যুক্তরাষ্ট্র বনাম বেলজিয়াম, বিশ্বকাপ ২০২৬ এর নকআউট পর্ব। আগের ম্যাচে বসনিয়া ডিফেন্ডারের গোড়ালিতে পা তুলে দিয়ে লাল কার্ড দেখেছিলেন যুক্তরাষ্ট্রের ফরোয়ার্ড ফোলারিন বালোগান। নিয়ম অনুযায়ী পরের ম্যাচে খেলার কথা না তার। জানা গেলো, তার নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়া হয়েছে। কারণ হিসেবে জানা গেল, যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প নাকি নিজে ফোন করেছিলেন ফিফা প্রেসিডেন্ট জিয়ান্নি ইনফান্তিনোকে।
ম্যাচে বেলজিয়াম ৪-১ গোলে জিতে ট্রাম্পের বিখ্যাত নাচের ভঙ্গি নকল করে উদযাপন করলো। বোঝা গেল, বিশ্ব ফুটবলের সবচেয়ে ক্ষমতাধর চেয়ারে বসা ইনফান্তিনো এখন রাজনীতির কেন্দ্রে।
কে এই জিয়ান্নি ইনফান্তিনো, কীভাবে তিনি হলেন ফুটবলের নিয়ন্ত্রক প্রতিষ্ঠানের সভাপতি?
জন্ম আর ছোটবেলা
১৯৭০ সালের ২৩ মার্চ সুইজারল্যান্ডের ব্রিগ শহরে জন্ম জিয়ান্নি ইনফান্তিনোর। বাবা ভিনচেনজো আর মা মারিয়া দুজনেই ইতালির অভিবাসী, শেকড় ক্যালাব্রিয়া অঞ্চলে। তিন সন্তানের মধ্যে সবার ছোট তিনি।
ছোটবেলা থেকেই ইতালির ইন্টার মিলানের ভক্ত। ফ্রিবুর্গ বিশ্ববিদ্যালয়ে আইন পড়েন, এখন বিশ্বের সাতটা ভাষায় কথা বলতে পারেন।
মাঠে নামা হয়নি, কিন্তু ফুটবল ছাড়েননি
ইনফান্তিনো কোনোদিন পেশাদার ফুটবলার ছিলেন না। ছাত্রজীবনে মাঝেমধ্যে খেলতেন, কিন্তু কোনো ক্লাবের যুব একাডেমিতে যোগ দেননি, পরিবারে খেলার চেয়ে পড়াশোনাকে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হতো। আইন পড়া শেষ করেই সরাসরি ফুটবল-সংশ্লিষ্ট কাজ খুঁজতে শুরু করেন, প্রথমে ইতালি-স্পেন-সুইজারল্যান্ডের কয়েকটা ফুটবল সংস্থার আইনি পরামর্শক হিসেবে, তারপর নেউশাতেলের সিআইইএস সংস্থার সেক্রেটারি জেনারেল হিসেবে।
এই পথ ধরেই ২০০০ সালে উয়েফায় যোগ দেন। অর্থাৎ মাঠে না নেমে, বোর্ডরুম দিয়েই ফুটবলের সঙ্গে তার আসল যোগসূত্র তৈরি হয়।
উয়েফা থেকে ফিফা
২০০৪ সালে উয়েফার লিগ্যাল বিভাগের পরিচালক, ২০০৭ সালে ডেপুটি জেনারেল সেক্রেটারি, আর ২০০৯ সালে জেনারেল সেক্রেটারি হন ইনফান্তিনো। এই সময়ে চালু হয় ফিনান্সিয়াল ফেয়ার প্লে নিয়ম, ইউরোর দল সংখ্যা বাড়িয়ে চব্বিশ করা হয়, তৈরি হয় নেশন্স লিগ।
২০১৫ সালে দুর্নীতির অভিযোগে সরে দাঁড়ান ফিফা প্রেসিডেন্ট সেপ ব্লাটার। সেই সংকটের মধ্যে ২০১৬ সালে নির্বাচনে দাঁড়ান ইনফান্তিনো, সংস্কার আর বিশ্বকাপ চল্লিশ দলে বাড়ানোর প্রতিশ্রুতি দিয়ে। ১১৫ ভোট পেয়ে জেতেন, প্রতিদ্বন্দ্বী শেখ সালমান পান ৮৮ ভোট।
