চীনের ‘চীনামাটির রাজধানী’ হিসেবে পরিচিত চিংতেচেনের ঐতিহ্যবাহী চীনামাটির শিল্পস্থল ইউনেস্কোর বিশ্ব ঐতিহ্যের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। এই স্বীকৃতির মাধ্যমে চীনের বিশ্ব ঐতিহ্য স্থানের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৬১টিতে।
শনিবার (২৫ জুলাই) দক্ষিণ কোরিয়ার বুসানে অনুষ্ঠিত ইউনেস্কোর বিশ্ব ঐতিহ্য কমিটির ৪৮তম অধিবেশনে এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
এটি চীনের প্রথম শিল্প ঐতিহ্যবাহী স্থান, যা ইউনেস্কোর বিশ্ব ঐতিহ্যের মর্যাদা পেল। পাশাপাশি চীনামাটির শিল্পকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা বিশ্বের প্রথম বিশ্ব ঐতিহ্য স্থান হিসেবেও স্বীকৃতি অর্জন করেছে চিংতেচেন। চীনের পূর্বাঞ্চলীয় চিয়াংসি প্রদেশের চিংতেচেন ১০ম থেকে ১৯শ শতাব্দী পর্যন্ত বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ চীনামাটি উৎপাদনকেন্দ্র ছিল। এখানকার উন্নতমানের পোর্সেলিন, বিশেষ করে নীল-সাদা নকশার চীনামাটির পাত্র, বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ব্যাপক জনপ্রিয়তা লাভ করে।
ইউনেস্কোর বিশ্ব ঐতিহ্য কমিটির মতে, চিংতেচেনের ঐতিহাসিক নিদর্শনগুলো চীনের চীনামাটি তৈরির প্রযুক্তি, শিল্পকলা ও উৎপাদন ব্যবস্থার ধারাবাহিক বিকাশের সাক্ষ্য বহন করে। একই সঙ্গে এগুলো বিশ্বের সিরামিক শিল্পের বিকাশ এবং বিভিন্ন সভ্যতার মধ্যে সাংস্কৃতিক বিনিময়ে চীনা চীনামাটির প্রভাব তুলে ধরে। চিংতেচেনের বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে এর ভৌগোলিক অবস্থান। পাহাড়ি অঞ্চলে অবস্থিত এ শহরে প্রচুর পরিমাণে কাওলিন নামের বিশেষ ধরনের মাটি পাওয়া যায়। পাশাপাশি ছাং নদীর মাধ্যমে কাঁচামাল পরিবহন ও প্রস্তুত পণ্য বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে পাঠানো সহজ ছিল।

প্রায় ৭০০ বছর আগে এখানকার কারিগরেরা কাওলিনের সঙ্গে অন্যান্য উপাদান নির্দিষ্ট অনুপাতে মিশিয়ে এমন এক ধরনের মাটি তৈরি করেন, যা ১ হাজার ৩০০ ডিগ্রি সেলসিয়াসেরও বেশি তাপমাত্রায় আকৃতি অক্ষুণ্ন রাখতে সক্ষম ছিল। চিংতেচেনের চীনামাটির পণ্য শুধু ব্যবহার্য সামগ্রী ছিল না, বরং এটি আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও সাংস্কৃতিক বিনিময়েরও গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম হয়ে ওঠে। ইতিহাসবিদদের মতে, ১৬শ শতাব্দীর পরবর্তী তিন শতকে এখান থেকে কয়েক কোটি চীনামাটির পণ্য ইউরোপে রপ্তানি হয়, যা ইউরোপের শিল্প, স্থাপত্য, আসবাবপত্র ও অলংকারশিল্পেও গভীর প্রভাব ফেলে।
বর্তমানেও চিংতেচেন সিরামিক শিল্পের একটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র। শহরটিতে বর্তমানে ৩ হাজার ২০০-এর বেশি অমূর্ত সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের উত্তরাধিকারী কারিগর কাজ করছেন। এছাড়া এটি ইউনেস্কোর ‘সৃজনশীল নগর নেটওয়ার্ক’-এ ‘কারুশিল্প ও লোকশিল্পের শহর’ হিসেবে স্বীকৃত। আন্তর্জাতিক সিরামিক বিশেষজ্ঞদের মতে, চিংতেচেন প্রমাণ করেছে যে ঐতিহ্য শুধু সংরক্ষণের বিষয় নয়; এটি নগর উন্নয়ন, শিক্ষা, পর্যটন, উদ্ভাবন এবং আন্তর্জাতিক সাংস্কৃতিক বিনিময়েরও শক্তিশালী মাধ্যম।
চিংতেচেনের দলীয় প্রধান ছেন কেলং বলেন, বিশ্ব ঐতিহ্যের এই স্বীকৃতি শহরের জন্য নতুন যাত্রার সূচনা। চীনামাটির সংস্কৃতি সংরক্ষণ, শিল্পে উদ্ভাবন এবং আন্তর্জাতিক সাংস্কৃতিক বিনিময় আরও এগিয়ে নিতে এ স্বীকৃতি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।



