইয়ের। বড় ভাইয়া স্বপ্ন বাস্তবায়নের শুরুটা করেন। বর্তমানে আমি বাস্তবায়ন করছি। বড় ভাই মরহুম মো. সেলিম ১৯৮৫ সালে দেশ ছেড়ে আমেরিকায় পাড়ি জমান। আমি যাই ১৯৯৩ সালে। ২০২৩ সালে বড় ভাই মরহুম সেলিম আমাদেরকে ছেড়ে চলে যান। শুরুতে আমি এতটা রেগুলার ছিলাম না কিন্তু ভাইয়া চলে যাওয়ার আগ মুহূর্তে থেকে আমার দায়িত্বটা নিতে হয়। বর্তমানে আমরা প্রতিদিন ৮ হাজার থেকে ১০ হাজার ইউনিট জুতা বানাই। ইউনিট ২ এ আরো ৫ হাজার জুতা তৈরি করা হবে। যার বাৎসরিক ক্যপাসিটি প্রায় ৩০ লাখ পেয়ার। ২০২৬ সালে আমরা এই উৎপাদন ৫০ লাখ পেয়ারে উন্নীত করতে চাই।

রপ্তানীখাতে রেমিটেন্স এবং সম্ভাবনা বিষয়ে শিল্পোদ্যোক্তা মো. হাসানুজ্জামান বলেন, এই সংকটময় মুহূর্তে যখন বৈদেশিক মূদ্রার প্রযোজন তখন আমরা বৈদেশিক মুদ্রা নিয়ে আসছি। আল্লাহর রহমতে আমরা পোল্যান্ড থেকে শুরু করেছিলাম। এখন পর্যন্ত ইন্ডিয়া দুবাই টার্কি ইটালি এবং ইউরোপের বিভিন্ন জায়গায় যে সবচেয়ে বেশি প্রাইস দেয় তার জন্য আমরা জুতা বানাই। এবং আমাদের লোকাল কোন জুতা নাই। আল্লাহ যদি আমাকে সক্ষম করে ২০২৬ সালে এই কোম্পানিটি স্টক মার্কেটে যাবে। তখন আমি বাংলাদেশে কিছু আউটলেট করে বাংলাদেশেও আমি জুতা সরবরাহ করব। আমি এই বছর আল্লাহর রহমে ৩২০ কোটি টাকা সমপরিমাণ বা ৩০ মিলিয়ন ডলার ইউএস ডলার এনেছি এবং ২০২৫ সালেই ইনশাআল্লাহ এটা ৪০০ কোটি বা ৪০ মিলিয়ন ডলারের কাছাকাছি পৌঁছে যাব।

বিদেশের মাটিতে বাংলাদেশের রপ্তানী সম্ভাবনা প্রসঙ্গে উদ্যোক্তা মো. হাসানুজ্জামান বলেন, আমি যখন নিউইয়র্কে মেসিস, ব্লুমিংসে শার্ট, জ্যাকেট কিনতে যাই তখন কিন্তু মেড ইন বাংলাদেশ দেখি। অনেক দামি বড় বড় কোম্পানি, আমাদের বড় বড় ব্র্যান্ড। এখন ট্রাম্প ক্ষমতায় এসেছে। তারা চীনের উপর যে ট্যারিফটা করেছে তাতে চীনের এক্সট্রা ট্যারিফ দিতে হচ্ছে। ফলে এখন কিন্তু বাংলাদেশের একটা অপার সম্ভাবনা রয়েছে। নন লেদার জুতা যেটাকে সিন্থেটিক জুতা বা আরেক ভাষায় স্পোর্টস-সু এইটার কিন্তু এখন ট্রেন্ড চলছে। বৎসরে ৬০০ বিলিয়ন ডলারের বিজনেস শুধু আমার মত জুতা প্রস্তুত কারকদের আছে। আমরা বাংলাদেশ ১ পারসেন্টও না। অর্থাৎ পয়েন্ট ৪৮ পার্সেন্ট আমরা দিতে পারছি। মানে এক ভাগেরও অর্ধেক আমরা দিতে পারছি। আমার মনে হয় এইটার আরো অনেক সুযোগ আছে।

প্রত্যন্ত গ্রামের মাঝে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে থাকা ব্লিং লেদার প্রোডাক্ট লিমিটেডে নিয়ে আশা ও স্বপ্নের কথা বলেন শিল্পোদ্যোক্তা মো. হাসানুজ্জামান। তিনি বলেন, বর্তমানে ইউনিট ওয়ানে ১৯০০ এবং ইউনিট টু তে ৯০০ এই ২৮০০ মানুষের কর্মসংস্থান হয়েছে ভবিষ্যতে এইখানে প্রায় আট থেকে ১০ হাজার লোকের কর্মসংস্থান হবে বলে আমি আশা করি। আল্লাহ যদি সুস্থ রাখে আমার বড় ভাইয়ের দোয়া আমার কাছে সবসময় আছে। আমার ভাবী আমার সাথে আছেন, উনি ডাইরেক্টর। আমার ছেলেমেয়েরা বিদেশে থাকে আমি এই দেশে আছি। একটা মঙ্গা পীড়িত এলাকায়। আমি মনে করি যে এইখানে আমি ১০ হাজার লোকের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করতে পারবো। ১০ হাজার চাকরি মানে মানে ১০ পরিবারের ব্যবস্থা করা। এই তারাগঞ্জ উপজেলার অবস্থা যদি দেখেন, আপনি চিন্তা করতে পারবেন না যে তারাগঞ্জ উপজেলা আজকে কতটা বদলে গেছে। আজকে মেয়েরা বাসায় কাজের পরিবর্তে ফ্যাক্টরিতে ডেইলি জব করছে। আমরা প্রবাসী, আমাদের কাছে মনে হয় যে দেশটাতে যদি আমরা কিছু করতে পারি। এইখান থেকে বিদেশে টাকা নিয়ে যাওয়ার আমার কোন ইচ্ছা নাই। আমার কর্মচারীরা আমার ছেলেমেয়ে, আমার ভাই বোন এরা আমার শুভাকাঙ্ক্ষী। এরা জানে যে স্যার আসছে, আজকে আমাদের বেতন হয়ে যাবে। এরা কেন এইখানে আসে! কারণ ১২ তারিখ আমার বেতন ডেট। এটা কোনদিন মিস হয় নাই। আমি নিজে না খেয়ে থাকবো কিন্তু আমি আগে বেতন দিব মানুষকে।

৫ আগস্টের আন্দোলনে রক্তের বিনিময়ে অন্য একটা স্বাধীনতা পেয়েছি আমরা। আমি সেইসব শহীদদের আত্মার মাগফেরাত কামনা করছি যাদের বিনিময়ে আমরা মুক্ত কণ্ঠে কথা বলতে পারছি।

প্রবাসী উদ্দেশ্যে মো. হাসানুজ্জামান বলেন, দেশটা আমাদের, কষ্ট করতে হবে। আসেন, এসে ১০টা গরু নিয়ে একটা খামার করেন। আপনি একটা, পাঁচটা পুকুর দেন। সবাইকে ইন্ডাস্ট্রি করতে হবে এমন না। সবাই যদি একটু একটু করে অবদান রাখি, তাহলে কিন্তু এই বাংলাদেশটা ঘুরে দাঁড়াবে। এই দেশটা আমার মা, এই মায়ের জন্য সবাইকে কাজ করতে হবে। আপনারা এক মাস দুই মাসের ছুটিতে আসলে হবে না, আপনাদেরকে দীর্ঘ একটা টাইম নিয়ে আসতে হবে। এখনো ওয়ান স্টপ সার্ভিস নাই। আমি আপনাদের চ্যানেলের মাধ্যমে বিডা, বাণিজ্য মন্ত্রণালয় প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের কাছে আবেদন জানাবো যে আমাদের জন্য যাতে একটা আলাদা সেল গঠন করা হয়।

আমি যেমন নিউইয়র্কে আজকে প্রায় ৩২ বছর। আমার ফ্যামিলি ওইখানে আছে। আমার এই কোম্পানির ডাইরেক্টর আমার ভাবী। ওইখানে থাকেন। ভাইয়া চলে যাওয়ার পর তো আমরা আমাদের ফ্যামিলি থেকে চেষ্টা করেছি। আমি আকুল আবেদন জানাবো যারা প্রবাসী আছেন, এই দেশটা তো আমাদেরই। একটু কষ্ট হবে, একটু দুঃখ হবে, একটা জায়গায় স্মুথ কাজ হবে না। এটা আমি জানি। এই কষ্টটা নিয়ে আসেন না, আমরা কোন একটা জিনিস এইখানে ছোট্ট করে করি।

এইভাবে করলে আপনার অর্থনীতিটা কিন্তু বাংলাদেশে আসবে। এখন যখন বাংলাদেশের সবথেকে ডলারের সংকট এবং ডলার নিয়ে আমি লাভ করছি না। আমি এখনো বলতে পারবো, না আমি লাভে আছি। আমি যেই এইখান থেকে ইনকাম করি, আমরা কিন্তু ইনভেস্ট করি। আমরা বাংলাদেশকে ভালোবেসে বাংলাদেশকে নিয়ে কিছু কাজ করতে চাই। ভাই যেটা বললেন যে, আছেন এখানে কিছু কিছু মানুষ পথ-পদবি চান। ভাই আপনার দেশ, আপনার মা।

আপনার মায়ের জন্য আপনি কিছু করবেন না? ১৬ সালে যখন আমার ভাই এই স্বপ্নটা দেখে, আমরা যখন এইটা নিয়ে ফ্যামিলিতে কথা বলি, আমরা চটপট এখানে একটা জায়গা করে ফেললাম। ১৮ সালে মেশিন এসে গেল। মেশিন আসার পর আমার ব্যাংক রেডি না, ব্যাংকে প্রবলেম। কিন্তু আমরা এইখান থেকে তিন সাড়ে ৩০০ লোক নিলাম। ওদেরকে আমরা একটা লেদার কলেজের ছেলে নিয়ে ট্রেনিং দেওয়া শুরু করলাম। কিছু সামগ্রী কিনলাম। ওরা একটু এবিসি বানানো শুরু করল। এর মধ্যেই এসে গেল কোভিড এই কোভিড কোভিডে আমিও চলে গেলাম আমেরিকায়। আমেরিকা থেকে ২১ সালে আবার আসলাম। তারপরে আমার যাত্রা এবং এটা সত্যি সেই ৩৫০ জন লোককে উইদাউট কাজে আমি কিন্তু কোভিডের সময় মাসিক স্যালারি দিয়েছি। ওরা আসতে পারতো না। বন্ধ ছিল এই ফ্যাক্টরি। কিন্তু আমি তাদেরকে পৃষ্ঠপোষকতা করতে চেয়েছি। যে এই সময় তার পাশে দাঁড়াতে হবে। এইটা একটা টার্ন এরাউন্ড ছিল। শ্রমিকদের মধ্যে এই আলোচনাটাও হলো। এখন গাজীপুর, চিটাগাং, নোয়াখালী আপনি যেইখানে বলেন যত জুতার ফ্যাক্টরি আছে, ব্লিংক একটা আদর্শ নাম হিসেবে পরিচিত পেয়েছে।

Scroll to Top