জাতীয় উন্নয়নে জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের সম্পৃক্ততা এখন সময়ের দাবি | চ্যানেল আই অনলাইন

জাতীয় উন্নয়নে জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের সম্পৃক্ততা এখন সময়ের দাবি | চ্যানেল আই অনলাইন

একটি রাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় শক্তি শুধু তার প্রাকৃতিক সম্পদ নয়, দক্ষ মানবসম্পদও। এই মানবসম্পদ গড়ে তুলতে শিক্ষা, প্রশিক্ষণ, গবেষণা ও দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগের প্রয়োজন হয়। জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরাও এমনই একটি জাতীয় সম্পদ, যাদের জ্ঞান ও দক্ষতার যথাযথ ব্যবহার নিশ্চিত করা টেকসই উন্নয়নের অন্যতম পূর্বশর্ত।

বাংলাদেশে প্রতিবছর বহু চিকিৎসক, দন্তচিকিৎসক, নার্স ও অন্যান্য স্বাস্থ্যবিজ্ঞানী জনস্বাস্থ্যে উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করে বিশেষজ্ঞ হিসেবে গড়ে উঠছেন। তাদের লক্ষ্য কেবল একটি অতিরিক্ত ডিগ্রি অর্জন নয়; বরং রোগ প্রতিরোধ, স্বাস্থ্যনীতি, গবেষণা, রোগ নজরদারি, স্বাস্থ্য শিক্ষা, স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনা এবং প্রমাণভিত্তিক সিদ্ধান্ত গ্রহণে দক্ষতা অর্জন। কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো “এই বিশেষায়িত জ্ঞান ও দক্ষতার সর্বোচ্চ ব্যবহার কি দেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থায় নিশ্চিত করা যাচ্ছে?”

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার স্বাস্থ্যের জন্য মানবসম্পদ বিষয়ক বৈশ্বিক কৌশল এবং বাংলাদেশের স্বাস্থ্য খাতের জনবল উন্নয়ন কৌশল উভয়ই মানবসম্পদ তৈরির পাশাপাশি তাদের দক্ষতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ দায়িত্ব, কর্মপরিসর ও দীর্ঘমেয়াদি সম্পৃক্ততার ওপর গুরুত্ব দিয়েছে। কারণ জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের কাজ হাসপাতালের চার দেয়ালের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। রোগ প্রতিরোধ, মহামারি প্রস্তুতি, স্বাস্থ্যঝুঁকি বিশ্লেষণ, স্বাস্থ্যনীতি প্রণয়ন, পরিবেশগত স্বাস্থ্য, অসংক্রামক রোগ নিয়ন্ত্রণ এবং জলবায়ু পরিবর্তনের স্বাস্থ্যপ্রভাব মোকাবিলায় তাদের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। চিকিৎসা একজন রোগীকে সুস্থ করে, আর জনস্বাস্থ্য একটি জনগোষ্ঠীকে সুস্থ রাখে। বর্তমানে বাংলাদেশ ডায়াবেটিস, হৃদরোগ, ক্যান্সার, অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল রেজিস্ট্যান্স, মানসিক স্বাস্থ্য, নগর স্বাস্থ্য, বয়স্ক জনগোষ্ঠীর স্বাস্থ্য এবং ভবিষ্যৎ মহামারির প্রস্তুতির মতো বহুমাত্রিক চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি।

একই সঙ্গে দেশ সর্বজনীন স্বাস্থ্যসেবা (ইউএইচসি) ও টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (এসডিজি-৩) অর্জনের পথে এগিয়ে যাচ্ছে। এসব লক্ষ্য অর্জনে জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের কার্যকর সম্পৃক্ততা অপরিহার্য। অথচ ধীরে ধীরে জনস্বাস্থ্য শিক্ষার প্রসার ঘটলেও তাদের জন্য দক্ষতাভিত্তিক ভূমিকা, সুসংগঠিত কর্মপরিকল্পনা এবং দীর্ঘমেয়াদি ক্যারিয়ার কাঠামো এখনও যথেষ্ট স্পষ্ট নয়। ফলে অনেকেই তাদের বিশেষায়িত দক্ষতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ কর্মপরিসর না পেয়ে কেউ ক্লিনিক্যাল সেবায় ফিরে যান, কেউ প্রশাসনিক বা উন্নয়ন খাতে যুক্ত হন, কেউ উচ্চশিক্ষা বা কর্মসংস্থানের জন্য বিদেশে সুযোগ খুঁজে নেন, আবার কেউ সম্পূর্ণ ভিন্ন পেশাগত প্রস্তুতি গ্রহণ করেন।

এই প্রশ্ন কোনো নির্দিষ্ট পেশার কর্মসংস্থানের দাবি নয়; বরং জাতীয় সম্পদ ব্যবস্থাপনার একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন। রাষ্ট্র যখন দক্ষ জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ তৈরিতে বিনিয়োগ করে, তখন সেই জ্ঞান ও নেতৃত্ব যদি স্বাস্থ্যনীতি, গবেষণা, রোগ প্রতিরোধ ও জনস্বাস্থ্য কর্মসূচিতে যথাযথভাবে ব্যবহৃত না হয়, তবে সেই বিনিয়োগের পূর্ণ সুফল অর্জন করা সম্ভব হয়ে ওঠে না। এতে আর্থিক অপচয়ের পাশাপাশি সম্ভাবনা, গবেষণা ও নেতৃত্বেরও অপচয় ঘটে। বিশ্বের উন্নত দেশগুলো চিকিৎসানির্ভর স্বাস্থ্যসেবার পাশাপাশি প্রতিরোধনির্ভর জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থাকে অগ্রাধিকার দিচ্ছে। কারণ প্রতিরোধে বিনিয়োগ রোগের বোঝা ও চিকিৎসা ব্যয় কমায়, কর্মক্ষম জনশক্তি বাড়ায় এবং জাতীয় অর্থনীতিকে শক্তিশালী করে। বাংলাদেশেও এই পরিবর্তনের চালিকাশক্তি হতে পারেন দক্ষ জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা, যদি তাদের জ্ঞান ও দক্ষতা পরিকল্পিতভাবে কাজে লাগানোর উপযুক্ত পরিবেশ তৈরি হয়।

তাই সরকারের প্রতি বিনীত আহ্বান—স্বাস্থ্যখাতে অবকাঠামো উন্নয়নের পাশাপাশি মানবসম্পদ ব্যবস্থাপনাকেও সমান গুরুত্ব দেওয়া হোক। জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের একটি কৌশলগত জাতীয় সম্পদ হিসেবে বিবেচনা করে রোগ প্রতিরোধ, স্বাস্থ্যনীতি, গবেষণা, রোগ নজরদারি, স্বাস্থ্য শিক্ষা এবং কর্মসূচি পরিকল্পনা ও মূল্যায়নে তাদের প্রাতিষ্ঠানিক সম্পৃক্ততা আরও শক্তিশালী করার জন্য দীর্ঘমেয়াদি কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ করা প্রয়োজন। কারণ শক্তিশালী স্বাস্থ্যব্যবস্থা শুধু হাসপাতাল, প্রযুক্তি বা স্বাস্থ্যকর্মী দিয়ে নয়, সঠিক স্থানে সঠিক দক্ষতার মানুষকে কাজে লাগানোর মধ্য দিয়েই গড়ে ওঠে।

(এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)

Scroll to Top