কক্সবাজারের মহেশখালীতে ভাসমান তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) টার্মিনালে কারিগরি ত্রুটির কারণে জাতীয় গ্রিডে গ্যাস সরবরাহ কমে যাওয়ায় রাজধানীজুড়ে তীব্র গ্যাস সংকট দেখা দিয়েছে।
এর সবচেয়ে বড় প্রভাব পড়েছে সিএনজি ফিলিং স্টেশনগুলোতে। ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়েও গ্যাস পাচ্ছেন না চালকেরা। একই সঙ্গে আবাসিক গ্রাহকদের রান্নাবান্না ব্যাহত হচ্ছে, শিল্পকারখানা ও বিদ্যুৎকেন্দ্রে তৈরি হয়েছে জ্বালানি সংকট।
জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, টার্মিনালের ত্রুটির কারণে জাতীয় গ্রিডে প্রতিদিন প্রায় ৪৫০ মিলিয়ন ঘনফুট (৪৫ কোটি ঘনফুট) গ্যাস কম সরবরাহ হচ্ছে। ফলে রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় গ্যাসের চাপ উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে।
সিএনজি স্টেশনে দিন-রাত দীর্ঘ লাইন
রাজধানীর বিভিন্ন সিএনজি ফিলিং স্টেশন ঘুরে দেখা গেছে, গ্যাস সংগ্রহের জন্য দিন-রাত দীর্ঘ সারিতে অপেক্ষা করছেন চালকেরা। অনেক স্টেশনে রাত থেকেই গাড়ির লাইন শুরু হচ্ছে। সকাল ৬টা থেকে দুপুর পর্যন্ত অপেক্ষা করেও অনেক চালক গ্যাস পাচ্ছেন না। ফলে দিনের বড় একটি সময় পাম্পেই কাটছে, যা তাদের স্বাভাবিক আয়-রোজগারে বড় ধরনের প্রভাব ফেলছে।
সবচেয়ে বেশি বিপাকে পড়েছেন সিএনজিচালিত অটোরিকশা ও রাইড-শেয়ারিং সেবার সঙ্গে যুক্ত চালকেরা। সময়মতো গ্যাস না পাওয়ায় তারা যাত্রী পরিবহন করতে পারছেন না। এতে দৈনিক আয় উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে।
মোহাম্মদপুরের সিএনজিচালিত অটোরিকশাচালক মো. সেলিম বলেন, “গ্যাস না পাওয়ায় এক স্টেশন থেকে আরেক স্টেশনে ঘুরতে হচ্ছে। কোথাও গ্যাস নেই, কোথাও বিশাল লাইন। ভোর ৪টা থেকে ঘুরছি। দুপুর ১২টায় মাত্র ২০০ টাকার সিএনজি পেয়েছি। এতে সংসার কীভাবে চলবে বুঝতে পারছি না।”
ফার্মগেট এলাকার এক চালক জানান, “সারাদিন বিভিন্ন স্টেশনে ঘুরেও গ্যাস নিতে পারিনি। গতকাল মাত্র ২৫০ টাকা আয় হয়েছে। দিনের অর্ধেক সময় যদি লাইনে কাটে, তাহলে পরিবার চালানো কঠিন হয়ে পড়ে।”
অনেক চালকের অভিযোগ, কৃত্রিম সংকট তৈরি করে ভবিষ্যতে গ্যাসের দাম বাড়ানোর পরিবেশ সৃষ্টি করা হচ্ছে। অতীতে জ্বালানি তেলের ক্ষেত্রেও একই ধরনের পরিস্থিতি তৈরি হয়েছিল বলে তাদের দাবি।
অস্বাভাবিকভাবে চাপ কমে গেছে
সিএনজি ফিলিং স্টেশন অ্যান্ড কনভারশন ওয়ার্কশপ ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের নির্বাহী সদস্য মো. ওয়াহিদ খান বলেন, সাধারণত স্টেশন পরিচালনায় ১৫ পিএসআই গ্যাসচাপ প্রয়োজন হলেও বর্তমানে অনেক এলাকায় তা ৪ থেকে ৫ পিএসআই, কোথাও আবার ২ পিএসআইয়েরও নিচে নেমে এসেছে।
