ঘুষের বিনিময়ে করহার কমিয়ে দেওয়া, করদাতাদের কর ফাঁকি দেওয়ার সুযোগ দেওয়া ও অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগ, নানাবিধ দুর্নীতি অভিযোগে দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) জালে আটকা পড়েছেন জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) শতাধিক কর্মকর্তা-কর্মচারী। এর মধ্যে গত বছর অন্তত ১৬ জনের বিরুদ্ধে অনুসন্ধান শুরু করা হয়। সেসব অনুসন্ধান কাজ এখন শেষ পর্যায়ে রয়েছে। প্রতিবেদন দাখিল হলে সুপারিশের ভিত্তিতে শিগগিরই আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হতে পারে।
২০২১ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত এনবিআরের ৯৫ জনের বিরুদ্ধে মামলা করেছে দুদক। তাদের অনেকের বিরুদ্ধে আদালতে চার্জশিট দাখিল করা হয়েছে। সেসব মামলা সংশ্লিষ্ট আদালতে বিচারাধীন বলে জানা গেছে।
গত বছর এনবিআরের কর্মকর্তারা তাদের বিভিন্ন দাবি-দাওয়া নিয়ে আন্দোলনে নামলে ওই সময়ে তাদের অনেকের বিরুদ্ধে দুর্নীতির নানা অভিযোগ দুদকে দাখিল হয়। এরই প্রেক্ষাপটে গত বছরের জানুয়ারি থেকে জুলাই পর্যন্ত ২০ জনের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেয় দুদক। এর মধ্যে চারজনের বিরুদ্ধে মামলা করা হয়।
সেসব মামলায় আসামি হয়েছেন এনবিআরের সদস্য (বরখাস্ত) মতিউর রহমান, সাবেক কমিশনার নুরুল ইসলাম, অতিরিক্ত কমিশনার কাজী আবু মাহমুদ ফয়সাল ও সাবেক সুপারিনটেনডেন্ট রফিকুল ইসলাম। এর মধ্যে মতিউর রহমানসহ কয়েকজনের বিরুদ্ধে আদালতে চার্জশিটও দেওয়া হয়েছে। একই বছরে এনবিআরের আরও অন্তত ১৬ কর্মকর্তার দুর্নীতির অনুসন্ধান শুরু করা হয়।
অনুসন্ধানের আওতায় থাকা কর্মকর্তারা হলেন জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) সদস্য লুৎফুল আজীম, সদস্য (আয়কর নীতি) এ কে এম বদিউল আলম, বেনাপোল কাস্টম হাউসের কমিশনার মো. কামরুজ্জামান, ঢাকা পূর্ব কাস্টমস এক্সাইজ অ্যান্ড ভ্যাট কমিশনারেটের কমিশনার কাজী মোহাম্মদ জিয়াউদ্দিন, আয়কর বিভাগের অতিরিক্ত কর কমিশনার সেহেলা সিদ্দিকা, ভ্যাটের বৃহৎ করদাতা ইউনিটের (এলটিইউ) অতিরিক্ত কমিশনার আবদুর রশীদ মিয়া, অতিরিক্ত কর কমিশনার (ঢাকা কর অঞ্চল-৮) মির্জা আশিক রানা, কর গোয়েন্দা সেলের (সিআইসি) সাবেক অতিরিক্ত মহাপরিচালক মোহাম্মদ আলমগীর হোসেন, যুগ্ম কমিশনার তারেক হাসান, যুগ্ম কর কমিশনার (বিসিএস কর একাডেমি) মোহাম্মদ মোরশেদ উদ্দীন খান, উপ-কর কমিশনার (ঢাকা কর অঞ্চল-১৬) মোনালিসা শাহরীন সুস্মিতা, অতিরিক্ত কমিশনার (নিরীক্ষা, গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তর, মূল্য সংযোজন কর) হাছান মুহম্মদ তারেক রিকাবদার, অতিরিক্ত কমিশনার (কাস্টমস, এক্সাইজ ও ভ্যাট কমিশনারেট–ঢাকা দক্ষিণ) সাধন কুমার কুণ্ডু, কর অঞ্চল-১৬-এর উপ-কর কমিশনার মোহাম্মদ শিহাবুল ইসলাম, উপ-কর কমিশনার মো. মামুন মিয়া ও কর পরিদর্শক লোকমান আহমেদ। তাদের বিরুদ্ধে অনুসন্ধানকাজ এখন শেষ পর্যায়ে রয়েছে।
অবৈধ সম্পদ অর্জনসহ বিভিন্ন ধরনের দুর্নীতির অভিযোগে গত সাড়ে চার বছরে দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) জালে আটকা পড়েছেন জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) বিভিন্ন পর্যায়ের অন্তত ৯৫ কর্মকর্তা-কর্মচারী। ২০২১ থেকে ২০২৪ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত তাদের অনেকেরই বিরুদ্ধে আদালতে চার্জশিট দেওয়া হয়েছে। সেসবের বিচার চলছে। তবে অনেকের বিরুদ্ধে করা মামলার তদন্ত চলছে ধীরগতিতে।
