তিন বছরে ৫ লাখ বিদেশি কর্মী নেবে ইতালি, সুযোগ পাচ্ছেন বাংলাদেশিরাও

ইতালিতে দক্ষ বিদেশি কর্মী নিয়োগের বিষয়ে উদ্যোগ শুরু হয়েছে। আগামী তিন বছরে প্রায় পাঁচ লাখ বিদেশি কর্মী নেবে দেশটি। এ ক্ষেত্রে ভাষা শিক্ষা, নাগরিক শিক্ষা ও পেশাগত প্রশিক্ষণকে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। বাংলাদেশের কর্মীদের জন্যও এ সম্ভাবনা তৈরি হচ্ছে।

বিদেশি কর্মী

দেশটির অভিবাসন আইনের ২৩ নম্বর অনুচ্ছেদ (আর্টিকেল ২৩) অনুযায়ী, ইউরোপীয় ইউনিয়নের বাইরের দেশগুলোতে বিদেশি কর্মীদের জন্য এসব প্রশিক্ষণ কার্যক্রম পরিচালনার সুযোগ রয়েছে। এর মাধ্যমে ইতালির শ্রমবাজারের চাহিদা অনুযায়ী কর্মী তৈরি এবং বৈধ অভিবাসনের পথ সহজ করাই লক্ষ্য।

বাংলাদেশের কর্মীদের জন্যও এই ব্যবস্থায় ইতালিতে কাজের সুযোগ তৈরির সম্ভাবনা রয়েছে। বিশেষ করে অনুমোদিত প্রি-ডিপারচার প্রশিক্ষণ সম্পন্ন করা ব্যক্তিরা নির্দিষ্ট শর্তে প্রচলিত কর্মী নিয়োগের কোটা ব্যবস্থার বাইরে ইতালিতে প্রবেশের সুযোগ পেতে পারেন।

লাগবে ভাষা ও প্রশিক্ষণ

২০২৩ সালে ইতালির শ্রম ও সামাজিক নীতিবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের, অভিবাসন ও সংহতি নীতিবিষয়ক মহাপরিচালকের দপ্তর আর্টিকেল ২৩-এর আওতায় পেশাগত এবং ভাষা ও নাগরিক শিক্ষা প্রশিক্ষণ কার্যক্রম পরিচালনার নির্দেশিকা প্রণয়ন করে।

২০২৩ সালের ৭ জুলাই নির্দেশিকাটি গৃহীত হয়। এতে প্রশিক্ষণ কার্যক্রম বাস্তবায়ন, প্রকল্প মূল্যায়ন এবং অংশগ্রহণকারীদের দক্ষতা যাচাইয়ের মানদণ্ড নির্ধারণ করা হয়েছে।

নির্দেশিকা অনুযায়ী, এসব প্রশিক্ষণ ইউরোপীয় ইউনিয়নের বাইরের এক বা একাধিক দেশে পরিচালনা করতে হবে। প্রশিক্ষণের মূল উদ্দেশ্য হলো, ইতালির শ্রমবাজারে কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি এবং সংশ্লিষ্ট খাতের চাহিদা অনুযায়ী বিদেশি কর্মীদের দক্ষ করে তোলা।

প্রশিক্ষণে ইতালীয় ভাষার পাশাপাশি দেশটির সংবিধানের মৌলিক নীতি, সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর কাঠামো ও কার্যক্রম এবং সামাজিক-সাংস্কৃতিক পরিবেশ সম্পর্কে ধারণা দিতে হবে। ভাষা প্রশিক্ষণ শেষে অংশগ্রহণকারীদের কমপক্ষে (এ১ পর্যায়ের দক্ষতা অর্জন করতে হবে।

পেশাগত প্রশিক্ষণে নির্দিষ্ট কাজের দক্ষতা, কর্মক্ষেত্রে স্বাস্থ্য ও নিরাপত্তা, শ্রমিকদের অধিকার, সংশ্লিষ্ট পেশার পরিভাষা এবং চাকরি খোঁজার পদ্ধতি অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। এ ক্ষেত্রে তাত্ত্বিক ও ব্যাবহারিক উভয় ধরনের প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা রাখার কথা বলা হয়েছে।

