বাংলাদেশে দুর্নীতির অভিযোগে আনুষ্ঠানিকভাবে অভিযুক্ত হওয়ার পর ব্রিটিশ এমপি ও সাবেক ট্রেজারি মন্ত্রী টিউলিপ সিদ্দিক জানান, তিনি এমন এক “কাফকেস্ক দুঃস্বপ্নে” আটকা পড়েছেন যেখানে তার বিরুদ্ধে বিচার শুরু হতে যাচ্ছে, অথচ আনুষ্ঠানিক সমন বা সুনির্দিষ্ট অভিযোগ এখনো তিনি পাননি।
হ্যাম্পস্টেড ও হাইগেটের এমপি টিউলিপ সিদ্দিক, যিনি জানুয়ারিতে কিয়ার স্টারমার সরকারের ট্রেজারি মন্ত্রীর পদ ছাড়েন এবং জানান, মাত্র এক সপ্তাহ আগে একজন সাংবাদিকের মাধ্যমে তিনি জানতে পারেন যে বাংলাদেশের একটি দুর্নীতি মামলায় তাকে অভিযুক্ত করা হয়েছে।
বাংলাদেশে ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ভাগ্নি হিসেবে প্রভাব বিস্তার করে রাজধানীর পূর্বাচলে তার মা, ভাই ও বোনের জন্য জমি আদায়ে সহযোগিতার অভিযোগ আনা হয়েছে তার বিরুদ্ধে। এই অভিযোগকে “সম্পূর্ণ অযৌক্তিক” বলে প্রথম সাক্ষাৎকারে প্রত্যাখ্যান করেন সিদ্দিক।
১১ আগস্ট তার ও আরও ২০ জনের বেশি ব্যক্তির বিরুদ্ধে বিচার শুরু হওয়ার তারিখ ঠিক হয়েছে। তিনি ব্যক্তিগতভাবে কিংবা ভিডিওলিংকের মাধ্যমে হাজির হতে পারবেন কি না—এ নিয়ে তিনি আইনজীবী হুগো কিথ কেসির পরামর্শ নিচ্ছেন।
তিনি বলেন, আমার বিরুদ্ধে কী অভিযোগ আছে এবং এর কী বিচার সে সম্পর্কে এখনো আমি জানি না। বিদেশে শোকজ শুনানির কয়েকদিন বাকি, অথচ কোনো আনুষ্ঠানিক নোটিশই পাইনি।
বাংলাদেশ কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, প্রয়োজন হলে তিনি অনুপস্থিত থাকলেও বিচার চলবে। দোষী সাব্যস্ত হলে যুক্তরাজ্যের সঙ্গে প্রত্যর্পণ ব্যবস্থা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠতে পারে।
গত বছর ব্রিটেনে লেবারের বিজয়ের পর তিনি স্টারমার সরকারের সিটি ও ট্রেজারি মন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পান। তিনি বলেন, আমি কাজটি উপভোগ করছিলাম এবং ভালোও করছিলাম। কিন্তু একই সময়ে বাংলাদেশে ছাত্র নেতৃত্বাধীন বিক্ষোভে শেখ হাসিনার সরকার পতন ঘটে। দেশজুড়ে সহিংসতার মধ্যে হাসিনা ও তার বোন শেখ রেহানা সামরিক হেলিকপ্টারে দেশত্যাগ করেন।
টিউলিপ সিদ্দিক বলেন, ১৯৭৫ সালের অভ্যুত্থানে শেখ হাসিনার পরিবারকে যেভাবে হত্যা করা হয়েছিল, তার স্মৃতিও ছিল ভয়ংকর। কিন্তু আমি এখানে এসে কাউকে রক্ষা করতে আসিনি। বাংলাদেশের জনগণ যে রায় চায়, সেটাই হওয়া উচিত।
হাসিনা সরকার পতনের পর ক্ষমতায় আসা মুহাম্মদ ইউনূস নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার গঠিত হয়। একে তিনি নোংরা রাজনীতি বলে অভিহিত করেছিলেন। এ সময় টিউলিপের বিরুদ্ধে ধারাবাহিকভাবে অভিযোগ উত্থাপিত হয়। রূপপুর পারমাণবিক প্রকল্প থেকে ৫ বিলিয়ন ডলার আত্মসাতের অভিযোগ তুলে বিভিন্ন অজ্ঞাত ওয়েবসাইটে খবর প্রকাশ করা হয়।

