ক্ষমতাচ্যুত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ছেলে সজিব ওয়াজেদ জয়ের অপ্রকাশিত বিবাহবিচ্ছেদ সংক্রান্ত নিষ্পত্তি নথি সামনে এসেছে। সেখানে বহু-মিলিয়ন ডলারের আর্থিক বন্দোবস্ত, করপোরেট শেয়ার হস্তান্তর এবং বাংলাদেশের বড় টেলিযোগাযোগ ও প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ভবিষ্যৎ আর্থিক দাবির বিষয় উঠে এসেছে।
সংবাদমাধ্যম বাংলা আউটলুক এক প্রতিবেদনে এই তথ্য জানিয়েছে।
জয়ের সাবেক স্ত্রী ক্রিস্টিনা ওয়াজেদের সঙ্গে হওয়া ওই চুক্তিতে এক দশকের আর্থিক সহায়তা, ডিজিকন টেকনোলজিস ও ফিনটেক সলিউশনসে ব্যবসায়িক স্বার্থ ভাগাভাগি এবং সামিট কমিউনিকেশনস লিমিটেড সংশ্লিষ্ট সম্ভাব্য আয়কে ঘিরে একটি ট্রাস্ট কাঠামোর বিষয় উল্লেখ রয়েছে।
২২ পৃষ্ঠার চুক্তির ১৩ থেকে ১৫ নম্বর পৃষ্ঠাজুড়ে থাকা নথিগুলোতে বিবাহবিচ্ছেদের পর ব্যবসায়িক স্বার্থ ও আর্থিক দায়বদ্ধতা কীভাবে ভাগ হবে, তার বিস্তারিত বিবরণ দেওয়া হয়েছে।
২০২৫ সালের শুরুর দিকে নিজের ভেরিফায়েড ফেসবুক প্রোফাইলে জয় জানান, আনুষ্ঠানিক বিচ্ছেদের আগে প্রায় তিন বছর ধরে তারা আলাদা ছিলেন।
চুক্তির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ শর্ত অনুযায়ী, জয়ের মালিকানাধীন ডিজিকন টেকনোলজিস এবং ফিনটেক সলিউশনসের ৫০ শতাংশ শেয়ার কার্যকর হওয়ার পর “যত দ্রুত সম্ভব” ক্রিস্টিন ওয়াজেদের কাছে হস্তান্তর করতে হবে।
নথিতে স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে, ক্রিস্টিন তার অংশ পাওয়ার আগে জয় এসব প্রতিষ্ঠানের শেয়ার কোনো তৃতীয় পক্ষের কাছে বিক্রি বা হস্তান্তর করতে পারবেন না।
শেয়ার হস্তান্তর সম্পন্ন হলে, উভয় পক্ষ নিজ নিজ নামে নিবন্ধিত শেয়ারের একক মালিকানা রাখবেন এবং সংশ্লিষ্ট দায়, কর ও ব্যয় নিজ নিজভাবে বহন করবেন। একইসঙ্গে নিষ্পত্তির পর ব্যক্তি মালিকানাধীন ব্যবসা থেকে অর্জিত আয়, ইকুইটি বা মূল্যও সংশ্লিষ্ট মালিকের কাছেই থাকবে।
চুক্তির আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ অংশজুড়ে রয়েছে সামিট কমিউনিকেশনস লিমিটেড। নথি অনুযায়ী, ২০০৯ সালে কার্যক্রম শুরু করা প্রতিষ্ঠানটির সঙ্গে বৈবাহিক সম্পদের সম্পর্ক ছিল এটি “শুধু এই চুক্তির উদ্দেশ্যে” জয় স্বীকার করেছেন।
নথিতে উল্লেখ করা হয়, সামিট কমিউনিকেশনসের মালিকরা প্রতিষ্ঠানটি বিক্রির চেষ্টা করেছিলেন এবং এ প্রতিষ্ঠানে নিজের সংশ্লিষ্টতা ও প্রচেষ্টার কারণে জয় ভবিষ্যতে অর্থ বা শেয়ার পাওয়ার সম্ভাবনা দেখছিলেন।
চুক্তি অনুযায়ী, দম্পতির মেয়ে সোফিয়ার কল্যাণে একটি ট্রাস্ট গঠন করা হবে। সামিট কমিউনিকেশনস বিক্রি বা মালিকানাসংশ্লিষ্ট স্বার্থ থেকে জয় যে নিট অর্থ পাবেন, তার ৩০ শতাংশ ওই ট্রাস্টে যাবে। জয়ের মালিকানাধীন বা প্রতিষ্ঠিত অন্য কোনো ট্রাস্ট, ব্যবসা বা প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে প্রাপ্ত অর্থের ক্ষেত্রেও এ শর্ত প্রযোজ্য হবে।