প্রথম ইতালিয়ান হিসেবে ফিফা প্রেসিডেন্ট হন তিনি, পরে ২০১৯ আর ২০২৩ সালে আবার নির্বাচিত হন।
ঘর সংসার, যা কম প্রচার হয়
লেবাননের ফুটবল ফেডারেশনে কাজ করার সময় লীনা আল আশকারের সঙ্গে পরিচয় হয় ইনফান্তিনোর। ২০০১ সালে ওই মুসলিম নারীকে বিয়ে করেন, চার মেয়ে (যার মধ্যে ২ জন যমজ) আছে তাদের।

সুইজারল্যান্ডের জুগে সরকারি বাসস্থান হলেও ২০২১ সাল থেকে কাতারের দোহাতেও বাড়ি ভাড়া নিয়ে থাকছেন, কারণ দুই মেয়ে সেখানকার স্কুলে পড়ে। ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে লেবাননের নাগরিকত্বও পেয়ে যান। ফলে এখন তার কাছে ৩টি পাসপোর্ট, সুইস, ইতালিয়ান আর লেবানিজ।
প্যানামা পেপারস আর প্রথম বছরের গোলমাল
২০১৬ সালে প্যানামা পেপারসে ইনফান্তিনোর নাম আসে, উয়েফার কিছু চুক্তির সূত্রে। একই বছর ফিফার ইথিক্স কমিটি তদন্তে নামে তার বিরুদ্ধে, বিমানভ্রমণ আর নিয়োগ নিয়ে। তদন্তে বেরিয়ে আসে, ফিফার কাছে তিনি ব্যক্তিগত খরচও বিল করেছেন, বাসার তোশক, একটা এক্সারসাইজ মেশিন, টাক্সিডো, ফুল, এমনকি ব্যক্তিগত লন্ড্রির খরচও।
শেষে অবশ্য ইথিক্স চেম্বার তাকে দোষমুক্ত ঘোষণা করে, বলে এগুলো নৈতিক নয়, প্রশাসনিক বিষয়। তবু বায়ার্ন মিউনিখের চেয়ারম্যান রুমেনিগে প্রকাশ্যেই বলেন, স্বচ্ছতার প্রতিশ্রুতি তিনি রাখেননি।
স্বৈরশাসকদের পাশে দাঁড়ানো
ইনফান্তিনোর বিরুদ্ধে বারবার অভিযোগ, তিনি বিতর্কিত শাসকদের সঙ্গে সহজেই সখ্যতা গড়ে তোলেন। ২০১৮ রাশিয়া বিশ্বকাপকে ‘সেরা বিশ্বকাপ’ বলে আখ্যা দেন, পরের বছর পুতিনের কাছ থেকে অর্ডার অফ ফ্রেন্ডশিপ সম্মাননা পান। ২০২২ সালে কাতারে শ্রমিক মৃত্যু নিয়ে সমালোচনা তুঙ্গে থাকার সময় কাতারের পক্ষ নিয়ে পশ্চিমা দেশগুলোকে ‘ভণ্ড’ বলে পাল্টা আক্রমণ করেন।
২০৩৪ বিশ্বকাপ সৌদি আরবকে পাইয়ে দেওয়ার পেছনেও তার বড় ভূমিকা ছিল, প্রতিদ্বন্দ্বী অস্ট্রেলিয়াকে পেছনে ফেলে। সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমানের সঙ্গে তার ঘনিষ্ঠতা এখন সবারই জানা।
মেসি-আর্জেন্টিনা বিতর্ক আর ট্রলের ঝড়
মাঠের সিদ্ধান্ত নিয়েও ইনফান্তিনোকে নিয়মিত ট্রলের মুখে পড়তে হয়েছে, বিশেষত আর্জেন্টিনা আর মেসিকে ঘিরে। শুরুটা ২০২২ কাতার বিশ্বকাপে, যেখানে আর্জেন্টিনা রেকর্ড পাঁচটা পেনাল্টি পায় আর নেদারল্যান্ডসের বিপক্ষে মেসির হাতে বল লাগার পরও কার্ড হয়নি। সেখান থেকেই জন্ম নেয় ‘ফিফা মেসিকে জেতাতে চায়’ গোছের চক্রান্ত-তত্ত্ব, আর সামাজিক মাধ্যমে মিম-সংস্কৃতি।

