ডাহুক পাখির শ্বাস

ডাহুক পাখির শ্বাস

সে দেখাল। জানালার পর্দার ভাঁজে লেগে আছে। নীল রঙের না, স্নিগ্ধ কমলা রঙের জোনাকি। জোনাকির আলো কখনো কমলা হয় নাকি?

সে বাতি নিভিয়ে দিল। সঙ্গে সঙ্গে জোনাকি উধাও। কী হলো?

‘বাতি জ্বালাও।’

আলোয় আবার দৃশ্যমান হলো পোকাটা। কমলা রঙের স্নিগ্ধ আভাসমেত। জোনাকি না, রাংতা আসলে। ছোট একটা টুকরো লেগে আছে পর্দায়—আলো পড়ে প্রতিফলিত হচ্ছে। প্রায় স্থির মৃদু স্নিগ্ধ কমলা রঙের আলো। জোনাকি হলে জ্বলত–নিভত, ম্যাজেন্টা বা সবুজ রঙের হলেও।

‘তুমি কখনো জোনাকি দেখো নাই।’

‘দেখব না, দাদা?’

আমি প্রশ্ন উত্থাপন করি নাই। সে এটা আমলে নিল না, প্রচুর জোনাকি দেখার কথা বলতে থাকল।

‘কয়টা দেখছ?’

‘জি, দাদা?’

‘তোমার বয়স এখন কত? উনত্রিশ হইছে? এত দিনে কয়টা জোনাকি দেখছ? আটাশ কোটি হবে মনে করো? পৃথিবীর আটাশ কোটি মানুষ বিষাদগ্রস্ত এখন। আমাদের দেশের জনসংখ্যা কমবেশি আঠারো কোটি।’

সে ভাবল এবং বলল, ‘আটাশ কোটি হয়তো দেখি নাই।’

‘শুমার করে রাখো নাই কেন?’

সে হাসল, ‘জোনাকি শুমার করে রাখব?’

আমাদের টাউনের আর্টিস্ট ফিরু ভাই নদীর ঢেউ শুমার করত।

‘ও ফিরু ভাই, কী করো?’

‘নদীর ঢেউ গুনি রে ভাই।’

‘কয়টা গুনলা?’

‘সে বড় দুঃখের কথা রে ভাই। গুনি আর ভুলে যাই। মনে থাকে না কয়টা গুনলাম।’

ফিরু ভাই ডুবে মরেছিল। কলেজের মুসলিম হোস্টেলের পুকুরে তার লাশ উপুড় হয়ে ভাসছিল। টাউনের মানুষ ভেঙে পড়েছিল দেখতে।

থানা–পুলিশ হয় নাই। অহীন্দ্র দাস ফিরু। জগৎ–সংসারে কেউ ছিল না তার। টাউনের মানুষ সম্মিলিতভাবে তার অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া সম্পন্ন

করেছিল। ফিরু ভাইয়ের মুখে আগুন দিয়েছিল বকশীদার ছেলে নবকৃষ্ণ। কালে সে–ই নব মদখোর হয়েছে। বাজি ধরে এক জেরিক্যান বাংলা মদ খেয়ে রেকর্ড করেছে। কত–কী! কী থেকে কী! এই যে একজন আমার সামনে বসে আছে, ফড়িংকে

মুরগি মনে করত সে, ফড়িং জবাই করত কিন্তু ভেজে খায় নাই, সে কে? আমি? আমি কে? সে?

‘দাদা, যাই।’

চলে গেল সে। বা থেকে গেল।

আমি চলে গেলাম। বা থাকলাম।

ডাহুক পাখির শ্বাসের মতো এই সব।

Scroll to Top