বছর কয়েক আগে একবার কক্সবাজার বেড়াতে গিয়েছিলাম। কক্সবাজারে ঢোকার মুখেই একটা গোলচক্কর ছিল- আমাদের গাড়িটা সেই গোলচক্কর ঘুরতেই হঠাৎ করে একটা শব্দ হয়ে স্টার্ট বন্ধ হয়ে গেল। ড্রাইভার অনেক চেষ্টা করল কিন্তু স্টার্ট হয় হয় করে আর হলো না।
ড্রাইভার খুব বিনয়ের সঙ্গে বলল, স্যার একটু নামতে হবে চাকাগুলোও দেখব- কেন স্টার্ট বন্ধ হলো সেটাও দেখতে হবে। কী বলো, এই রোদের ভিতরে? বাইরে তো রোদ।
স্যার পাশের গাছের ছায়ায় একটু দাঁড়ালেই হবে।
কী আর করা বাধ্য হয়ে আমরা গাছের নিচে দাঁড়ালাম। এখানে বেশ কয়েকটি গাছ। দেখলাম প্রচণ্ড রোদের তাপে অনেকেই এসে এই গাছের নিচে বিশ্রাম নিচ্ছে। একজন চানাচুর বিক্রেতাকে দেখলাম রঙিন কাপড় পরা। ঢাকাতে যেমনি দেখি। লাল গামছা জড়ানো মাথায় পাগড়ি, অদ্ভুত পোশাকে সজ্জিত। কক্সবাজারেও ঢাকার মতো চানাচুরওয়ালা পাওয়া যায়! আমি বেশ অবাক হলাম। এর মধ্যে একজন পাখিওয়ালা এলো। কাঁধের দুই পাশে দুটো খাঁচায় বেশ কিছু পাখি। একটি পাখি ডাকছে কক্সবাজার, কক্সবাজার। বাহ্ বেশ ভালো তো। অনেকেই উৎসাহ নিয়ে দেখছে। আমিও উৎসাহ নিয়ে কাছে গিয়ে দাঁড়ালাম। দেখলাম একটি পাখি চুপ করে বসে আছে। আমি পাখিওয়ালাকে জিজ্ঞেস করলাম, পাখিটির নাম কী?
লোকটি জবাব দিল, কাকাতুয়া। বেশ দামি পাখি।
আরও কি দামি পাখি আছে?
হ্যাঁ, আছে। ওই যে ছোট পাখি দেখছেন, এগুলো অনেক দামি। পঞ্চাশ হাজার টাকা দাম।
কী বলো? খাঁচায় তো দশটি পাখি।
জি, এখানে পাঁচ লাখ টাকার পাখি।
এর মধ্যে দেখলাম কয়েকজন বিদেশি দাঁড়িয়ে পাখি দেখছেন। খাঁচার ফাঁক দিয়ে তারা তাকিয়ে আছে। নানান রঙের পাখি।
একজন বললেন, বিদেশিরা পাখিগুলো দেখছে কেন জানেন?
কেন? আমি জানতে চাইলাম।
এদেশ থেকে অনেক কম দামে পাখি কিনে নিয়ে যেতে পারে। এই যে পাখিটার দাম পঞ্চাশ হাজার টাকা বলল। হিসাব করে দেখেন বেশি ডলার নয়। কিন্তু তাঁরা বিদেশে নিয়ে কয়েক হাজার ডলারে বিক্রি করতে পারবেন।
কী বলেন, তাহলে পাখির চোরাকারবারিও আছে?
