
ওয়াশিংটন, ২০ মে – বিশ্বের বৃহত্তম দ্বীপ গ্রিনল্যান্ডের ভবিষ্যৎ ও নিয়ন্ত্রণ নিয়ে ডেনমার্কের সঙ্গে চরম দরকষাকষি শুরু করেছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বারবার গ্রিনল্যান্ডের ওপর আমেরিকার পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ বা বড় ভূমিকার দাবি তুলে ধরেছেন। ওয়াশিংটনের দাবি—উত্তর মেরু অঞ্চলে রাশিয়া ও চীনের ক্রমবর্ধমান সামরিক ও কৌশলগত তৎপরতা রুখতে গ্রিনল্যান্ডে মার্কিন হস্তক্ষেপ এখন সময়ের দাবি।
দ্য নিউইয়র্ক টাইমস-এর এক চাঞ্চল্যকর প্রতিবেদন অনুযায়ী, গ্রিনল্যান্ডের ভবিষ্যৎ নিয়ে গত চার মাস ধরে ওয়াশিংটনে অত্যন্ত গোপনে আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছেন মার্কিন ও ডেনিশ উচ্চপদস্থ কর্মকর্তারা।
ন্যাটো জোটের দুই গুরুত্বপূর্ণ সদস্য দেশ—যুক্তরাষ্ট্র ও ডেনমার্কের মধ্যকার এই আলোচনার মূল লক্ষ্য কিন্তু দ্বিপাক্ষিক উন্নয়ন নয়। বরং, গ্রিনল্যান্ড ‘দখল’ বা কিনে নেওয়ার বিষয়ে ডোনাল্ড ট্রাম্প যে অনড় অবস্থান ও বারবার হুমকি দিয়ে আসছেন, তা বন্ধ করা। ওয়াশিংটন ও কোপেনহেগেনের কূটনীতিকরা চাচ্ছেন, এই ইস্যু নিয়ে তৈরি হওয়া উত্তেজনা যেন কোনোভাবেই পশ্চিমা সামরিক জোট ন্যাটোকে (NATO) ভেতর থেকে দুর্বল বা ক্ষতিগ্রস্ত না করে।
যুক্তরাষ্ট্র বর্তমানে ডেনমার্কের সঙ্গে থাকা একটি দীর্ঘদিনের সামরিক চুক্তি সংশোধন করতে মরিয়া। ওয়াশিংটনের প্রস্তাব হলো—ভবিষ্যতে গ্রিনল্যান্ড যদি ডেনমার্ক থেকে সম্পূর্ণ স্বাধীনও হয়ে যায়, তবুও সেখানে মার্কিন সেনারা অনির্দিষ্টকালের জন্য অবস্থান করতে পারবে।
তবে এই ধারণা গ্রিনল্যান্ডের সাধারণ মানুষের কাছে বিন্দুমাত্র জনপ্রিয় নয়। গ্রিনল্যান্ডবাসীর তীব্র আপত্তি থাকা সত্ত্বেও, মার্কিন প্রতিরক্ষা সদর দফতর পেন্টাগন ইতিমধ্যে দক্ষিণ গ্রিনল্যান্ডে আরও বড় সামরিক ঘাঁটি ও উপস্থিতি বাড়ানোর পরিকল্পনা নিয়ে কাজ শুরু করে দিয়েছে।
গ্রিনল্যান্ডের কৌশলগত ভৌগোলিক অবস্থানের পাশাপাশি আমেরিকার মূল চোখ মূলত দুটি জায়গায়:
বড় বিনিয়োগের নিয়ন্ত্রণ: গ্রিনল্যান্ডে যেকোনো বড় বৈদেশিক বিনিয়োগ চুক্তিতে নিজেদের প্রভাব রাখতে চায় ওয়াশিংটন, যাতে বেইজিং বা মস্কো সেখানে অর্থনৈতিকভাবে পা রাখার সুযোগ না পায়। তবে ডেনমার্ক ও গ্রিনল্যান্ড প্রশাসন এই খবরদারিতে তীব্র আপত্তি জানিয়েছে।
প্রাকৃতিক সম্পদের ভাণ্ডার: জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে গ্রিনল্যান্ডের বরফ গলতে থাকায় সেখানে থাকা বিপুল পরিমাণ তেল, ইউরেনিয়াম এবং আধুনিক প্রযুক্তির জন্য অতিপ্রয়োজনীয় ‘রেয়ার আর্থ এলিমেন্টস’ বা বিরল খনিজ সম্পদ উত্তোলনের সম্ভাবনা খতিয়ে দেখছে যুক্তরাষ্ট্র।
গ্রিনল্যান্ডের স্থানীয় নেতাদের মধ্যে এখন তীব্র উদ্বেগ ও আতঙ্ক কাজ করছে। তাঁদের আশঙ্কা, মধ্যপ্রাচ্যে ইরান কেন্দ্রিক উত্তেজনা বা যুদ্ধ পরিস্থিতি প্রশমিত হওয়ামাত্রই ট্রাম্প তাঁর পুরো শক্তি দিয়ে গ্রিনল্যান্ডের ওপর চাপ বাড়াবেন।
এমনকি কূটনৈতিক মহলে কেউ কেউ আশঙ্কা করছেন, আগামী ১৪ জুন ট্রাম্পের ৮০তম জন্মদিন। নিজের এই বিশেষ মাইলফলক ছোঁয়ার আগে বিশ্ব রাজনীতিতে একটি ‘মহা-সাফল্য’ বা বড় কোনো চুক্তি অর্জনের জন্য তিনি গ্রিনল্যান্ড ইস্যুটিকে তুরুপের তাস হিসেবে ব্যবহার করতে পারেন।
গ্রিনল্যান্ডের কর্মকর্তাদের স্পষ্ট বক্তব্য, নিরাপত্তার দোহাই দিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের এই অতিরিক্ত আগ্রাসী দাবিগুলো মূলত তাদের নিজস্ব সার্বভৌমত্ব এবং স্বাধীনতার ওপর এক প্রকার নগ্ন হস্তক্ষেপের শামিল। ট্রাম্পের এই আর্কটিক এজেন্ডা আগামী দিনে ওয়াশিংটনের সঙ্গে পুরো ইউরোপের সম্পর্কের সমীকরণ বদলে দিতে পারে।
এনএন/ ২০ মে ২০২৬