২০২৬ বিশ্বকাপে কেপ ভার্দের বিপক্ষে ম্যাচের পর ইনফান্তিনো ক্যামেরার সামনে বলে বসেন, ‘আজ আর্জেন্টিনার জন্য আমি কষ্ট পেয়েছি, তবে আমি নিরপেক্ষ।’ কথাটা মুখ ফসকে বেরিয়ে যাওয়ার পর সঙ্গে সঙ্গে সামলে নেওয়ার চেষ্টা করেন, কিন্তু ততক্ষণে ভাইরাল হয়ে গেছে। মিসর ম্যাচের বিতর্কিত ভিএআর সিদ্ধান্তের পর আবার নতুন করে জ্বলে ওঠে মিমের বন্যা, মেসি আর ইনফান্তিনোকে জড়িয়ে বানানো টাইটানিক পোস্টারের প্যারোডি থেকে শুরু করে এআই দিয়ে বানানো ভিডিও পর্যন্ত, যেখানে দুজনকে অবিচ্ছেদ্য জুটি হিসেবে দেখানো হয়।
ফিফার রেফারিং প্রধান অবশ্য সরাসরি জবাব দিয়েছেন, বলেছেন রেফারিং সিদ্ধান্তে প্রেসিডেন্টের কোনো প্রভাব নেই। তবু নির্দিষ্ট প্রমাণ ছাড়াই এই সন্দেহ ফুটবল দুনিয়ায় এখন প্রায় স্থায়ী হয়ে গেছে।
সর্বশেষ ইংল্যান্ডের বিপক্ষে সেমিফাইনালে ফকল্যান্ড যুদ্ধের ‘রাজনৈতিক ব্যানার’ মাঠে প্রবেশ করে আর্জেন্টিনা, ফিফার নিয়ম অনুসারে শাস্তির মুখে পড়ার কথা আর্জেন্টিনার। কিন্তু সেবিষয়েও কোনো আপডেট নেই ফাইনালের আগে, ব্রিটিশ মিডিয়াসহ সামাজিক মাধ্যমে বিষয়টি নিয়ে আলোচনা হলেও বিশ্বকাপের সৌন্দর্য্য রক্ষায় অনেকেই থেমে গেছেন।
প্রাইভেট জেট, বেতন, আর ট্রফিতে নিজের নাম
আয়োজক দেশগুলোর দেওয়া প্রাইভেট জেটে চড়া নিয়ে বারবার প্রশ্ন উঠেছে ইনফান্তিনোর বিরুদ্ধে। ২০২৬ বিশ্বকাপেও কাতার এয়ারওয়েজের স্পনসর করা জেটে তিন আয়োজক দেশের মধ্যে ঘুরে বেড়ানো নিয়ে আলোচনা হয়েছে।
ফিফার হিসাবে বছরে প্রায় ছয় মিলিয়ন ডলার বেতন পান তিনি, মোট সম্পদ ধারণা করা হয় চৌদ্দ থেকে বিশ মিলিয়ন ডলারের মধ্যে।
২০২৪ সালে ফিফা ক্লাব বিশ্বকাপের নতুন ট্রফিতে নিজের নাম খোদাই করার অনুমোদনও নিজেই দেন, ট্রফিতে দুইবার তার নাম আছে।
ট্রাম্প অধ্যায়
গত দুই বছরে ইনফান্তিনোর সবচেয়ে আলোচিত সম্পর্ক ট্রাম্পের সঙ্গে। ২০২৫ সালের মে মাসে মধ্যপ্রাচ্যে ট্রাম্পের সফরসঙ্গী থাকায় ফিফা কংগ্রেসে দুই ঘণ্টা দেরি করে আসেন, উয়েফার প্রতিনিধিরা প্রতিবাদে বেরিয়ে যান। ডিসেম্বরে ফিফার নতুন চালু করা পিস প্রাইজ তুলে দেওয়া হয় ট্রাম্পের হাতে। অক্টোবরে মিশরের শার্ম আল-শেখে গাজা যুদ্ধবিরতি সম্মেলনেও ট্রাম্পের পাশে দেখা যায় তাকে, ফুটবল দিয়ে গাজা পুনর্গঠনে সহায়তার প্রতিশ্রুতি দেন। ইরান-যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধ শুরুর পর ইরানের দলকে মেক্সিকোর তিহুয়ানায় সরে গিয়ে অনুশীলন করতে হয়, যুক্তরাষ্ট্রে ম্যাচের ঠিক আগের দিন ঢুকতে দেওয়া হয়, ইমিগ্রেশনে কড়া জেরার মুখে পড়েন খেলোয়াড়রা। এই নিষেধাজ্ঞা নিয়ে ইনফান্তিনো কার্যত চুপ ছিলেন।
