জগতের উদ্ভব, জীবনের ধারাবাহিকতা এবং পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে নতুনের আবির্ভাব—সবকিছুর মধ্যেই ভক্ত দেবীর শক্তির প্রকাশ উপলব্ধি করেন। তাই দুর্গাপূজার প্রতিমায় আমরা যে মায়ের মুখ দেখি, তা কেবল মাটির তৈরি একটি শিল্পরূপ নয়, ভক্তের কাছে সেই মৃণ্ময়ী রূপ চিন্ময়ী শক্তিকে অনুভব করার মাধ্যম হয়ে ওঠে। প্রতিমার মধ্য দিয়ে ভক্ত নিজের বিশ্বাস, ভালোবাসা ও আত্মিক আকাঙ্ক্ষাকে প্রকাশ করেন। প্রতিমার চোখ আঁকার মুহূর্ত থেকে শুরু করে প্রাণ প্রতিষ্ঠা, মন্ত্রোচ্চারণ, অঞ্জলি ও আরতির মধ্য দিয়ে ভক্তের চেতনায় দেবী ক্রমে হয়ে ওঠেন জীবন্ত মাতৃসত্তা। ধর্মীয় বিশ্বাসে প্রতিমা পূজার তাৎপর্য কেবল তার বাহ্যিক সৌন্দর্যে সীমাবদ্ধ নয়; বরং মৃণ্ময়ী রূপের মধ্য দিয়ে চিন্ময়ী শক্তিকে অনুভব করা এবং তাঁর সঙ্গে আত্মিক সম্পর্ক স্থাপন করাই এর মূল উদ্দেশ্য।
দুর্গাপূজার প্রতিটি আচারেই এই সম্পর্কের বিভিন্ন মাত্রা প্রকাশিত হয়। বোধনের মধ্য দিয়ে দেবীর আবাহন, অধিবাসের মধ্য দিয়ে পূজার প্রস্তুতি, সপ্তমী থেকে নবমীর নানা আচার, অঞ্জলিতে আত্মনিবেদন এবং সন্ধিপূজার গাম্ভীর্য—সবকিছু মিলিয়ে পূজা হয়ে ওঠে ভক্তি, বিশ্বাস ও আত্মসমর্পণের এক ধারাবাহিক সাধনা। শঙ্খধ্বনি যখন মণ্ডপের বাতাস কাঁপিয়ে তোলে, ধূপের সুগন্ধ যখন প্রদীপের আলোয় মিশে যায়, আর অসংখ্য হাত যখন ফুল নিয়ে দেবীর চরণে নত হয়, তখন মানুষ এক সম্মিলিত ভক্তির বন্ধনে যুক্ত হয়। কারও প্রার্থনায় থাকে পরিবারের মঙ্গল, কারও প্রার্থনায় অসুস্থ স্বজনের আরোগ্য, কারও আকাঙ্ক্ষায় জীবিকার নিশ্চয়তা, আবার কারও নীরব প্রার্থনায় থাকে দীর্ঘদিনের জমে থাকা দুঃখ থেকে মুক্তির আকুতি। একই প্রতিমার সামনে দাঁড়িয়ে মানুষ ভিন্ন ভিন্ন ভাষায় নিজের মনের কথা জানায়। প্রার্থনার ভাষা ভিন্ন হলেও সবার আকাঙ্ক্ষার কেন্দ্রে থাকে একটিই অনুভূতি—মায়ের আশ্রয়। এই আশ্রয়বোধই জগজ্জননীর মাতৃরূপকে মানুষের হৃদয়ে গভীরভাবে প্রতিষ্ঠিত করেছে।