সিএনজি ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক ফারহান নূর বলেন, অনেক এলাকায় চাপ ১ থেকে ২ পিএসআই হওয়ায় ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করেও গ্রাহকেরা পর্যাপ্ত গ্যাস পাচ্ছেন না।
ঢাকা জেলা সিএনজি চালক সমিতির সভাপতি রফিকুল ইসলাম বলেন, দীর্ঘ লাইনে দাঁড়িয়ে থাকতে হওয়ায় অধিকাংশ চালক দৈনিক আয়ের লক্ষ্যমাত্রা পূরণ করতে পারছেন না।
আবাসিক গ্রাহকদের দুর্ভোগ
গ্যাস সংকটের কারণে রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় রান্নাবান্না কার্যত ব্যাহত হচ্ছে। অনেক বাসায় দিনের বেশির ভাগ সময় চুলায় গ্যাসের চাপ এতটাই কম যে স্বাভাবিকভাবে রান্না করা সম্ভব হচ্ছে না।
মোহাম্মদপুরের তাজমহল রোডের বাসিন্দা আমির চৌধুরী বলেন, “গতকাল রাত ১২টায়ও গ্যাস পাইনি। ভোরে সামান্য চাপ থাকে। পুরো এলাকা জুড়ে গ্যাস নেই। ”
একই এলাকার নূরজাহান রোডের বাসিন্দা কামরুন্নাহার দোলন বলেন, “চুলায় গ্যাস না থাকায় ইন্ডাকশন কুকার ব্যবহার করতে হচ্ছে। কখনও আবার গভীর রাতে রান্না করতে হচ্ছে। গ্যাস এলেও আগুন খুব কম জ্বলে।”
ফলে অনেক পরিবার বাধ্য হয়ে বৈদ্যুতিক চুলা, ইন্ডাকশন কুকার কিংবা গভীর রাতে রান্নার বিকল্প বেছে নিচ্ছে।
শিল্প ও বিদ্যুৎ উৎপাদনেও প্রভাব
গ্যাস ঘাটতির কারণে শিল্পকারখানা ও বিদ্যুৎকেন্দ্রেও সরবরাহ সীমিত করতে হচ্ছে।
তিতাস গ্যাস ট্রান্সমিশন অ্যান্ড ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানির ব্যবস্থাপনা পরিচালক শাহনেওয়াজ পারভেজ জানান, দেশে দৈনিক গ্যাসের চাহিদা প্রায় ২ হাজার ২০০ মিলিয়ন ঘনফুট। স্বাভাবিক পরিস্থিতির জন্য অন্তত ১ হাজার ৭০০ মিলিয়ন ঘনফুট সরবরাহ প্রয়োজন হলেও একটি এলএনজি টার্মিনাল বন্ধ থাকায় সেই পরিমাণ গ্যাস পাওয়া যাচ্ছে না।
তিতাসের মহাব্যবস্থাপক (অপারেশন) কাজী মোহাম্মদ সাইদুল হাসান বলেন, তিতাসের দৈনিক চাহিদা প্রায় ১৯০ কোটি ঘনফুট। আগে যেখানে প্রতিদিন প্রায় ১৫০ কোটি ঘনফুট গ্যাস পাওয়া যেত, বর্তমানে তা কমে ১২০ কোটি ঘনফুটে নেমে এসেছে। ফলে বিভিন্ন খাতে সরবরাহ সীমিত করতে হচ্ছে।
কী ঘটেছে
বাংলাদেশে বর্তমানে এলএনজি আমদানি ও পুনর্গ্যাসীকরণের জন্য দুটি ভাসমান টার্মিনাল (এফএসআরইউ) রয়েছে। একটি পরিচালনা করছে সামিট, অন্যটি এক্সিলারেট এনার্জি।
গত ২১ জুলাই এক্সিলারেট এনার্জির পরিচালিত টার্মিনালে অগ্নিকাণ্ডের পর যান্ত্রিক ত্রুটি দেখা দেয়। এর পর থেকেই জাতীয় গ্রিডে এলএনজি সরবরাহ উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যায়।