জি, হ্যাঁ।
একপর্যায়ে আমাদের গাড়ি ঠিক হয়ে গেল। আমরা গাড়িতে চেপে বসলাম। জানালার কাছে এসে লোকটি আবার বললেন, স্যার পাখিটা নিয়ে নেন। খুব চুপচাপ বসে থাকে। শান্ত পাখি। তখন চ্যানেল আই মাত্র শুরু করেছি। সেই সময়ে মফস্বল থেকে সুমন একটি ক্যাসেট নিয়ে এলো।
বলল, আপনার ছোটকাকুর তো শুটিং শেষ হয়ে গেছে। রাজশাহীর একদল ছেলে শুটিং করে পাঠিয়েছে নাটক হিসেবে।
একটু দেখলাম। মফস্বলের ছেলেরা বিয়েবাড়িতে যে ক্যামেরা ব্যবহৃত হয় সেই ছোট্ট ক্যামেরা দিয়ে শুটিং করে আমাদের কাছে পাঠিয়ে দিয়েছে। কাজটা খুবই অ্যামেচার। তারপরও মজা করার জন্য সবাইকে দেখালাম। একদিন আফজাল হোসেন এলো তাকে বললাম, মফস্বলের সাধারণ ছেলেরা এটা বানিয়ে পাঠিয়েছে।
আফজাল হোসেন বলল, দেখ তোমরা এই ভালো জিনিসটাকে নষ্ট করো না।
আমি বললাম, নষ্ট করছি না তো, তোমাকে জানালাম বিষয়টা।
এটা তো আমরাও ভালো করে করতে পারি।
তাহলে তুমি করো।
হ্যাঁ, করব।
আফজাল হোসেনকে কিছু বই পাঠিয়ে দিলাম। সে জানাল করা যাবে। কিন্তু ছোটকাকু হবে কে? একটু ভাবনায় পড়ে গেলাম। এসব আলোচনার সময় আবদুর রহমান, আমীরুল, ব্রাউনিয়া, সাচ্চু, সুমনও ছিল। সবাই মিলে সিদ্ধান্ত নেওয়া হলো আফজালই হবে ছোটকাকু। আফজাল বলল, আমি পরিচালনা করব। অভিনয় কীভাবে হবে! তারপর সবার অনুরোধে আফজাল চরিত্রটি করতে রাজি হলো। যদিও আফজাল প্রথমেই পছন্দ করল ‘রাজশাহীর রসগোল্লা’। আমার একটু আপত্তি। আমি বললাম, এই সিরিজের প্রথম বই যেহেতু ‘কক্সবাজারের কাকাতুয়া’ তাই আমার ইচ্ছা এটাই প্রথম নাটক হতে পারে। আমি শাইখ সিরাজের সঙ্গে কথা বলে সময় ঠিক করলাম। ঈদের সময়ে প্রচারিত হতে পারে। আফজাল বলল, এটাও মন্দ না। অনেকদিন কক্সবাজার যাওয়া হয় না, শুটিংও হবে আর এ উপলক্ষে কক্সবাজার বেড়ানোও হবে। আফজাল ছোটকাকু সিরিজের কতগুলো বই নিয়ে নাট্যরূপ দেওয়ার কাজ শুরু করল। শরিফ সিঙ্গাপুরি নামে একটা চরিত্র আছে- চরিত্রটা কে করবে আফজাল সেটা ঠিক করল। শহিদুল আলম সাচ্চুর কথা মাথায় নিল আফজাল। অর্শা আর সীমান্ত নামেও দুটি চরিত্র ছিল। সব ঠিকঠাক করে একদিন সবাই মিলে উড়াল দিলাম কক্সবাজার। ঠিক করা হলো ঈদের সময়ে সন্ধ্যা ছয়টা দশ মিনিটে প্রচার হবে। আফজাল একটু মন খারাপ করল বটে… কিন্তু তাঁকে বললাম, দেখো ইন্ডিয়ান সিরিয়ালগুলো দুপুর ১২টা থেকে শুরু হয়- মানুষ তো দেখছে। তুমি যদি ভালো কিছু দাও তাহলে সময় কোনো ব্যাপার না।
