বন্যার পানি নেমেছে কয়েক দিন আগে। চারদিকে এখনো ভেজা মাটি। পলির স্তূপ থেকে ছড়িয়েছে স্যাঁতসেঁতে গন্ধ। এর মধ্যেই বসে খেলছে ১৮ মাস বয়সী যমজ দুই ভাই–বোন। আর তাদের পাশে মেঝেতে নতুন করে কাদা লেপে বসবাসের উপযোগী করার চেষ্টা করছেন মা রোকসানা বেগম।
গতকাল সোমবার দুপুরে সরেজমিনে পেকুয়া পৌরসভার পূর্ব বিলাচূড়া এলাকায় দেখা যায় এ চিত্র। জানতে চাইলে চোখের পানি মুছতে মুছতে রোকসানা বেগম বলেন, ‘আমার স্বামী অসুস্থ। তেমন আয়রোজগার নেই। অনেক কষ্টে বেড়ার এই ঘরটা বানিয়েছিলাম। বন্যায় সেটাও রক্ষা হলো না। সারা দিন কাদার মধ্যে থাকায় বাচ্চা দুটির জ্বর-সর্দি লেগেই আছে। আল্লাহ জানেন, আমার এই দুর্ভোগ কবে শেষ হবে।’
অবশ্য শুধু রোকসানা নয়। তাঁর মতো একই অবস্থা উপজেলার অন্তত ৫০০টি পরিবারের। সম্প্রতি বন্যায় তাঁদের সবার ঘর পুরোপুরি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। উপজেলার গোঁয়াখালী, বাংলাপাড়া, বাইম্যাখালী, হরিণাফাঁড়ি, বটতলীয়াপাড়াসহ বিভিন্ন এলাকার হাজারো পরিবার এখনো ভাঙা ঘর, কাদা আর অনিশ্চয়তার মধ্যে দিন কাটাচ্ছে। বন্যার পানি কমায় তাঁদের অনেকেই কোনো রকমে মেরামত করার চেষ্টা করছে। তবে ভাঙা ঘরের চাল, কাদায় ডুবে থাকা মেঝে আর চারদিকে জমে থাকা পলির কারণে অনেক পরিবার এখনো স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে পারেনি।
গতকাল বিকেলে সরেজমিনে পেকুয়া পৌরসভার পূর্ব বিলাচূড়া এলাকায় দেখা যায়, অধিকাংশ বাড়িতেই চলছে কাদা সরানো, মেঝে ভরাট কিংবা ভাঙা ঘর মেরামতের কাজ। কোথাও বাঁশ দিয়ে ঠেকনা দেওয়া হয়েছে হেলে পড়া ঘর, কোথাও নতুন করে বেড়া বাঁধার চেষ্টা চলছে।
পাশের মইয়াদিয়া গ্রামের জসিম উদ্দিনের বাড়িতেও একই চিত্র। ভাঙা বারান্দার ওপর বাঁশের খুঁটি দিয়ে বানানো অস্থায়ী মাচায় শুয়ে আছেন দীর্ঘদিনের অসুস্থ এই ব্যক্তি। পরিবারের সদস্যরা জানান, বন্যার পানি প্রায় ঘরের চাল পর্যন্ত উঠে গিয়েছিল। আসবাবপত্রের পাশাপাশি মেয়েদের বই-খাতাও নষ্ট হয়েছে। তাই আপাতত কেউই বিদ্যালয়ে যেতে পারছে না।
জসিম উদ্দিনের স্ত্রী আজবাহার বেগম বলেন, ‘অসুস্থ স্বামী আর চার মেয়েকে নিয়ে অনেক কষ্টের সংসার। ধারদেনা করে এক মেয়ের বিয়ে দিয়েছি, এখনো সেই ঋণ শোধ করছি। আমার মা–বাবা দয়া করে এই ঘরটি বেঁধে দিয়েছিলেন। বন্যার পানি আমার সেই শেষ সম্বলটুকুও কেড়ে নিয়েছে। এখন আমি একেবারে নিঃস্ব।’
স্থানীয় সূত্র জানায়, সম্প্রতি পৌরসভার সীমানা সম্প্রসারণের ফলে বিলাচূড়াসহ কয়েকটি এলাকা পৌরসভার অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। এ কারণে ইউনিয়ন পরিষদের নির্বাচিত সদস্যরা এখন সাবেক। তাঁদের একজন সদস্য মোহাম্মদ মানিক। তিনি বলেন, বিলাচূড়া, ছিরাদিয়া ও মইয়াদিয়া এলাকায় অন্তত ৩৬৫টি বসতঘর মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এখনো অনেক পরিবার ভাঙা ঘর বাসযোগ্য করার সংগ্রাম করছে।
জেলা প্রশাসনের তথ্য অনুযায়ী, চলতি জুলাইয়ের বন্যায় কক্সবাজার জেলার মধ্যে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে পেকুয়া উপজেলা। উপজেলার সাতটি ইউনিয়ন ও একটি পৌরসভার প্রায় ৮৫ শতাংশ এলাকা প্লাবিত হয়। এতে প্রায় দুই হাজার বসতঘর আংশিক বা সম্পূর্ণ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা কাউসার আহমেদ বলেন, বন্যায় ২৫১টি আধ পাকা ঘর ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এ ছাড়া ৫০০টি কাঁচাঘর সম্পূর্ণ বিধ্বস্ত এবং এক হাজার ২৪৯টি কাঁচাঘর আংশিক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের তালিকা তৈরি করে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে পাঠানো হয়েছে। পর্যায়ক্রমে সরকারি সহায়তা দেওয়া হবে।

