ফুটবলের এক মহাকাব্য— মেসি (পর্ব ১)

(লিওনেল মেসি বিশ্বের কোটি অনুরাগীর হৃদয় ভেঙে আন্তর্জাতিক অঙ্গন থেকে অবসরের ঘোষণা দিয়েছেন। দীর্ঘ সময়ের অপার এক বিস্ময় তিনি। মাঠে শুধু সাফল্য-শিহরণ নয়, অপ্রাপ্তিও আছে তার। মেসিকে নিয়ে চ্যানেল আই অনলাইনে ৬ পর্বের বিশেষ লেখায় সেসব গল্পই তুলে আনছেন ফুটবল লেখক-বিশ্লেষক জাহিদ রহমান। আজ থাকছে প্রথম পর্ব)
আর্জেন্টিনার ছোট্ট শহর রোজারিও। রাজধানী বুয়েন্স আয়ার্স থেকে প্রায় ৩০০ কিলোমিটার দূরে মধ্য আর্জেন্টিনার এক শহর। এই শহরেই দুই কিংবদন্তির জন্ম। একজন বিপ্লবের প্রতীক চে গুয়েভারা, অন্যজন ফুটবলের মহাকাব্য লিওনেল মেসি। স্বভাবতই রোজারিও এখন শুধু একটি শহরের নাম নয়, আর্জেন্টিনার ইতিহাস ও আবেগের পাতায় এটি এক অনন্য অধ্যায়। যেহেতু এই শহরের মাটিতেই জন্ম দুই ভিন্ন জগতের দুই কিংবদন্তির।
‘চে গুয়েভারা থেকে মেসি: রোজারিওর দুই কিংবদন্তি’ শিরোনাম দেখে অনেকেই হয়তো খানিকটা আঁতকে উঠেছেন এই ভেবে ফুটবল কিংবদন্তি লিওনেল মেসির সাথে আজন্ম বিপ্লবী আর্নেস্তো চে গুয়েভারার কী সম্পর্ক।
সেইতো কবে ১৯৬৭ সালে চে গুয়েভারা মারা গেছেন। তখন তো মেসির জন্মও হয়নি। কিন্তু না, চে গুয়েভারার সাথে লিওনেল মেসির বহুবিধ সম্পর্ক আছে। যে কথা শুরুতেই বলেছি, আর্জেন্টিনার যে শহরে জন্মেছিলেন বিপ্লবী চে গুয়েভারা, ঠিক সেই শহর রোজারিওতে জন্ম লিওনেল মেসির। চে গুয়েভারা জন্মগ্রহণ করেছিলেন ১৯২৮ সালের ১৪ জুন। আর ১৯৬৭ সালের ৯ অক্টোবর মাত্র ৩৯ বছর বয়সে বিপ্লবী চে গুয়েভারাকে জীবন দিতে হয়েছিল বলিভিয়ার সেনাবাহিনীর হাতে। চে গুয়েভারা এখনও বিশ্বময় প্রাসঙ্গিক। চে গুয়েভারার জন্মভিটা আর্জেন্টিনার যে রোজারিও শহর, সেখানেই লিওনেল মেসির জন্ম ১৯৮৭ সালের ২৪ জুন, চে’র চিরবিদায়ের বিশ বছর পর। দুজনেরই জন্ম আবার জুন মাসে। কী অপূর্ব এক মিল! এখানেই শেষ নয়। চে পৃথিবী থেকে বিদায় নেন ৩৯ বছর বয়সে। আর ৩৯ বছর বয়সে আন্তর্জাতিক ফুটবল থেকে বিদায় নেওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন ফুটবলের মহাকাব্য মেসি।
চে ছিলেন বিপ্লবের মানুষ। তার হাতে ছিল অস্ত্র, মনে ছিল পরিবর্তনের স্বপ্ন। তিনি হয়ে উঠেছিলেন লাতিন আমেরিকার বিপ্লবী চেতনার এক বিশ্বজনীন প্রতীক। যে ঢেউ আজও বহমান বিশ্বব্যাপী। আমাদের এই উপমহাদেশেও সেই উত্তাপ কম না। আর তাইতো আজো কবি সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের সেই বিখ্যাত কবিতার লাইন ‘চে তোমার মৃত্যু আমাকে অপরাধী করে দেয়’ এখনও তরুণদের হৃদয়ে ঝড় তোলে।
আর লিওনেল মেসি আরেক আবেগের নাম। ফুটবলের শৈল্পিক মর্যাদাকে আরও উঁচুতে নিতে যিনি ছিলেন নিবেদিত। জীবনের সবটুকু যিনি নিংড়ে দিয়েছেন। লিওনের মেসির হাতে ছিল ফুটবল। তার অস্ত্র ছিল একটি বল, তিনি বিপ্লব ঘটিয়েছেন সবুজ মাঠে। ড্রিবলিং, পাস, গোল আর অসাধারণ সৃজনশীলতায় যিনি ফুটবলে এক নতুন ভাষা উপস্থাপন করে কিংবদন্তি।
চে ও মেসির পথ এক নয়, তাদের জীবন দর্শনও এক নয়। একজন সমাজ ও রাজনীতির পরিবর্তনের জন্য লড়েছেন, অন্যজন ফুটবল মঞ্চে নিজের প্রতিভা দিয়ে কোটি কোটি মানুষের হৃদয় জয় করেছেন। কিন্তু তাদের মধ্যে একটি অদ্ভুত মিল- দুজন একই শহরের মানুষ। রোজারিও শহরের মানুষ এ দুজনকেই হৃদয়ে ঠাঁই দিয়েছেন। এই শহরের বিভিন্ন স্থানে দুজনের প্রতিকৃতিতে ঠাসা। যেখানে যাবেন সেখানেই দেখা যায় তাদের দুজনের প্রতিকৃতি। শ্রদ্ধা আর ভালোবাসার এ নিদর্শন।
লিওনেল মেসির শিক্ষা জীবন শুরু হয়েছিল জন্মশহর রোজারিও থেকেই। বাবা-মায়ের হাত ধরে ভর্তি হয়েছিলেন এ্যাকুয়েলা এন ৬৬ জেনারলে লাস হারেস স্কুলে। স্পেনে যাওয়ার আগ পর্যন্ত এখানেই লেখাপড়া করেন। এরপর স্পেনে গিয়ে লিও নতুন স্কুলে ভর্তি হন। ছোটবেলায় বড় দুই ভাই রড্রিগো মেসি এবং মাডিয়াস মেসির সাথে ফুটবল মাঠে যেতেন। তার একমাত্র বোনের নাম মানাসল মেসি।
ছোটবেলা থেকেই ফুটবলের প্রতি মেসির ছিল অদম্য আকর্ষণ। দুই বড় ভাই যখন বন্ধুদের সঙ্গে ফুটবল খেলতেন, ছোট্ট মেসিও তাদের সঙ্গে মাঠে ছুটে যেতেন। বয়সে ছোট হলেও বড় ছেলেদের সঙ্গে খেলতে তিনি কখনও ভয় পেতেন না। তার প্রথম ফুটবল ক্লাব ছিল গ্রান্দোলি। তখন বয়স সবে ৬। গ্রান্দোলিতে এখন মেসির ম্যুরাল সবার চোখে পড়ে। এরপর মাত্র ৮ বছর বয়সে মেসি রোজারিওর বিখ্যাত ক্লাব নিওয়েলস ওল্ড বয়েজের যুব দলে যোগ দেন। কিন্তু তখনই তার শারীরিক বৃদ্ধির সমস্যা ধরা পড়ে। চিকিৎসকরা জানান, মেসির শরীরে গ্রোথ হরমোনের ঘাটতি রয়েছে। স্বাভাবিক বৃদ্ধির জন্য তাকে নিয়মিত গ্রোথ হরমোনের ইনজেকশন দিতে হতো। ফলে চিকিৎসার খরচ ছিল পরিবারের জন্য বাড়তি এক বোঝা। মেসির বাবা হোর্হে মেসি ও মা সেসিলিয়া কুচিত্তিনি ছেলের চিকিৎসা চালাতে অঙ্গীকারবদ্ধ থাকেন। কিন্ত প্রতিমাসে কয়েকশত ডলার খরচ করাটা তাদের জন্য দুঃসহ হয়ে ওঠে।
কিন্ত মাত্র ১৩ বছর বয়সে মেসি স্পেনের অন্যতম সেরা ক্লাব এফসি বার্সেলোনার যুব একাডেমি লা মাসিয়ায় প্রশিক্ষণের সুযোগ পান। আবার বার্সেলোনা তার চিকিৎসার খরচ বহন করতেও সম্মত হয়। ফলে মেসির পরিবার আর্জেন্টিনা ছেড়ে আটলান্টিক মহাসাগর পাড়ি দিয়ে চলে যায় স্পেনে। নতুন দেশ, নতুন পরিবেশ, সবকিছুই মেসির জন্য সহজ ছিল না। সেসময় মেসি নিজ শহরের জন্য মন খারাপ করতেন। বাড়ি ফেরার জন্য উদগ্রীব থাকতেন। কিন্তু ধীরে ধীরে তার অসীম প্রতিভার দ্বার যেন উন্মুক্ত হতে থাকে। অসাধারণ ফুটবল প্রতিভার গুণে তিনি সবার নজরে আসেন। শারীরিক কিছু সমস্যা থাকলেও বল নিয়ন্ত্রণ, অসাধারণ গতি আর অদম্য ড্রিবলিং দেখিয়ে তাক লাগিয়ে দেন। মাত্র ১৬ বছর বয়সে মেসির বার্সেলোনার মূল দলের হয়ে অভিষেক ঘটে।