সবচেয়ে বড় ধাক্কা আসে বালোগান কাণ্ডে। লাল কার্ডের নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়া হলে ইনফান্তিনো সাফাই দেন, বলেন ফিফার বিচারিক সংস্থা স্বাধীন। কিন্তু মানবাধিকার সংস্থা ফেয়ারস্কয়ার আন্তর্জাতিক অলিম্পিক কমিটির এথিক্স কমিশনে অভিযোগ দায়েরের ঘোষণা দেয়, কারণ ইনফান্তিনো নিজেও ২০২০ থেকে আইওসির সদস্য। ইউরোপীয় পার্লামেন্টের ডজনখানেক সদস্য তদন্তের দাবি তোলেন। এদিকে বিশ্ব ফুটবলে আর্থিক জালিয়াতি নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের তদন্তও ২০২৬ সালে বন্ধ হয়ে যায়, বলা হয় এটা এখন ট্রাম্প প্রশাসনের অগ্রাধিকারে নেই।
সব মিলিয়ে অনেকের অভিযোগ, ফিফার আর্থিক স্বার্থ রক্ষায় ইনফান্তিনো একজন শক্তিশালী রাজনীতিকের সঙ্গে সুসম্পর্ক রাখতে বিনিময়ে ছাড় দিতেও রাজি।
চতুর্থ মেয়াদের লড়াই
২০২৬ সালের মে মাসে ফিফা কংগ্রেসে ইনফান্তিনো ঘোষণা দেন, পরের নির্বাচনেও দাঁড়াবেন। আফ্রিকা আর এশিয়ার সমর্থন প্রায় নিশ্চিত, কিন্তু ইউরোপে অস্বস্তি বাড়ছে, বিকল্প হিসেবে কানাডার ভিক্টর মন্তালিয়ানির নাম উঠে আসছে। এর মধ্যেই উয়েফার সাবেক প্রেসিডেন্ট মিশেল প্লাতিনি ফ্রান্সে ফিফা আর ইনফান্তিনোর বিরুদ্ধে ফৌজদারি ও দেওয়ানি অভিযোগ দায়ের করেন, ২০১৫ সালের ঘটনার জের ধরে যা তার (প্লাতিনির) ফিফা প্রেসিডেন্ট হওয়ার স্বপ্ন ভেঙে দিয়েছিল। ফিফা সব অভিযোগ অস্বীকার করেছে। পরের নির্বাচন ২০২৭ সালের মার্চে। ইনফান্তিনোর নতুন অস্ত্র, ৬৪ দেশ নিয়ে বিশ্বকাপ বাস্তবায়ন পরিকল্পনা।
শেষ কোথায়
আটচল্লিশ দলের সবচেয়ে বড় বিশ্বকাপ শেষ হতে চললো, রেকর্ড আয় নিয়ে। ইনফান্তিনো আগের চেয়ে ধনী, আগের চেয়ে ক্ষমতাধর। সঙ্গে বেড়েছে বিতর্কও, রেফারিং নিয়ে সন্দেহ থেকে রাজনৈতিক নিরপেক্ষতা ভাঙার অভিযোগ পর্যন্ত। আফ্রিকা-এশিয়ার ফেডারেশনগুলো তাকে দেখছে অর্থ এনে দেওয়া নেতা হিসেবে, ইউরোপের একটা অংশ আর মানবাধিকার সংস্থাগুলো দেখছে ক্ষমতা টিকিয়ে রাখতে যেকোনো শক্তিশালী মানুষের সঙ্গে হাত মেলানো প্রশাসক হিসেবে।
মাঠের ফুটবল হয়তো খেলা হয়নি তার, কিন্তু ফুটবলের সবচেয়ে বড় চেয়ারে বসে ইনফান্তিনো এখন খেলার নিয়ম ঠিক করে দেন। প্রশ্ন একটাই, এই খেলা তিনি আর কতদিন নিজের শর্তে খেলবেন?




