দৈনিক মানবজমিনের সৌজন্যে

একি অপরূপ রূপে মা তোমায় হেরিনু পল্লীজননী—আসলেই আমাদের এই বাংলার রূপ অপূর্ব সুন্দর। অসংখ্য নদ-নদীবেষ্টিত আমাদের বদ্বীপ সেই আদিকাল থেকেই বিদেশিদের কাছে ভূস্বর্গ হিসেবে পরিচিত। বুক জুড়ে তার সবুজের সমারোহ। হরেক রকম গাছপালা। গাছের সবুজ পাতা। সবুজ ধানক্ষেত। পালতোলা নৌকা। মাঝির কণ্ঠে ভাটিয়ালী সুর যেন আমাদের মোহাবিষ্ট করে রাখে। বিশেষ করে আমাদের গ্রামীণ পরিবেশ অতুলনীয় সুন্দর। বাংলাদেশের সৌন্দর্যে মোহিত হয়েছিলেন বিখ্যাত পরিব্রাজক ইবনে বতুতা। তিনি বাংলার রূপ সৌন্দর্য উপভোগ করেছিলেন।
আমাদের গ্রামের ছোট টিনের একচালার পাঠশালা। কিংবা এখন যেটাকে আমরা বলি প্রাইমারি স্কুল। কাপড়ের গাঁট্টির ভেতরে মেয়েদের সাজ সজ্জার নানারকম জিনিসপত্র নিয়ে লেইসফিতাওয়ালা ঘুরে বেড়াচ্ছে—এরকম দৃশ্য কিন্তু এখন দেখা যায় না। গ্রামের উন্নয়ন হচ্ছে। প্রত্যন্ত অঞ্চলে বিদ্যুৎ পৌঁছে গেছে। প্রযুক্তির বিভিন্ন উপকরণও পাওয়া যাচ্ছে। একটা সময় ছিল টেলিভিশনের সঙ্গে সমান সাইজের একটি ব্যাটারিও লাগতো। বিদেশ থেকে যদি কেউ টেলিভিশন আনতো তাহলে তাকে টেলিভিশনের সমান একটা ব্যাটারিও নিয়ে আসতে হতো। এখন সবকিছুর পরিবর্তন হচ্ছে। গ্রামও এখন আধুনিক হচ্ছে। এই আধুনিক হওয়ার কারণে গ্রামের রূপ কি পাল্টাচ্ছে? রাস্তাঘাট পাকা হয়েছে। ছনের চালের বদলে একসময় টিনের প্রচলন খুব বেশি ছিল, এখন ইট-সুরকির ব্যবহারে গ্রামেও বিল্ডিং তৈরি হচ্ছে। অধিকাংশ গ্রামেই পাকা ঘর তৈরি হয়েছে। কিন্তু গ্রামের যে সৌন্দর্য। গ্রামের যে মায়াবী পরিবেশ সেটার কিন্তু কোনো পরিবর্তন হয়নি। আমরা জানতাম যারা গ্রামে ফসল উৎপাদন করে তারাই হয়তো কৃষিকাজ করে। কিন্তু শাইখ সিরাজ তার টেলিভিশন অনুষ্ঠান দিয়ে সেই ধারণা বদলে দিয়েছেন। দেখিয়েছেন কৃষক মানে কাদামাটি মাখা শরীরের মানুষ নয়। কৃষক মানে একজন সম্মানীয় মানুষ। কেউ ধানচাষ করছেন, কেউ গরু-ছাগল, হাঁস-মুরগির খামার করছেন, কেউবা ফুল-ফসলের চাষ করছেন। তারা সকলেই কৃষক। কৃষক আমাদের জাতির বড় একটি শক্তি।
প্রবাসে যেসব ভাইবোন কাজ করেন সেইসব প্রবাসীকে আমরা বলি রেমিট্যান্স যোদ্ধা। আমাদের কৃষকও কিন্তু যোদ্ধা। তারা কায়িক পরিশ্রম করে আমাদের দেশকে খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ করছেন। আমরা যারা শহরে থাকি কিংবা চাষাবাদের সঙ্গে সম্পৃক্ত নই তারা তো সেইসব কৃষকদের উৎপাদিত খাদ্যশস্য খেয়েই জীবনধারণ করি। তারা এমন এক দেশের যোদ্ধা যে দেশের পুরোটাই গ্রাম কিংবা পুরোটাই শহর। আমরা একটা ধাঁধা মাঝেমধ্যে বলতাম—কোন দেশে কোনো মানুষ থাকে না। প্রশ্নটার উত্তর যদি কেউ বের না করতে পারে তাহলে উত্তর বলে দেয়া হতো সেটা হলো সন্দেশ। কিন্তু আমাদের বাংলাদেশের মাটি অন্যরকম। কবি তাই তো গেয়ে উঠেছেন—‘ও আমার দেশের মাটি তোমার পরে ঠেকাই মাথা’। বাংলাদেশের মাটি কি শুধুই মাটি? পৃথিবীতে যতগুলো উর্বর দেশ আছে, মাটি যে দেশের জন্য আশীর্বাদ তার ভেতর বাংলাদেশ অন্যতম। এখানে একটি ফল খেয়ে বিচিটা যদি ফেলে দেয়া হয় সেখানেই গাছ জন্মে যায়। এতটা উর্বর আমাদের এই ভূমি। ফুলের গাছে কলম করে লাগিয়ে দিলেই দেখবো কয়েকদিন পরে সেই গাছে ফুল ফুটেছে।
