
ঢাকা, ১৫ সেপ্টেম্বর – একসময় ‘বাংলার শস্যভাণ্ডার’ ও খাল-নদীর সৌন্দর্যে ‘বাংলার ভেনিস’ নামে খ্যাত বরিশাল অঞ্চল আজ চরম অর্থনৈতিক সংকটে। কালের পরিক্রমায় ঐতিহাসিক ঐতিহ্য হারিয়ে দেশের আটটি বিভাগের মধ্যে বর্তমানে সবচেয়ে দরিদ্র বিভাগে পরিণত হয়েছে বরিশাল। কৃষি ও মৎস্য উৎপাদনে বড় ধস, শিল্পকারখানার অভাব এবং কর্মসংস্থান না থাকায় এ অঞ্চলের মানুষ বাধ্য হয়ে ভিড় জমাচ্ছেন রাজধানীর বস্তিগুলোতে।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) দারিদ্র্য মানচিত্র ২০২২ অনুযায়ী, যেখানে জাতীয় পর্যায়ে দারিদ্র্যের হার ১৯.২%, সেখানে বরিশালে এই হার সর্বোচ্চ ২৬.৬%—যা দেশকে সবচেয়ে দরিদ্রতম বিভাগের তালিকায় শীর্ষে বসিয়েছে।
দেশের আট বিভাগের দারিদ্র্যের চিত্র (বিবিএস ২০২২)
- বরিশাল ২৬.৬% সর্বোচ্চ (দরিদ্রতম)
- রংপুর ২৫.০% দ্বিতীয় সর্বনিম্ন
- ময়মনসিংহ ২২.৬% তৃতীয়
- ঢাকা ১৯.৬% চতুর্থ
- সিলেট ১৮.৫% পঞ্চম
- খুলনা ১৭.১% ষষ্ঠ
- রাজশাহী ৬.৩% সপ্তম
- চট্টগ্রাম ১৫.২% সর্বনিম্ন (সবচেয়ে ভালো) |
বরিশালের অর্থনৈতিক ধসের ৩ মূল কারণ
১. কৃষি ও মৎস্য খাতে বিপর্যয়:
ধান উৎপাদন হ্রাস: জলবায়ু পরিবর্তন ও জমিতে লবণাক্ততা বাড়ায় ২০২৪-২৫ অর্থবছরে আউশ উৎপাদন আগের বছরের ৪ লাখ ৩০ হাজার টন থেকে কমে দাঁড়ায় ৩ লাখ ৭৪ হাজার টনে।
ইলিশের উৎপাদন ধস: ২০২২-২৩ অর্থবছরে বরিশালে ৩ লাখ ৭২ হাজার টন ইলিশ হলেও ২০২৫-২৬ অর্থবছরে তা সাড়ে ২৮% কমে দাঁড়িয়েছে ২ লাখ ৬৬ হাজার টনে।
কৃষকদের সর্বনিম্ন আয়: বিবিএস জরিপ অনুযায়ী, ধান-গম উৎপাদনে বরিশালের কৃষকদের বার্ষিক নিট আয় মাত্র ৬ হাজার ৮১ টাকা, যা দেশে সর্বনিম্ন।
২. শিল্পায়নের চরম অভাব ও রাজধানীমুখী জনস্রোত:
ভোলায় বাপেক্সের ১.৭৫ ট্রিলিয়ন ঘনফুট গ্যাসের বড় মজুত থাকা সত্ত্বেও গত তিন দশকে শিল্পায়ন ঘটেনি। পুরো বিভাগে কেবল বরিশাল জেলাতেই উল্লেখ করার মতো ৪০৯টি কারখানা রয়েছে, যেখানে মাত্র ২০ হাজার শ্রমিকের কাজের সুযোগ রয়েছে। কর্মসংস্থানের তীব্র সংকটে অধিবাসীদের ১৮.৬২% মানুষ এখন ঢাকায় বাস করছেন।
৩. পরিকল্পনাহীনতা ও যোগাযোগ সমস্যা:
প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান প্রতিমন্ত্রী মো. নুরুল হক জানান, দক্ষিণাঞ্চলের প্রভাবশালী নেতারা জাতীয় রাজনীতিতে মনোযোগী হলেও আঞ্চলিক সমন্বিত উন্নয়ন নিশ্চিত করতে পারেননি।
অর্থনৈতিক সংকট উত্তরণের সম্ভাবনা
বরিশাল-১ আসনের সংসদ সদস্য ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের রাজনৈতিক উপদেষ্টা জহির উদ্দিন স্বপন জানান, জ্বালানি সংকট ও দুর্গম যোগাযোগের কারণেই উপকূলীয় এলাকাটি পিছিয়ে পড়েছিল। তবে ভোলার গ্যাসকে স্থানীয় শিল্পে ব্যবহার, পায়রা বন্দর পুরোদমে চালু করা এবং প্রস্তাবিত ভোলা-বরিশাল সংযোগ মহাসড়ক নির্মিত হলে খুব দ্রুতই দক্ষিণাঞ্চলের অর্থনীতি ঘুরে দাঁড়াবে।”
এনএন/ ১৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬
