ঢাকার আকাশের নিচে দাঁড়িয়ে বাংলাদেশ-যুক্তরাষ্ট্রের বন্ধুত্বের প্রতীক সংসদ ভবন | চ্যানেল আই অনলাইন

ঢাকার আকাশের নিচে দাঁড়িয়ে বাংলাদেশ-যুক্তরাষ্ট্রের বন্ধুত্বের প্রতীক সংসদ ভবন | চ্যানেল আই অনলাইন

বর্ষার এক বিকেলে ঢাকার আকাশ যেন দুই ভিন্ন রূপ ধারণ করেছিল। জাতীয় সংসদ ভবনের দক্ষিণ প্লাজার একদিকে ছিল উজ্জ্বল রোদ, অন্যদিকে ঘন কালো মেঘের আনাগোনা। বৃষ্টির সম্ভাবনা থাকলেও শেষ পর্যন্ত তা আর নামেনি। এই অনিশ্চিত আবহাওয়ার মধ্যেই বাংলাদেশের জাতীয় সংসদ ভবনের সামনে উদযাপিত হলো যুক্তরাষ্ট্রের স্বাধীনতার ২৫০তম বার্ষিকী। একই অনুষ্ঠানে আনুষ্ঠানিকভাবে যাত্রা শুরু করে বাংলাদেশ ককাস কমিটিও।

সন্ধ্যা ঘনিয়ে আসার সঙ্গে সঙ্গে মেঘ সরে গিয়ে সংসদ ভবনের কংক্রিটের গায়ে ছড়িয়ে পড়ে সোনালি আলো। আকাশে উড়ে যায় পাখির ঝাঁক, আর পুরো পরিবেশ যেন নতুন করে আবিষ্কৃত হয়। শেষ পর্যন্ত অনুষ্ঠানের সবচেয়ে বড় আকর্ষণ হয়ে ওঠে কোন সংগীত না, বরং স্থাপত্যের অনন্য সৌন্দর্য।

সংসদ ভবন দুই দেশের অভিন্ন ঐতিহ্যের প্রতীক

যুক্তরাষ্ট্রের স্বাধীনতা দিবসের এই আয়োজন জাতীয় সংসদ ভবনের সামনে হওয়া ছিল অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। কারণ ভবনটির নকশা করেছিলেন প্রখ্যাত মার্কিন স্থপতি লুই আই. কান, যার এই সৃষ্টি বিংশ শতাব্দীর অন্যতম শ্রেষ্ঠ স্থাপত্যকর্ম হিসেবে বিবেচিত হয়। বাংলাদেশের স্বাধীনতার আগেই ভবনটির নকশা করা হলেও কান এর সমাপ্ত রূপ দেখে যেতে পারেননি।

অনুষ্ঠানে বক্তব্য দিতে গিয়ে বাংলাদেশে নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত ব্রেন্ট ক্রিস্টেনসেন এই ইতিহাসের কথা স্মরণ করেন। তিনি আংশিক বাংলায় বক্তব্য দিয়ে নবগঠিত বাংলাদেশ ককাস কমিটিকে অভিনন্দন জানান এবং বলেন, জাতীয় সংসদ ভবন শুধু একটি স্থাপনা নয়, এটি বাংলাদেশ ও যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘদিনের বন্ধুত্বের বাস্তব প্রতীক। তিনি বলেন, অনুষ্ঠানে পরিবেশিত সংগীতও সেই বন্ধুত্বের প্রতিফলন। একই শিল্পীরা যেমন মার্কিন গান গাইবেন, তেমনি গাইবেন বাংলাদেশের গানও।

যুক্তরাষ্ট্রের স্বাধীনতার ২৫০ বছর পূর্তি প্রসঙ্গে রাষ্ট্রদূত বলেন, এটি কেবল অতীতের অর্জন স্মরণের উপলক্ষ নয়, বরং আগামী ২৫০ বছরের সম্ভাবনা ও ভবিষ্যতের প্রতিও অঙ্গীকারের প্রতীক।