নথিতে কার্ট গ্রুয়েলকে ট্রাস্টি হিসেবে মনোনীত করা হয়েছে। জয় ও ক্রিস্টিন ওয়াজেদ থাকবেন বিকল্প ট্রাস্টি। ট্রাস্টের অর্থ সোফিয়ার স্বাস্থ্য, শিক্ষা, রক্ষণাবেক্ষণ ও সহায়তার জন্য ব্যয় হবে।
চুক্তিতে বলা হয়েছে, সামিট কমিউনিকেশনস সংশ্লিষ্ট অর্থ বা সম্পদ জয় বাস্তবে পাওয়ার পরই ৩০ শতাংশ ট্রাস্টে দেওয়ার বাধ্যবাধকতা কার্যকর হবে। অর্থ নগদ, শেয়ার বা অন্য সম্পদ যে রূপেই আসুক, একই রূপে তা ট্রাস্টে স্থানান্তর করতে হবে। যদি নগদের বদলে শেয়ার পান, তবে তার ৩০ শতাংশ “যত দ্রুত সম্ভব” সোফিয়ার ট্রাস্টে দিতে হবে।
ট্রাস্ট গঠনের সময় যদি বকেয়া হস্তান্তরের বিষয় আসে, তাহলে শেয়ার সরাসরি সোফিয়ার নামে স্থানান্তর করা হবে। ট্রাস্ট গঠনের ব্যয় উভয় পক্ষ সমানভাবে বহন করবেন।
করপোরেট সম্পদের বাইরে, চুক্তিতে জয়ের ওপর বড় ধরনের ব্যক্তিগত আর্থিক দায়ও আরোপ করা হয়েছে। “মনিটারি অ্যাওয়ার্ড” শিরোনামের অংশ অনুযায়ী, ২০২৫ সালের ১ জুনের মধ্যে ক্রিস্টিন ওয়াজেদকে এককালীন করমুক্ত ১০ লাখ মার্কিন ডলার (প্রায় ১২ কোটি ২৯ লাখ টাকা) পরিশোধ করতে হবে।
এ ছাড়া, ২০২৪ সালের ১ জুলাই থেকে শুরু করে প্রতি মাসের প্রথম দিনে ২০ হাজার ডলার (প্রায় ২৪ লাখ ৫৮ হাজার টাকা) করে ভরণপোষণ দিতে হবে, যা ২০৩৪ সালের ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত চলবে। পুরো সময়জুড়ে এ অর্থের পরিমাণ ২৫ লাখ ডলারেরও বেশি (প্রায় ৩০ কোটি ৭১ লাখ টাকা) হবে।
চুক্তিতে স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে, ভরণপোষণের পরিমাণ ও মেয়াদ পরিবর্তনযোগ্য নয়। তবে উভয় পক্ষের কারও মৃত্যু, ক্রিস্টিন ওয়াজেদের পুনর্বিবাহ, অথবা এক বছর বা তার বেশি সময় ধরে বৈবাহিক সম্পর্কসদৃশ সহবাসে থাকলে এই অর্থপ্রদান বন্ধ হবে।
এ ছাড়া, যুক্তরাষ্ট্রের ভার্জিনিয়ার শিশু ভরণপোষণ নির্দেশিকা অনুযায়ী, কন্যা সোফিয়ার জন্য প্রতি মাসে ৩ হাজার ৪০০ ডলার (প্রায় ৪ লাখ ১৮ হাজার টাকা) দিতে সম্মত হয়েছেন জয়।
নথিতে বলা হয়েছে, সন্তান পূর্ণকালীন উচ্চবিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী হলে, নিজে আয় করতে সক্ষম না হলে এবং ভরণপোষণ গ্রহণকারী অভিভাবকের সঙ্গে বসবাস করলে ১৮ বছরের পরও সহায়তা অব্যাহত থাকতে পারে। গুরুতর ও স্থায়ী শারীরিক বা মানসিক প্রতিবন্ধকতার ক্ষেত্রেও এই সহায়তা বহাল থাকতে পারে।
এসব নথি প্রকাশের ঘটনা এমন সময়ে সামনে এলো, যখন জয়ের বিদেশি সম্পদ ও আর্থিক লেনদেন নিয়ে নজরদারি অব্যাহত রয়েছে। দুর্নীতি দমন কমিশন যুক্তরাষ্ট্রে জয় ও তার সংশ্লিষ্টদের সম্পত্তি, বিলাসবহুল গাড়ি এবং সম্ভাব্য অর্থপাচারসংক্রান্ত অভিযোগ তদন্ত করছে।
তবে জয় সব ধরনের অনিয়মের অভিযোগ অস্বীকার করে সেগুলোকে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে দাবি করেছেন।