আর ২০০৫ সালের ১ মে বৃহস্পতিবার, ১৭ বছর বয়সে ক্লাবের হয়ে গোল করে তিনি বার্সেলোনার ইতিহাসে গোল করা সর্বকনিষ্ঠ খেলোয়াড়দের একজন হিসেবে অনবদ্য এক রেকর্ড গড়েন। মেসির তখন ছিল লম্বা চুল। এদিন লা লিগায় প্রথম অফিসিয়াল গোলটি করে রেকর্ড গড়েছিলেন। প্রতিপক্ষ ছিল আলবেসেতে। মেসির গায়ে ৩০ নাম্বার জার্সি। আর গোলটি করতে তিনি সহযোগিতা বা যার এসিস্টে পেয়েছিলেন, তিনি ছিলেন ব্রাজিলের রোনালদিনহো। সেদিন ম্যাচের ৮৮ মিনিটের সময় বার্সালোনার পক্ষে নেমেছিলেন স্যামুয়েল ইতোর বিকল্প হিসেবে।
ঐ বছরই নেদারল্যান্ডসে পনেরোতম বিশ্ব যুব ফুটবলের আসর বসে। ফাইনালে নাইজেরিয়াকে ২-১এ পরাজিত করে আর্জেন্টিনা পঞ্চমবারের মতো চ্যাম্পিয়ন হয়। যুব বিশ্বকাপে নিজ দেশ আর্জেন্টিনার পক্ষে দারুণ পারফর্ম করেন লিওনেল মেসি। ৬ গোল করে সেরা গোলদাতা হন। টুর্নামেন্টের সেরা খেলোয়াড়ও নির্বাচিত হন তিনি। এই টুর্নামেন্টে মেসির সহযোগীদের মধ্যে ছিলেন লুকাস বিগলিয়া, গ্যাব্রিয়েল পালেতা, ফারনান্দো গাগো, সার্জিও আগুয়েরো, পাবলো জাবালেতা। এরপর ২০০৫ সালের ১৭ আগস্ট জাতীয় দলের হয়ে অভিষেক ঘটে লিওনেল মেসির। হাঙ্গেরির বুদাপেস্টে অনুষ্ঠিত প্রীতি ম্যাচে কোচ হোসে পেকারম্যান ৬৩ মিনিটের সময় তাকে বদলি হিসেবে মাঠে নামান। কিন্তু বিধি বাম। মাত্র ৪৭ সেকেন্ড কেবল মাঠে থাকতে পারেন তিনি। হাঙ্গেরির ডিফেন্ডার ভিলমোস ভেনজাককে কনুই দিয়ে আঘাত দেয়ার কারণে সরাসরি লাল কার্ড পান। এক বুক বেদনা নিয়ে মাঠের বাইরে চলে আসতে হয় মেসিকে।
বিশ্বকাপে এরকম একটি কালো ছায়া তাকে তাড়া করলেও সবকিছু ছাপিয়ে তিনি হয়ে ওঠেন অনবদ্য। আর্জেন্টিনার আশা নিরাশার প্রতীক হয়ে ওঠেন। বার্সাতে দুর্দান্ত পারফর্ম করে তাক লাগিয়ে দেন। আর স্বদেশ আর্জেন্টিনার দুঃখ বেদনার সাথে ধীরে ধীরে মিলেমিশে একাকার হয়ে পড়েন। দেশের জন্য নিজেকে নিবেদন করেন পুরোপুরি। কিন্তু কখনও কখনও ভীষণভাবে মর্মাহত হয়ে ফুটবল আর খেলবেন না বলে জানিয়ে দেন। কিন্তু এরপর রোজারিওর সেই ছোট্ট ছেলেটিই ধীরে ধীরে হয়ে ওঠেন বিশ্বের অন্যতম সেরা ফুটবলার। সেতো এক দীর্ঘ গল্প! যে গল্পের কোন শেষ নেই।
প্রতিবেদক
জাহিদ রহমান
বাংলাদেশ ও বিশ্বের গুরুত্বপূর্ণ খবর, মানুষের গল্প এবং যাচাইকৃত তথ্য পাঠকের কাছে পৌঁছে দেয় চ্যানেল আই অনলাইন।
আরও পড়ুন
পরবর্তী সংবাদ প্রস্তুত হচ্ছে…