
ওয়াশিংটন, ২৩ মে – মার্কিন রাজনীতিতে এক বিশাল ধাক্কা! ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসনের সবচেয়ে আলোচিত এবং প্রভাবশালী মুখ, যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় গোয়েন্দা পরিচালক (DNI) তুলসি গ্যাবার্ড আকস্মিকভাবে পদত্যাগের ঘোষণা দিয়েছেন। তবে কোনো রাজনৈতিক দ্বন্দ্বে নয়, বরং নিজের জীবনের সবচেয়ে বড় ব্যক্তিগত যুদ্ধের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে এই কঠিন সিদ্ধান্ত নিতে হয়েছে তাকে।
তার স্বামী আব্রাহাম উইলিয়ামস এক বিরল ধরনের বোন (হাড়ের) ক্যানসারে আক্রান্ত হয়েছেন। এই কঠিন সময়ে স্বামীর পাশে থেকে তার চিকিৎসার দেখভাল করতেই জনসেবা এবং ক্ষমতার শীর্ষ পদ থেকে সরে দাঁড়াচ্ছেন তুলসি।
ফক্স নিউজ ডিজিটালের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গত শুক্রবার (২২ মে) ওভাল অফিসে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের সাথে একান্ত বৈঠকে তুলসি গ্যাবার্ড ব্যক্তিগতভাবে তার এই সিদ্ধান্তের কথা জানান। আগামী ৩০ জুন, ২০২৬ হতে যাচ্ছে গোয়েন্দা প্রধান হিসেবে তার শেষ কার্যদিবস।
পদত্যাগপত্রের সেই আবেগঘন বার্তা: “তিনি আমার শক্তির উৎস”
ফক্স নিউজের হাতে আসা তুলসি গ্যাবার্ডের পদত্যাগপত্রটি ছিল অত্যন্ত আবেগপূর্ণ। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের উদ্দেশে তিনি লিখেছেন, “গত দেড় বছর ধরে জাতীয় গোয়েন্দা দপ্তরের নেতৃত্ব দেওয়ার সুযোগ ও আমার ওপর আস্থা রাখার জন্য আমি গভীরভাবে কৃতজ্ঞ। কিন্তু দুঃখজনকভাবে, আমার স্বামী আব্রাহামের সম্প্রতি অত্যন্ত বিরল ধরনের বোন ক্যানসার ধরা পড়েছে। আগামী কয়েক মাস তাকে এক বড় শারীরিক ও মানসিক লড়াইয়ের মধ্য দিয়ে যেতে হবে।”
১১ বছরের দাম্পত্য জীবনের কথা স্মরণ করে তুলসি আরও বলেন, “পূর্ব আফ্রিকায় সামরিক অভিযানে আমার মোতায়েন, একাধিক রাজনৈতিক প্রচারণা থেকে শুরু করে আজকের এই গুরুদায়িত্ব— প্রতিটি মুহূর্তে আব্রাহাম অটলভাবে আমার পাশে ছিলেন। এত কঠিন লড়াইয়ে তাকে একা রেখে আমি এই অত্যন্ত সময়সাপেক্ষ ও চাপপূর্ণ দায়িত্ব চালিয়ে যেতে পারি না।”
ট্রাম্প প্রশাসনে তুলসির দেড় বছর: মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থায় তুমুল তোলপাড়!
জাতীয় গোয়েন্দা পরিচালক হিসেবে তুলসি গ্যাবার্ডের এই দেড় বছরের মেয়াদ ছিল মার্কিন ইতিহাসের অন্যতম ঝড়ো এবং সংস্কারমুখী অধ্যায়।
এক নজরে দেখে নেওয়া যাক কী কী ঐতিহাসিক পদক্ষেপ নিয়েছিলেন তিনি:
৭০ কোটি ডলার সাশ্রয়: গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর আকার ছোট করে এবং অপ্রয়োজনীয় প্রশাসনিক ব্যয় কমিয়ে বছরে ৭০ কোটি ডলারেরও বেশি সরকারি অর্থ সাশ্রয় করেন তিনি।
গোপন নথি প্রকাশ: চলতি মাসেই তিনি প্রায় ৫ লাখেরও বেশি অতি-গোপনীয় সরকারি নথি জনসাধারণের জন্য উন্মুক্ত করে দেন। যার মধ্যে সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট জন এফ কেনেডি (JFK) এবং রবার্ট এফ কেনেডি (RFK) হত্যাকাণ্ডসংক্রান্ত সংবেদনশীল ফাইলও ছিল।
‘ক্রসফায়ার হারিকেন’ ও ওবামা প্রশাসনকে তোপ: ২০১৬ সালের নির্বাচনে ট্রাম্প-রাশিয়া তদন্তের সূচনা নিয়ে হওয়া ‘ক্রসফায়ার হারিকেন’ এর নথি প্রকাশ করেন তুলসি। তার দাবি ছিল, ওবামা প্রশাসনের কর্মকর্তারা ট্রাম্পের প্রথম প্রেসিডেন্সিকে দুর্বল করতে গোয়েন্দা তথ্য রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে ব্যবহার করেছিলেন।
বাইডেন প্রশাসনের বিরুদ্ধে তদন্ত: ফেডারেল সংস্থাগুলোর মধ্যে সমন্বয় করে বাইডেন প্রশাসনের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগ খতিয়ে দেখতে তিনি গঠন করেছিলেন শক্তিশালী ‘ওয়েপনাইজেশন ওয়ার্কিং গ্রুপ’।
সন্ত্রাস দমনে রেকর্ড: তার নেতৃত্বাধীন ন্যাশনাল কাউন্টারটেররিজম সেন্টার শুধু ২০২৫ সালেই মাদক-সন্ত্রাসবাদের সাথে জড়িত ১০ হাজারেরও বেশি মানুষকে যুক্তরাষ্ট্রে ঢুকতে বাধা দেয় এবং ৮৫ হাজার洍ও বেশি সন্দেহভাজনকে সন্ত্রাস পর্যবেক্ষণ তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করে।
তুলসি গ্যাবার্ড শুধু একজন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাই ছিলেন না, বরং ট্রাম্পের “আমেরিকা ফার্স্ট” নীতির অন্যতম প্রধান সেনাপতি ছিলেন। ডেমোক্র্যাট দল ছেড়ে ট্রাম্পের শিবিরে যোগ দেওয়া তুলসি মার্কিন গোয়েন্দা বলয় থেকে তথাকথিত ‘ডিপ স্টেট’ বা আমলাতান্ত্রিক জটিলতা ভাঙার মিশনে নেমেছিলেন। তার এই হঠাৎ বিদায় ট্রাম্প প্রশাসনের গোয়েন্দা সংস্কারের গতিকে কিছুটা হলেও থমকে দিতে পারে। তবে ওয়াশিংটনের ক্ষমতা ও রাজনীতি ছাপিয়ে এই মুহূর্তে তুলসির কাছে তার স্বামীর জীবন বাঁচানোর লড়াইটাই সবচেয়ে বড় অগ্রাধিকার।
এনএন/ ২৩ মে ২০২৬