প্রশিক্ষণে কোনো ফি নেওয়া যাবে না

ইতালির নির্দেশিকায় প্রশিক্ষণার্থীদের কাছ থেকে কোনো ধরনের অর্থ নেওয়া নিষিদ্ধ করা হয়েছে। প্রশিক্ষণ আয়োজনকারী প্রতিষ্ঠান সরাসরি কিংবা পরোক্ষভাবে অংশগ্রহণকারীদের কাছ থেকে কোনো পারিশ্রমিক বা ফি দাবি করতে পারবে না।

প্রশিক্ষণার্থী নির্বাচনের ক্ষেত্রেও স্বচ্ছতা ও সমান সুযোগ নিশ্চিত করতে হবে। কোন পেশায় কতজন কর্মীর চাহিদা রয়েছে, কোন খাতে নিয়োগ দেওয়া হবে এবং সংশ্লিষ্ট কর্মীদের কী ধরনের দক্ষতা প্রয়োজন, তা আগেই নির্ধারণ করতে হবে।

এ ছাড়া ইতালীয় নিয়োগকর্তা ও কোম্পানিগুলোর সম্পৃক্ততার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। প্রশিক্ষণ চলাকালে অংশগ্রহণকারীদের সম্ভাব্য চাকরির সুযোগ, কর্মসংস্থান চুক্তির শর্ত এবং ইটালিতে প্রবেশের পদ্ধতি সম্পর্কে জানাতে হবে।

প্রশিক্ষণ শেষে অংশগ্রহণকারীদের পেশাগত দক্ষতা যাচাইয়ের জন্য পরীক্ষা নেওয়ার কথা বলা হয়েছে। প্রশিক্ষণ সম্পন্ন করা ও নির্বাচিত ব্যক্তিদের তালিকা ইটালির শ্রম ও সামাজিক নীতিবিষয়ক মন্ত্রণালয়ে পাঠাতে হবে।

এসব প্রকল্পের প্রস্তাব ইতালির শ্রম ও সামাজিক নীতিবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের, অভিবাসন ও সংহতি নীতিবিষয়ক মহাপরিচালকের দপ্তরে জমা দিতে হয়। মন্ত্রণালয়ের একটি আন্তঃমন্ত্রণালয় কমিশন প্রকল্পগুলো মূল্যায়ন ও অনুমোদনের দায়িত্ব পালন করে।

বাংলাদেশে আর্টিকেল-২৩ নিয়ে দূতাবাসের উদ্যোগ

বাংলাদেশের কর্মীদের জন্য আর্টিকেল ২৩-এর আওতায় দক্ষ অভিবাসনের সুযোগ তুলে ধরেছে ঢাকায় অবস্থিত ইতালির দূতাবাস।

বিশ্বব্যাপী ইতালীয় ভাষা সপ্তাহ ২০২৬ উপলক্ষে গত মঙ্গলবার (৩ নভেম্বর) ঢাকায় ‘ল্যাংগুয়েজ, সিভিক অ্যান্ড প্রফেশনাল ট্রেইনিং ফর স্কিলড মাইগ্রেশন টু ইতালি’ শীর্ষক একটি অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়।

ইতালির দূতাবাস ও তাদের আন্তর্জাতিক সহযোগী অংশীদারদের যৌথ উদ্যোগে আয়োজিত এ অনুষ্ঠানে প্রায় ৩০০ শিক্ষার্থীর সামনে ইটালিতে দক্ষ অভিবাসনের সুযোগ এবং দেশটির অভিবাসন আইনের সাম্প্রতিক বিধান তুলে ধরা হয়। এতে ইতালীয় ভাষা শিক্ষা, নাগরিক শিক্ষা ও পেশাগত প্রশিক্ষণের গুরুত্ব বিশেষভাবে আলোচনায় আসে।