দুর্নীতির ঘটনায় এনবিআর কর্মকর্তাদের মধ্যে সবচেয়ে আলোচিত-সমালোচিত ছিলেন ছাগলকাণ্ডে এনবিআরের সদস্য (বরখাস্ত) মতিউর রহমান। গত বছরের জানুয়ারিতে দুদকের মামলায় মতিউর ও তার স্ত্রীকে আসামি করা হয়েছে। এ ছাড়া এনবিআরের অতিরিক্ত কমিশনার কাজী আবু মাহমুদ ফয়সাল, রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) সাবেক সহকারী পরিচালক বদরুন নাহার এবং কাস্টমস বিভাগের সাবেক সহকারী কমিশনার মোখলেছুর রহমানের দুর্নীতির কাণ্ড সারা দেশে ব্যাপক সমালোচনার ঝড় তোলে।
২০২১-এর জানুয়ারি থেকে ২০২৪ সালের ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত দুদকের মামলায় অভিযুক্ত এনবিআরের ৯৫ জন সাবেক ও বর্তমান কর্মকর্তা-কর্মচারীর তালিকায় আছেন ঢাকা কাস্টমস ভ্যালুয়েশন অ্যান্ড ইন্টারনাল কমিশনারেটের সাবেক কমিশনার মামুনুর রহমান, সাবেক সহকারী কমিশনার মনিরুল হক সরকার ও মোখলেছুর রহমান খান (সাহান), কাস্টমস এক্সাইজ ও ভ্যাটের কাপ্তাই সার্কেলের সাবেক কাস্টমস পরিদর্শক নিজাম উদ্দিন।
রাজস্ব কর্মকর্তাদের মধ্যে রয়েছেন মোহাম্মদ এনামুল হক, মিজানুর রহমান, গোলাম কিবরিয়া হাজারী, হারুন-অর-রশিদ, আব্দুস সামাদ, জয়নাল আবেদীন, সাইফুন্নাহার জনি, হাবিবুল ইসলাম ও সুলতান আহম্মদ। মামলা ও চার্জশিটে তাদের বিরুদ্ধে অর্থ আত্মসাৎ, ক্ষমতার অপব্যবহার, ঘুষ গ্রহণ ও অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগ আনা হয়েছে।
দুদক সূত্র জানায়, কর ও শুল্ক আদায়ের ক্ষেত্রে মোটা অঙ্কের ঘুষের বিনিময়ে করদাতাদের কর ফাঁকি দেওয়ার সুযোগ করে দেওয়া এবং বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের মালিক ও এনবিআরের কর্মকর্তারা নিজেরা লাভবান হওয়ার জন্য সরকারের নির্ধারিত পরিমাণ কর কমিয়ে দিচ্ছেন মর্মে দুদকে অভিযোগ এসেছে। অসাধু কর্মকর্তাদের এ ধরনের অপকর্মের কারণে সরকার প্রতিবছর বিপুল পরিমাণ রাজস্ব প্রাপ্তি থেকে বঞ্চিত হচ্ছে।
শুধু তা-ই নয়, কিছু ক্ষেত্রে কর্মকর্তারা ঘুষ না পেয়ে কর ফাঁকি দেওয়ার মিথ্যা মামলা করে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের মালিককে হয়রানি করে থাকেন। এমন নানাবিধ অভিযোগের ভিত্তিতে অভিযোগসংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে অনুসন্ধান শুরু হয়েছে।
এসব কর্মকর্তার বিরুদ্ধে কয়েক বছর ধরে বিভিন্ন স্টেশনে চাকরিকালীন বিভিন্ন ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানকে শুল্ক, ভ্যাট ও ক্ষেত্রবিশেষে আয়কর ফাঁকির সুযোগ করে দিয়ে ও নিজে লাভবান হয়ে রাষ্ট্রকে ক্ষতিগ্রস্ত করার মাধ্যমে দুর্নীতি, স্বজনপ্রীতি ও অনিয়মের মাধ্যমে অবৈধ সম্পদ অর্জনেরও অভিযোগ রয়েছে।
এ ব্যাপারে দুদকের উপপরিচালক (জনসংযোগ) আকতারুল ইসলাম খবরের কাগজকে বলেন, ‘কর ও শুল্ক আদায়ের ক্ষেত্রে মোটা অঙ্কের ঘুষের বিনিময়ে করদাতাদের কর ফাঁকি দেওয়ার সুযোগ করে দেওয়া এবং বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের মালিক ও এনবিআরের কর্মকর্তারা নিজেরা লাভবান হওয়ার জন্য সরকারের নির্ধারিত পরিমাণ কর কমিয়ে দিচ্ছেন মর্মে দুদকে অভিযোগ এসেছিল। সেসব অভিযোগ যাচাই-বছাই করে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। যেসব অভিযোগ এখনো অনুসন্ধানাধীন, সেগুলোর অনুসন্ধান প্রতিবেদন দাখিলের পর কমিশনের সিদ্ধান্ত গ্রহণের মাধ্যমে ফলাফল জানা যাবে।

