কুমিল্লা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মর্গে শেষ হয়েছে বুলেট বৈরাগীর মরদেহের ময়নাতদন্ত। বাসায় ছেলের জন্য একটু পরপরই কান্নায় ভেঙে পড়ছিলেন মা নীলিমা বৈরাগী। পাশেই দাঁড়িয়ে থাকা স্ত্রী উর্মি হীরা বললেন, অন্য কিছু জানতে চাই না। আমার একটাই জানতে চাওয়া, আমার স্বামীর সঙ্গে কী ঘটেছিল? সেটা একটিবার জানতে চাই।
কুমিল্লা নগরের রাজগঞ্জ পানপট্টি এলাকায় আটতলা ভবনের একটি ফ্ল্যাটে ভাড়া থাকতেন কাস্টমস কর্মকর্তা বুলেট বৈরাগী (৩৫) ও তার পরিবারের সদস্যরা।
রোববার ২৬ এপ্রিল সকালে সেখানে গিয়ে দেখা যায়, বুলেটের মা নীলিমা বৈরাগীর কোলে বুলেটের শিশুপুত্র অব্যয় বৈরাগীকে। পাশেই হতবাক অবস্থায় দাঁড়িয়ে চোখের পানি ফেলছেন স্ত্রী উর্মি হীরা। আশপাশের ফ্ল্যাটের লোকজন ও স্বজনেরা জিনিসপত্র গোছাচ্ছেন। ভবনের নিচে অপেক্ষা করছে গাড়ি। একটু পরেই মরদেহ নিয়ে গোপালগঞ্জের টুঙ্গিপাড়ায় যাবেন তারা।

চট্টগ্রাম থেকে গত শুক্রবার রাতে কুমিল্লার বাসায় ফিরছিলেন বুলেট বৈরাগী (৩৫)। কাছাকাছি স্থানে পৌঁছে পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে একাধিকবার কথাও বলেছিলেন তিনি। কিন্তু তার আর বাসায় ফেরা হয়নি। শনিবার সকালে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের কুমিল্লার কোটবাড়ী এলাকার আইরিশ হিল হোটেলের পাশে মিলেছে ওই কাস্টমস কর্মকর্তার মরদেহ। তার মরদেহের মুখমণ্ডলে রক্তাক্ত চিহ্ন ছিল।
পরিবারের সদস্যদের ধারণা, বুলেট হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়েছেন। এ ঘটনায় শনিবার রাতে কুমিল্লা সদর দক্ষিণ মডেল থানায় হত্যা মামলা করেছেন মা নীলিমা বৈরাগী। মামলায় অজ্ঞাতনামা ব্যক্তিদের আসামি করা হয়েছে। আজ দুপুর পর্যন্ত হত্যার কারণ সম্পর্কে নিশ্চিত হতে পারেনি পুলিশ।
বুলেট বৈরাগী গোপালগঞ্জের টুঙ্গিপাড়া উপজেলার ডুমুরিয়া গ্রামের বাবুপাড়া এলাকার বাসিন্দা সুশীল বৈরাগীর ছেলে। তিনি ৪১তম বিসিএস নন-ক্যাডার পদে কাস্টমস, এক্সসাইজ ও ভ্যাট বিভাগে যোগদান করেন। এরপর সহকারী রাজস্ব কর্মকর্তা হিসেবে কর্মরত ছিলেন কুমিল্লার বিবিরবাজার স্থলবন্দরে। বিবিরবাজার থেকেই ১ এপ্রিল চট্টগ্রামে গেছেন ৪৪তম বুনিয়াদি প্রশিক্ষণে। চাকরির সুবাদে তিনি কুমিল্লা নগরের রাজগঞ্জ পানপট্টি এলাকার ওই ভাড়া বাসায় থাকতেন। নিহত বুলেট তার মা–বাবার একমাত্র সন্তান।
নীলিমা বৈরাগী বলেন, আমার নাম ছিল নীলিমা বৈরাগী; কিন্তু ছেলের সকল কাগজপত্রে এসেছে লিলিমা। আমার স্বামী কৃষক ছিলেন। অনেক কষ্টে ছেলেটাকে বড় করেছি, ভালো মানুষ বানিয়েছি। শুক্রবার দিবাগত রাত ২টা ১০ মিনিটের দিকে কথা হয় বুলেটের সঙ্গে। তখন বলল, বাসে আছে, কিছুক্ষণের মধ্যে বাসায় ফিরব। এর কিছুক্ষণ পর কল দিলে আর রিসিভ হয়নি। এরই মধ্যে আমরা অস্থির হয়ে পড়ি। একের পর কল দিতে থাকি। সর্বশেষ ভোর পৌনে ৪টার দিকে কলটি রিসিভ করে অপর প্রান্ত থেকে বলে, ঘুমাইতেছি, আরেকটু পরে আইতেছি। তখনই বুঝেছি, আমার ছেলের সঙ্গে খারাপ কিছু হয়েছে। কারণ, এটা আমার ছেলের ভাষা না। ওই সময়ই মনে হচ্ছিল—২টা ১০ মিনিটে তাহলে কি অন্য কারও সাথে কথা বলেছি? অনেক খোঁজাখুঁজির পর শনিবার দুপুরে শুনলাম আমার সোনার ছেলেটার লাশ রাস্তার পাশে পাওয়া গেছে।