স্বাভাবিক সময়ে দুটি টার্মিনাল থেকে প্রতিদিন ৯৫ থেকে ১০০ কোটি ঘনফুট গ্যাস জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ করা হয়। একটি টার্মিনাল বন্ধ হয়ে যাওয়ায় সরবরাহ প্রায় ৪৫ কোটি ঘনফুট কমে গেছে।
গত বৃহস্পতিবার ক্ষতিগ্রস্ত টার্মিনাল চালুর বিষয়ে এক্সিলারেট এনার্জির কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠক করেছে পেট্রোবাংলা। সংস্থাটির দায়িত্বশীল কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, দেশে এলএনজির কোনো ঘাটতি নেই। নতুন এলএনজি বহনকারী জাহাজ প্রস্তুত রয়েছে। ক্ষতিগ্রস্ত টার্মিনাল সচল হলেই জাহাজটি যুক্ত করা হবে।
জানা গেছে, টার্মিনালের দুটি বয়লারের মধ্যে আগুনে একটি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। অন্য বয়লারটি চালু করা গেলে প্রতিদিন আরও প্রায় ৩০ কোটি ঘনফুট গ্যাস জাতীয় গ্রিডে যোগ করা সম্ভব হবে।
বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, ক্ষতিগ্রস্ত টার্মিনাল মেরামতে যুক্তরাজ্য থেকে বিশেষজ্ঞ প্রকৌশলীরা বাংলাদেশে এসে কাজ শুরু করেছেন।
অপারেশন অনুবিভাগের যুগ্ম সচিব মনির হোসেন চৌধুরী বলেন, “ইংল্যান্ড থেকে বিশেষজ্ঞরা এসে কাজ শুরু করেছেন। বিষয়টি পুরোপুরি কারিগরি হওয়ায় এখনই নির্দিষ্ট করে বলা যাচ্ছে না, কবে নাগাদ টার্মিনাল চালু হবে।”
বিশেষজ্ঞদের মত
জ্বালানি বিশেষজ্ঞদের মতে, বর্তমান সংকট দেশের এলএনজি অবকাঠামোর দুর্বলতাকে সামনে নিয়ে এসেছে। মাত্র দুটি ভাসমান টার্মিনালের ওপর নির্ভরশীল থাকায় একটি বন্ধ হয়ে গেলেই জাতীয় গ্যাস সরবরাহে বড় ধরনের সংকট তৈরি হচ্ছে।
বুয়েটের কেমিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের অধ্যাপক ড. মো. ইকবাল হোসেন বলেন, দীর্ঘমেয়াদে ভাসমান টার্মিনালের পাশাপাশি স্থলভিত্তিক (ল্যান্ড-বেসড) এলএনজি টার্মিনাল নির্মাণ, নিজস্ব গ্যাস অনুসন্ধান এবং বিকল্প জ্বালানির ব্যবহার বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দিতে হবে। ভবিষ্যতের জ্বালানি নিরাপত্তার জন্য দ্রুত ল্যান্ড-বেসড এলএনজি টার্মিনাল নির্মাণ অত্যন্ত জরুরি। আগামী ১০ থেকে ১৫ বছর দেশে এলএনজির চাহিদা থাকবেই।”
এদিকে, কবে নাগাদ গ্যাস সরবরাহ পুরোপুরি স্বাভাবিক হবে, সে বিষয়ে এখনো নির্দিষ্ট কোনো সময়সীমা জানাতে পারেনি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ। ফলে রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে গ্যাস সংকট ও জনভোগান্তি আরও কিছুদিন অব্যাহত থাকতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।