বাংলাদেশে প্রশিক্ষণ প্রকল্প বাস্তবায়নের সুযোগ

ইতালির ২০২৩ সালের নির্দেশিকায় বাংলাদেশের নাম আলাদাভাবে উল্লেখ করা হয়নি। তবে ইউরোপীয় ইউনিয়নের বাইরের যেকোনো দেশে এসব প্রশিক্ষণ কার্যক্রম পরিচালনার সুযোগ রাখা হয়েছে। সে হিসাবে বাংলাদেশেও আর্টিকেল ২৩-এর আওতায় প্রকল্প বাস্তবায়নের সুযোগ রয়েছে।

নির্দেশিকা অনুযায়ী, আন্তর্জাতিক ও আন্তঃসরকারি সংস্থা, বেসরকারি প্রতিষ্ঠান, অলাভজনক সংস্থা, নিয়োগকর্তাদের সংগঠন, ট্রেড ইউনিয়ন এবং স্বীকৃত প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠান এসব প্রকল্পের আবেদন করতে পারে। সংশ্লিষ্ট দেশের সরকারি বা বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের অংশগ্রহণকেও ইতিবাচকভাবে বিবেচনা করা হয়।

গত ৩ নভেম্বর ঢাকায় অনুষ্ঠিত অনুষ্ঠান থেকে বাংলাদেশে আর্টিকেল ২৩-এর আওতায় কতটি প্রকল্প ইতোমধ্যে অনুমোদিত হয়েছে, কতজন কর্মী প্রশিক্ষণ পাবেন কিংবা কতজন ইতালিতে কাজের সুযোগ পাবেন, সে বিষয়ে নির্দিষ্ট কোনো সংখ্যা প্রকাশ করা হয়নি।

দূতাবাস জানিয়েছে, প্রশিক্ষণ সম্পন্ন করলেই স্বয়ংক্রিয়ভাবে ইটালিতে চাকরি বা ভিসা পাওয়া যাবে না। অনুমোদিত প্রকল্প, নিয়োগকর্তার সম্পৃক্ততা এবং দেশটির প্রযোজ্য অভিবাসন ও কর্মসংস্থান প্রক্রিয়া অনুসরণ করতে হবে।

অনুষ্ঠানে জানানো হয়, বর্তমানে ইতালিতে ২ লাখ ১৭ হাজার বাংলাদেশি বৈধভাবে বসবাস করছেন। তাদের মধ্যে ৮০ হাজার ওয়ার্ক পারমিট ভিসার আওতায় রয়েছেন।

তিন বছরে প্রায় ৫ লাখ বিদেশি কর্মী নেবে ইতালি

অনুষ্ঠানে ইটালির সরকারি কর্মী নিয়োগের কোটা ব্যবস্থা ‘দেক্রেতো ফ্লুসি’র পরিসংখ্যানও তুলে ধরা হয়। এতে বলা হয়, ২০২৬ সালে ১ লাখ ৬৪ হাজার ৮৫০ জন, ২০২৭ সালে ১ লাখ ৬৫ হাজার ৮৫০ জন এবং ২০২৮ সালে ১ লাখ ৬৬ হাজার ৮৫০ জন বিদেশি কর্মী নেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে ইটালির।

তিন বছরে সব মিলিয়ে ৪ লাখ ৯৭ হাজার ৫৫০ জন কর্মী নেওয়া হবে। বিভিন্ন দেশের জন্য নির্ধারিত কোটা অনুযায়ী এসব কর্মী নিয়োগ দেওয়া হবে।

অনুষ্ঠানে আরও জানানো হয়, অনিয়মিত অভিবাসীদের নিজ দেশে ফেরত নেওয়ার ক্ষেত্রে সহযোগিতার কারণে বাংলাদেশের জন্যও সংরক্ষিত কোটা রয়েছে। তবে প্রচলিত কোটা ব্যবস্থার বাইরে কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করেছে ইতালির অভিবাসন আইনের আর্টিকেল ২৩। এই ধারার আওতায়, ইতালির শ্রম ও সামাজিক নীতিবিষয়ক মন্ত্রণালয় অনুমোদিত ও সনদপ্রাপ্ত প্রি-ডিপারচার প্রশিক্ষণ প্রকল্প সম্পন্ন করা ব্যক্তিরা ডেকরেতো ফ্লুসির নির্ধারিত কোটা ছাড়াই বৈধভাবে ইটালিতে যাওয়ার সুযোগ পেতে পারেন।