স্থাপত্যে দুই দেশের অবদান

অনুষ্ঠানে ব্যারিস্টার কায়সার কামাল দুই দেশের সম্পর্ককে স্থাপত্যের মাধ্যমে ব্যাখ্যা করেন। তিনি বলেন, লুই কান যেমন বাংলাদেশের জাতীয় সংসদ ভবনের মাধ্যমে এই দেশে আমেরিকার এক স্থায়ী স্বাক্ষর রেখে গেছেন, তেমনি বাংলাদেশি প্রকৌশলী ফজলুর রহমান খান আধুনিক আকাশচুম্বী ভবনের নকশায় বিপ্লব ঘটিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের নগর স্থাপত্যে বাংলাদেশের স্বাক্ষর রেখে গেছেন। ঢাকার সংসদ ভবন এবং শিকাগোসহ যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন শহরের সুউচ্চ ভবনের মধ্যে এই ঐতিহাসিক সংযোগ দুই দেশের সম্পর্ককে আরও গভীরভাবে তুলে ধরে।

অন্যদিকে, প্রধান হুইপ নুরুল ইসলাম বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক অগ্রযাত্রার কথা তুলে ধরে বলেন, এই আয়োজন দেশের গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার চলমান পথচলার প্রতিও এক ধরনের প্রতিফলন।একই মঞ্চে দুই দেশের সংগীত

অনুষ্ঠানের সাংস্কৃতিক পরিবেশনায় অংশ নেয় যুক্তরাষ্ট্রের একটি সামরিক ব্যান্ড। তারা শুরুতেই বাংলাদেশ ও যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় সংগীত পরিবেশন করে। এরপর পরিবেশিত হয় একের পর এক জ্যাজ সংগীত। তবে শুধু মার্কিন সংগীতেই সীমাবদ্ধ থাকেনি পরিবেশনা। ব্যান্ডটি বাংলাদেশের জনপ্রিয় গানও পরিবেশন করে। বিশেষ করে প্রয়াত শিল্পী আইয়ুব বাচ্চুর জনপ্রিয় গান ‘সেই তুমি’ পরিবেশনের সময় উপস্থিত বাংলাদেশি অতিথিদের মধ্যে উচ্ছ্বাস লক্ষ্য করা যায়। কানের জ্যামিতিক নকশার কঠোর স্থাপত্য আর জ্যাজ সংগীতের মুক্ত সুর দুটি ভিন্ন শিল্পধারার এই মেলবন্ধন অনুষ্ঠানে এক অনন্য আবহ তৈরি করে।

স্থাপত্য যেখানে কূটনীতির ভাষা

অনুষ্ঠানে সংসদ সদস্য, কূটনীতিক ও বিভিন্ন রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব উপস্থিত ছিলেন। তাদের মধ্যে ছিলেন হুম্মাম কাদের চৌধুরী, ব্যারিস্টার নওশাদ জামিল, জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান, মীর আহমদ বিন কাশেম, নিপুণ রায় চৌধুরী এবং মারজিয়া মমতাজ।

পুরো আয়োজনটি শেষ পর্যন্ত মনে করিয়ে দেয়, বাংলাদেশ ও যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্ক কেবল কূটনৈতিক চুক্তি বা বাণিজ্যের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। সেই সম্পর্কের এক দিক ফুটে উঠেছে লুই কানের নকশায় নির্মিত বাংলাদেশের জাতীয় সংসদ ভবনে, অন্য দিকটি প্রতিফলিত হয়েছে বাংলাদেশে জন্ম নেওয়া প্রকৌশলী ফজলুর রহমান খানের হাত ধরে যুক্তরাষ্ট্রের আধুনিক নগর স্থাপত্যে।

বর্ষার সেই সন্ধ্যায়, যখন আকাশ সিদ্ধান্তহীন ছিল বৃষ্টি নামাবে কি না, তখন দুই দেশের এই যৌথ ইতিহাস যেন জাতীয় সংসদ ভবনের প্রাঙ্গণেই নিজের ভাষায় নতুন করে কথা বলেছে।

Scroll to Top