২০১৩ সালে শেখ হাসিনার রাশিয়া সফরে ভ্লাদিমির পুতিনের সঙ্গে তোলা ছবিকেও নতুন প্রেক্ষাপটে আনা হয়, যদিও টিউলিপ বলেন, আমি শুধু পরিবারের সদস্য হিসেবে সফরে গিয়েছিলাম। কোনো রাজনৈতিক আলোচনায় যুক্ত ছিলাম না।
২০০৪ সালে কিংস ক্রস এলাকায় তাকে একটি ফ্ল্যাট ‘উপহার’ দেওয়ার অভিযোগও নতুন করে ওঠে। তিনি জানান, ফ্ল্যাটের মালিক ছিলেন তার গডফাদার, যিনি কোনো রাজনৈতিক ব্যক্তি ছিলেন না। তিনি স্বীকার করেন, পূর্বে ভুল তথ্য বলেছিলেন যে ফ্ল্যাটটি তার বাবা-মা কিনে দিয়েছিলেন তা তার বাবা-মায়ের বিভ্রান্ত স্মৃতির ভিত্তিতে বলা।
এছাড়া তিনি কেন এক বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত ডেভেলপারের মালিকানাধীন বাড়িতে থাকতেন, সেই প্রশ্নও ওঠে। তিনি জানান, সন্ত্রাসী হামলার আশঙ্কায় নিরাপত্তা পরামর্শের ভিত্তিতে তাকে বাসা বদলাতে হয়েছিল।
ব্রিটেনের মন্ত্রী পর্যায়ের আচরণ–বিধি বিষয়ক উপদেষ্টা স্যার লরি ম্যাগনাস তার আর্থিক লেনদেন নিয়ে দুই সপ্তাহ তদন্ত করে তাকে কোডভঙ্গ না করার সুরাহা দেন। তবে মন্তব্য করেন যে তিনি পারিবারিক সম্পর্ক থেকে আসা সুনামের ঝুঁকি সম্পর্কে আরও সতর্ক হতে পারতেন।
টিউলিপ বলেন, এই কথাটি স্পষ্টতই বিরক্তিকর ‘দিনের শেষে আমার খালা কে তা আমি বলতে পারছি না’। এটি একটি অদ্ভুত লাইন কারণ এটি অনেকটা এমন বলার মতো যে ‘আপনার জন্ম কীভাবে হয়েছে সে সম্পর্কে আপনার সচেতন থাকা উচিত ছিল।
আমি জন্মসূত্রে যেটা, তা থেকে নিজেকে আলাদা করতে পারি না। কিয়ার স্টারমার তার প্রতি সমর্থন অব্যাহত রাখলেও, সরকারকে বিভ্রান্তিতে ফেলতে না চাইলে তিনি পদত্যাগ করেন।
বাংলাদেশে এখনো প্রতিশ্রুত জাতীয় নির্বাচন হয়নি। এদিকে ডাউটি স্ট্রিট চেম্বার্সের আইনজীবীরা দেশটিতে নির্যাতন ও সহিংসতার প্রমাণ সংগ্রহ করছেন-যেখানে সাংবাদিক, সংখ্যালঘু ও সাবেক শাসক দলের সমর্থকদের ওপর হামলার তথ্য রয়েছে।
টিউলিপ জানান, তিনি লন্ডনে ইউনূসের সফরের সময় দেখা করার অনুরোধ করলেও তা প্রত্যাখ্যান করা হয়।
বাংলাদেশে দুর্নীতির তদন্তে যুক্তরাজ্যের গুরুতর ও সংগঠিত অপরাধ দমন সংস্থা ( এনসিএ) হাসিনার সঙ্গে যুক্ত দুই ব্যক্তির লন্ডনের প্রায় ৯০ মিলিয়ন পাউন্ডের সম্পত্তি জব্দ করেছে, যার একটি বাড়িতে তার মা থাকতেন। টিউলিপ দাবি করেছেন—এর সঙ্গে তার কোনো সম্পর্ক নেই।
অভিযোগ করে তিনি বলেন, আমি বড় রাজনৈতিক শক্তির দ্বন্দ্বের বলি। মুহাম্মদ ইউনূস এবং আমার খালার মধ্যে রাজনৈতিক দ্বন্দ্বের কারণে আমি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছি। ‘এই বৃহত্তর শক্তিগুলেোর বিরুদ্ধে আমি লড়াই করছি… নিঃসন্দেহে বাংলাদেশে মানুষ ভুল কাজ করেছে, এবং তাদের এর জন্য শাস্তি পাওয়া উচিত। আমি তাদের কেউ নই।”
তিনি অভিযোগ করেন, বারবার স্পষ্টতা চাইলে বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকে কোনো তথ্য দেওয়া হয়নি।





