ইতিহাসের নীরব সাক্ষী ও পুরান ঢাকার বাসিন্দাদের স্বস্তি ফেলার একমাত্র ঠিকানা ঐতিহ্যবাহী বাহাদুর শাহ পার্ক। হাজারো ব্যস্ততার মাঝে বিভিন্ন শ্রেণিপেশার মানুষ একটু স্বস্তির খোঁজে বিশ্রাম নিতে আসে ঐতিহাসিক এই পার্কে। কালের বিবর্তনে এখনো এই পার্কের ঐতিহ্য টিকে থাকলেও ঠিকমতো পরিচর্যার অভাবে ঐতিহ্য হারাতে বসেছে এটি। ঐতিহ্যবাহী এই পার্ক এখন ভবঘুরে, ছিন্নমূল মানুষ এবং মাদকাসক্তদের আবাসস্থল হিসেবে গড়ে উঠেছে।
সরেজমিনে বাহাদুর শাহ পার্ক এলাকায় ৩০ থেকে ৩৫ জন ভবঘুরে ও ছিন্নমূল পথশিশুর আনাগোনা দেখা যায়। পার্কের উঁচু বেদিতেও ১৫ থেকে ২০ জন ছিন্নমূল মানুষের উপস্থিতি লক্ষ্য করা যায়। তাদের অধিকাংশকেই নেশাগ্রস্ত অবস্থায় দেখা যায়। এছাড়াও পুরো পার্ক জুড়ে নানান শ্রেণিপেশার মানুষকে বিশ্রাম নিতে এবং ব্যায়াম করতে দেখা যায়।
বিজ্ঞাপন

পুরান ঢাকার বাহাদুর শাহ পার্কসহ আশেপাশের এলাকায় অন্তত হাজার খানেক ভবঘুরে ও ছিন্নমূল পথশিশুর দেখা মিলবে। তাদের একজন মুক্তা আক্তার (১১)। গত চার বছর ধরে বাহাদুর শাহ পার্ক এলাকায় তার বসবাস। মুক্তা বার্তা২৪.কমকে বলেন, ছোটবেলা মা মারা যাওয়ার পর বাবা আরেকটা বিয়া করে। তখন আমারে নানুর বাড়িতে পাঠিয়ে দেয়। আমার মামী আমারে সহ্য করতে পারতো না, অনেক মারতো। একদিন ঢাকায় বেড়াতে আসার কথা বলে আমারে সদরঘাটে রেখে যায়। তখন ঘুরতে ঘুরতে এখানে চলে আসি। সে থেকেই এই পার্ক আমার ঘরবাড়ি হয়ে যায়।
মুক্তা বেগম আরও বলেন, রোদ বৃষ্টি যাই হোক এই পার্কই আমার ঠিকানা। আমিসহ আরও ৫০-৬০ জন রাতে এখানে একসাথে ঘুমাই। কখনো খেয়ে কখনো না খেয়ে দিন কাটে। না খেয়ে থাকতে থাকতে পেটে অন্যরকম একটা জ্বালা অনুভব হয়। তখন ক্ষুধার যন্ত্রণা ভুলে থাকতে আমরা ড্যান্ডি (আঠা যুক্ত এক ধরনের মাদক) খাই। মানুষ আমাদের কাজ ও দেয় না, খাবারও দেয় না। তখন উপায় না দেখে আমরা এসব খাই।
বিজ্ঞাপন
মুক্তা বেগমের মতো আরও অসংখ্য শিশুর একমাত্র আবাসস্থল বাহাদুর শাহ পার্ক। যাদের অধিকাংশই মাদকাসক্ত। তাদের একজন রিফাত। জন্মের পর থেকে বাহাদুর শাহ পার্কেই তার বসবাস। বয়স ঠিকমতো জানা নেই, তবে আনুমানিক ৭-৮ বছর হবে। এই অল্প বয়সেই জীবনের অনেক রূপ দেখেছে রিফাত। বার্তা২৪.কমকে রিফাত বলেন, প্লাস্টিক কুড়িয়ে, মানুষের কাছে হাত পেতে, যা পায় তাই দিয়ে খাওয়া দাওয়া করে দিন কাটে তার। আর রাতে এই পার্কে ঘুমাই। আমার ড্যান্ডি খেতে ভাল্লাগে না। মাঝে-মধ্যে ডাস্টবিনের ফেলা উচ্ছিষ্ট খাবারও খাই তবুও ড্যান্ডি খাই না। সেটা খেলে আমার মাথা ঘোরে।

শাঁখারিবাজার ফুট ওভারব্রিজের উপর দেখা মিলে মাদকাসক্ত আরও ৫ থেকে ৬ জন ভবঘুরের। তাদের সবারও একমাত্র ঠিকানা বাহাদুর শাহ পার্ক। সেখানকার একজন নয়ন (১৪)। ক্ষুধার জ্বালায় কিছুদিন আগে এক নারীর ব্যাগ নিয়ে দৌড় দিয়েছিল সে। সে কথাও বার্তা২৪.কমের এই প্রতিবেদকের কাছে অকপটে স্বীকার করে এই শিশু। পরে ধরা পড়ে মারও খেয়েছে সে। নেশা করে কেন- জানতে চাইলে সে বলে, ‘মাঝেমধ্যে খুব খিদা লাগে। কী করবো বুঝি না। তাই এই গাম খাই। এটা খেলে কেমন যেন একটা লাগে। সারাদিন মাথা ঝিমঝিম করে। আর খিদা লাগে না।’
ঐতিহ্যবাহী এই পার্ক ছিন্নমূল মানুষের আবাসস্থল হিসেবে গড়ে উঠার বিষয়ে পুরান ঢাকার স্থানীয় বাসিন্দারা কিছুটা বিরক্তি প্রকাশ করলেও মানবিকতার দিক বিবেচনা করে তাদের একটা স্থায়ী আবাসস্থল নির্মাণের দাবি জানান তারা।
পুরান ঢাকার কলতাবাজার বাসিন্দা হাজী মোহাম্মদ ইসহাক বার্তা২৪.কমকে বলেন, এদের কারণে ঐতিহ্যবাহী এই পার্কের বেহাল দশা। যেখানে সেখান প্রস্রাব পায়খানা করে পুরো পার্কের পরিবেশ নষ্ট করছে। দায়িত্বশীল কেউ এখানে পরিচর্যার জন্য না থাকায় এই পার্কের দুরবস্থা। এসব ছিন্নমূল মানুষের জন্য সরকারি উদ্যোগে একটা আবাসস্থল তৈরির কথা বলেন এই বাসিন্দা।