এই প্রশিক্ষণে তিনটি বিষয় বাধ্যতামূলক। এগুলো হলো—প্রাথমিক ইতালির ভাষা শিক্ষা, ইতালি সম্পর্কে মৌলিক নাগরিক শিক্ষা এবং সংশ্লিষ্ট কাজের খাতের পেশাগত দক্ষতা অর্জন। প্রশিক্ষণ বাংলাদেশ থেকেই সম্পন্ন করতে হবে এবং এ জন্য কর্মীদের কোনো অর্থ ব্যয় করতে হবে না।

অনুষ্ঠানে ফরম্যাটের প্রতিনিধি আন্তোনিও মিলো আর্টিকেল ২৩-এর পাঁচটি সুবিধার কথা তুলে ধরে বলেন, এই ব্যবস্থায় প্রচলিত কোটা ছাড়াই ইটালিতে যাওয়ার সুযোগ রয়েছে এবং প্রশিক্ষণ বিনামূল্যে দেওয়া হয়। শুরু থেকেই ইতালি সরকার প্রশিক্ষণ কার্যক্রম পর্যবেক্ষণ করে। প্রশিক্ষণ শেষে কর্মীরা ইতালীয় ভাষা ও সংশ্লিষ্ট কাজ সম্পর্কে ধারণা নিয়ে দেশটিতে যেতে পারবেন। আর যারা শেষ পর্যন্ত ইতালিতে যাবেন না, তারাও অর্জিত দক্ষতা বাংলাদেশে কাজে লাগাতে পারবেন।

ভিসা ও দালালের খরচ নিয়ে সতর্কতা

অনুষ্ঠানে ইতালিতে যাওয়ার নামে প্রতারণার বিষয়টিও তুলে ধরা হয়। আয়োজকেরা জানান, ইটালির ভিসার সরকারি ফি ৫০ থেকে ১১৬ ইউরো। এর সঙ্গে ভিএফএসের ফি ৩৮ ইউরো যুক্ত হয়। সব মিলিয়ে সর্বোচ্চ ১৫৪ ইউরো খরচ হয়। অথচ একই ভিসার জন্য দালালরা ১০ হাজার থেকে ১৫ হাজার ইউরো পর্যন্ত নিচ্ছেন। এর বিনিময়ে অনেক ক্ষেত্রে ভুয়া কাগজপত্র ও মিথ্যা প্রতিশ্রুতি দেওয়া হচ্ছে।

আয়োজকরা বলেন, বৈধ পথে ইতালিতে যেতে খরচ তুলনামূলক কম। প্রতারণার শিকার হওয়ার ক্ষেত্রে দালালদের পেছনে অর্থ ব্যয় বড় কারণ। আর্টিকেল ২৩-এর প্রশিক্ষণ কর্মসূচিতে কোনো খরচ নেই। এ কারণে দালালের পরিবর্তে ইতালির দূতাবাস ও জনশক্তি, কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর (বিএমইটি) বৈধ তথ্য অনুসরণের পরামর্শ দেওয়া হয়।

আরও পড়ুন : ২০২৬ সালে যে ৮ দক্ষতা আপনাকে সফলতা এনে দেবে

এদিকে ইতালিতে পৌঁছানোর আট দিনের মধ্যে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিকে দেশটির পুলিশ সদর দপ্তর কয়েস্তোরায় গিয়ে রেসিডেন্স পারমিটের আবেদন করতে হবে। চুক্তি অনুযায়ী সর্বোচ্চ দুই বছরের পারমিট দেওয়া হবে, যা নবায়নযোগ্য। পাঁচ বছর বৈধভাবে বসবাসের পর স্থায়ী বা অনির্দিষ্ট মেয়াদের পারমিট পাওয়ার সুযোগ রয়েছে।

সূত্র: ইনফোমাইগ্র্যান্টস

Scroll to Top