বাংলাদেশের মাটি তো কাজল কালো মাটি নয়, এই মাটি আসলেই সোনা। হাজার বছরের পলি জমে আমাদের মাটি হয়েছে সোনা। এই উর্বর পলিতে আমরা যত সহজে ফসল ফলাতে পারি, আমাদের খাবারের জোগান দিতে পারি, পৃথিবীর আর কোথাও প্রকৃতি এতটা উদার হয় না।
কবি যথার্থই বলেছেন—‘সোনা সোনা সোনা, লোকে বলে সোনা, সোনা নয় তত খাঁটি, বলো যত খাঁটি তারচেয়ে খাঁটি আমার বাংলাদেশের মাটি’।
আমাদের দেশের প্রকৃতিক সৌন্দর্য অপরিসীম সুন্দর। আমরা আমাদের দেশের সৌন্দর্যে মুগ্ধ হই। চারদিকে যেমনি ছড়িয়ে আছে ঢেউ তোলা নদী তেমনি পূর্ব-দক্ষিণে বিশাল বঙ্গোপসাগর। দক্ষিণ-পশ্চিমে জাল বিছিয়ে আছে বিশাল প্রাকৃতিক ম্যানগ্রোভ সুন্দরবন। এ ছাড়াও পাহাড়-পর্বত বিছানো পার্বত্য জেলা। আমাদের দেশকে নিয়ে তাই আমরা অনেক গর্ব করি। এদেশের প্রতিটি ধূলিকণার পরতে পরতে জড়িয়ে আছে মায়া। দেশ আমাদের মায়ের মতো আগলে রাখে।
তাই তো আমরা আমাদের দেশকে গভীরভাবে ভালোবাসি আর আপন মনেই গেয়ে উঠি—‘এমন দেশটি কোথাও খুঁজে পাবে নাকো তুমি…’।
প্রতিবেদক
ফরিদুর রেজা সাগর
ব্যবস্থাপনা পরিচালক, চ্যানেল আই ও ইমপ্রেস টেলিফিল্ম শিশু সাহিত্যে বাংলা একাডেমী পুরস্কারপ্রাপ্ত লেখক ফরিদুর রেজা সাগরের জন্ম ২২ ফেব্রুয়ারি ১৯৫৫ । মা প্ৰখ্যাত কথাসাহিত্যিক রাবেয়া খাতুন। বাবা বাংলাদেশের প্রথম চলচ্চিত্ৰবিষয়ক পত্রিকা সিনেমা’র সম্পাদক এবং এদেশের প্রথম শিশুচলচ্চিত্র ‘প্রেসিডেন্ট” এর নির্মাতা ফজলুল হক । ‘প্রেসিডেন্ট’ ছবিতে মূল ভূমিকায় অভিনয় করেছিলেন ফরিদুর রেজা সাগর। শিশুসাহিত্যিক হিসেবে ফরিদুর রেজা সাগরের খ্যাতি দু’দশক ধরে। ছোটবেলা থেকে কেন্দ্রীয় কচিকাঁচার মেলা, চাঁদের হাট এবং বাংলাদেশ টেলিভিশনের জন্মলগ্ন থেকেই তিনি শিশুকিশোর উপযোগী বিভিন্ন অনুষ্ঠানের সঙ্গে জড়িত। বর্তমানে তিনি ইমপ্রেস গ্রুপের পরিচালক। এক সময় তিনি বাংলাদেশ উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের সাথেও যুক্ত ছিলেন। এখনও পত্রপত্রিকায় তিনি নিয়মিত বিভিন্ন বিষয় নিয়ে লিখে থাকেন। তিনি ছোটদের পত্রিকা ‘টইটুম্বর’এর পরিচালনা পর্ষদের সদস্য। শিশুসাহিত্যে বিশেষ অবদানের জন্য তিনি বাংলা একাডেমী পুরস্কারসহ পেয়েছেন শিশু একাডেমীর অগ্রণী ব্যাংক শিশুসাহিত্য পুরস্কার এবং ইউরো শিশুসাহিত্য পুরস্কার ২০০৫। এছাড়াও পেয়েছেন বাংলাদেশ চলচ্চিত্ৰ সাংবাদিক সমিতি পুরস্কার (বাচসাস), কালচারাল রিপোর্টার্স এ্যাওয়ার্ড, জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার (২০০২) সহ জাতীয় পর্যায়ে আরো অনেক পুরস্কার।
আরও পড়ুন
পরবর্তী সংবাদ প্রস্তুত হচ্ছে…