কক্সবাজারে শুটিংয়ে গিয়ে বিস্মিত হলাম। আফজাল দিনাজপুর থেকে কাজের লোকের অভিনয়ের জন্য মঞ্চের লোক নিয়ে এসেছে। কাকাতুয়া আনা হলো। বিশাল আয়োজন। আফজাল তাঁর ভালো হোটেল ছেড়ে শুটিংয়ের কাছাকাছি সাধারণ মানের হোটেলেই থাকতে শুরু করল। কী করা যায় প্ল্যান করছে। আমরা সবাই একটি ছবি তুললাম। সাধারণত সবাই বসে ছবি তুলি কিন্তু আফজাল সবাইকে সারিবদ্ধভাবে দাঁড় করিয়ে ছবিটি তুলল। অসাধারণ সেই ছবি এখনো আছে। আফজাল যে কত বড় শিল্পী, তাঁর কম্পোজিশন যে কত সুন্দর, সেটা যে কেউ দেখলেই বুঝতে পারবে। শুটিংপর্ব শেষ হওয়ার পর নাটকের টাইটেল সংগীতের প্রসঙ্গটি সামনে এলো। আফজাল ঠিক করল এসআই টুটুলকে দিয়ে গানটি গাওয়াবে। টুটুলও গানটি দরদ দিয়ে গাইলেন।
আজকে যেখানে ইমপ্রেসের অফিস সেখানে একটি স্টোরের মতো ছিল- সেখানেই আফজাল শুটিং করল গানটির। অসাধারণ হয়েছিল সেই পিকচারাইজেশন। এই গানটিও আফজালের লেখা। সেই যে শুরু সেখান থেকে এখন ১৬০ পর্ব করেছে। একই নামের একটি সিরিজের এতটি পর্ব আসলেই বিশাল ব্যাপার। ইউনিলিভার এই প্রোডাক্টটিতে স্পনসর করেছে। তারাও চেয়েছে বাচ্চাদের একটি ভালো প্রোডাকশন হোক। আজ থেকে বিশ বছর আগেও আফজাল যে পরিশ্রম করেছে, এখনো সেরকমই পরিশ্রম করে যাচ্ছে। একই সমান মেধামনন দিয়ে সে ছোটকাকু নির্মাণ করে চলেছে। বাংলাদেশে এই মুহূর্তে ছোটকাকু এত জনপ্রিয় যে তার এখন আরেকটি পরিচয় হয়েছে ছোটকাকু হিসেবে।
এটা ছোটকাকুর জীবনে বড় প্রাপ্তি। একটি চরিত্র কতটা শক্তিশালী হলে এরকমটা হতে পারে। আফজাল যখন একুশে পদক পেল তখন সবাই বললেন, ছোটকাকু পদক পেয়েছে। একবার এক রেস্টুরেন্টে খেয়ে টেবিলে আফজাল চশমাটা ভুলে রেখে যাচ্ছিল তখন হোটেলের বেয়ারা তাঁকে ডেকে বলছেন, এই যে ছোটকাকু আপনার চশমাটা ফেলে গেছেন। একজন বেয়ারা থেকে শুরু করে অফিসের কর্মকর্তা, রাজনীতিবিদ যখন ছোটকাকুকে চেনেন তখন তার স্রষ্টা হিসেবে আমিও গর্ব অনুভব করি। কিন্তু ছোটকাকুর এত আনন্দের মধ্যেও একটা অনেক বড় টেনশন রয়ে যায়। যখন টেলিভিশনে ছোটকাকুর অনএয়ারের সময় ঘনিয়ে আসে তার ঠিক দশ-পনেরো মিনিট আগে আফজালের ফোন আসে আরেকটু পরে কি শুরু করা যায়? একটু কারেকশন আছে। অর্থাৎ এত বছর পরেও আফজাল হোসেন ছোটকাকু নিয়ে কতটা সিরিয়াস। তাঁর একটাই ভাবনা ছোটকাকুকে কীভাবে হৃদয়গ্রাহী করা যায়। ছোটকাকু নীতিমান, আদর্শবান একজন মানুষ। আফজাল হোসেনও তেমনি একজন মানুষ। আফজাল হোসেন আমাদের কাছে ছোটকাকু হয়ে থাকবেন- সেই প্রত্যাশা করতেই পারি। আফজালের আজ জন্মদিন। তাঁকে অফুরন্ত শুভেচ্ছা।