উর্মি হীরা জানান, তার স্বামীর (বুলেট বৈরাগী) চট্টগ্রামে বুনিয়াদি প্রশিক্ষণ চলছিল। প্রতি সপ্তাহে প্রশিক্ষণ শেষ করে বৃহস্পতিবার রাতে কুমিল্লায় চলে আসতেন। শুক্রবার তিনি রাঙামাটির কাপ্তাই ঘুরতে গিয়েছিল। সেখানে থেকে ফিরে রাত ১১টার দিকে তিনি চট্টগ্রামের অলঙ্কার মোড় থেকে একটি বাসে উঠেছিলেন। লাশ উদ্ধারের সময় তার মুঠোফোনটি পাওয়া যায়নি।
সহকর্মীদের শেষশ্রদ্ধা
কুমিল্লা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মর্গে ময়নাতদন্ত শেষে বেলা ১১টার দিকে বুলেটের মরদেহ নিয়ে আসা হয় কুমিল্লা নগর উদ্যানের পাশে অবস্থিত কাস্টমস, এক্সসাইজ ও ভ্যাট কমিশনারেট কুমিল্লা কার্যালয়ে। এ সময় সহকর্মীরা ফুল দিয়ে বুলেটের মরদেহে শ্রদ্ধাঞ্জলি জানান। একই সময়ে কাস্টমস, এক্সসাইজ ও ভ্যাট কমিশনারেট কুমিল্লা কার্যালয়ের কমিশনার আবদুল মান্নান সরদার তার কার্যালয়ে পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে কথা বলেন এবং তাদের পাশে থাকার আশ্বাস দেন।
একপর্যায়ে বুলেটের লাশবাহী গাড়ির সামনে বিলাপ আর কান্নায় ভেঙে পড়েন স্ত্রী, বাবা, মাসহ স্বজনেরা। পরে মরদেহ শেষকৃত্যের জন্য নিয়ে যাওয়া হয় গোপালগঞ্জের টুঙ্গিপাড়ায়।
এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে কুমিল্লা সদর দক্ষিণ মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) সিরাজুল মোস্তফা বলেন, এ ঘটনায় থানায় একটি হত্যা মামলা হয়েছে। এরই মধ্যে পুলিশের একাধিক টিম ঘটনাটি নিজে কাজ করছে। আশা করছি আমাদের তদন্তে সব বেরিয়ে আসবে।
সমাহিত করা হবে বসতবাড়িতে
গোপালগঞ্জ শহর থেকে প্রায় ৩০ কিলোমিটার দূরে টুঙ্গিপাড়া উপজেলার ডুমুরিয়া উত্তরপাড়ায় (বাবুপাড়া) বুলেট বৈরাগীর বাড়ি। টুঙ্গিপাড়া-তারাইল সড়কের পাশে আজ দুপুরে গিয়ে দেখা যায়, বৈরাগী বাড়িতে নেমে এসেছে শোকের ছায়া।
সড়কের পশ্চিম পাশে ছোট একটি টিনের ঘরের সামনে স্বল্প জায়গাজুড়ে কয়েকটি আমগাছ। সেই উঠান পরিষ্কার করছিলেন বুলেট বৈরাগীর চাচা বিমল বৈরাগী। পাশে অমূল্য বৈরাগী নামের আরেক স্বজন কাঠের কফিন তৈরি করছিলেন। তারা জানান, ওই কফিনে বসতবাড়িতে বুলেট বৈরাগীকে সমাহিত করা হবে।
বিমল বৈরাগী কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, জীবনে কাউকে নখের আঁচড়ও দেয়নি, কেউ তার দিকে আঙুলও তোলেনি। সেই শান্ত ছেলেটির লাশ রাস্তার পাশে পড়ে থাকতে হলো। আমাদের সব শেষ হয়ে গেছে।






