
দীর্ঘ চার দশকেরও বেশি সময় ধরে বাংলা শিশুসাহিত্যে বহুমাত্রিক সৃষ্টির কারিগর আমীরুল ইসলাম। ২০০৬ সালে বাংলা একাডেমি পুরস্কারে ভূষিত হন তিনি। ‘খামখেয়ালি’ ছড়াগ্রন্থের জন্য সবচেয়ে কম বয়সে পেয়েছেন শিশু একাডেমি আয়োজিত অগ্রণী ব্যাংক শিশুসাহিত্য পুরস্কার। এছাড়াও আরও নানা পুরস্কার ও সম্মাননায় ভূষিত হয়েছেন তিনি। বাংলা সাহিত্যের পাঠকদের মনে আমীরুল ইসলাম নামটি থাকবে তাঁর সৃষ্টি-সম্ভারের গুণে ও মানে। শিশু-কিশোরদের কল্পনার জগৎকে তিনি কখনও রঙিন করেছেন ছড়ায়, কখনও গল্পে। ইতিহাসের পাতায় ফিরিয়ে নিয়ে গিয়েছেন মহান মুক্তিযুদ্ধের সময়ে, আবার বিজ্ঞান আর কৌতূহলের দরজা খুলে দিয়েছেন নতুন প্রজন্মের সামনে।
১৯৬৪ সালের ৭ এপ্রিল ঢাকার লালবাগে সংবাদকর্মী সাইফুর রহমান ও আনজিরা খাতুনের ঘরে তাঁর জন্ম। পুরান ঢাকার ওয়েস্ট এন্ড হাই স্কুল, ঢাকা কলেজ হয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগে পড়াশোনা করেন তিনি। শিক্ষাজীবন শেষ করে কর্মজীবনের শুরু দৈনিক বাংলার কিশোর পাতার বিভাগীয় সম্পাদক হিসেবে। বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র থেকে প্রকাশিত কিশোর পত্রিকা ‘আসন্ন’ সম্পাদনা করেন প্রায় এক দশক।
সত্তরের দশকের শেষভাগে ছড়া লেখার মধ্য দিয়ে শিশুসাহিত্যে পা রাখেন আমীরুল ইসলাম। ছড়া-কবিতা, গল্প-উপন্যাস, জীবনী-প্রবন্ধ, অনুবাদ থেকে বিজ্ঞান, প্রযুক্তি ও ইতিহাস ও শিশুসাহিত্যের প্রায় প্রতিটি শাখাতেই রেখেছেন তাঁর সৃষ্টিশীলতার স্বাক্ষর। লিখেছেন নাটক, গানও। তাঁর লেখায় উঠে এসেছে দেশপ্রেম, জাতীয় চেতনা, সামাজিক মূল্যবোধ, বিজ্ঞানমনস্কতা আর আধুনিক জীবনবোধ। ‘আমি সাতটা, দশরকম দশটা’, ‘ভূত এলো শহরে’, ‘আমি একদিন পিঁপড়ে হয়ে গিয়েছিলাম’, ‘বৃষ্টি তুমি বন্ধু হবে’ কিংবা ‘গাছটা হেঁটে হেঁটে বনের দিকে যাচ্ছে’ এমন সব সৃষ্টিতে শিশু জগতকে করেছেন বিস্ময় আর কৌতূহলের নতুন ভূবন।
কিশোর উপন্যাসেও তাঁর স্বতন্ত্র উপস্থিতি। লিখেছেন, ‘রুমঝুমপুর’, ‘ছুটির দিনে একদল পিচ্চি’, ‘মউ ভালো থেকো’, ‘একাত্তরের মিছিল’, ‘আমাদের গোয়েন্দাগিরি’, ‘কুসুমপুরের হাসিকান্না’র মতো বই। মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস ও চেতনাকে নতুন প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দিতে কাজ করেছেন তিনি। শিশু-কিশোরদের জন্য মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক বই লিখেছেন পঞ্চাশের বেশি।
সাহিত্যে অবদানের স্বীকৃতি হিসেবে ২০০৬ সালে ভূষিত হন বাংলা একাডেমি পুরস্কারে। ‘খামখেয়ালি’ ছড়াগ্রন্থের জন্য অগ্রণী ব্যাংক শিশুসাহিত্য পুরস্কার পান সবচেয়ে কম বয়সে। একই পুরস্কারে ভূষিত হয়েছেন আরও পাঁচবার। পেয়েছেন আরও নানা স্বীকৃতি।
গণমাধ্যমেও ছিল তাঁর সৃজনশীল বিচরণ। চ্যানেল আইয়ের প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকেই যুক্ত ছিলেন তিনি। দায়িত্ব পালন করেছেন অনুষ্ঠান বিভাগের প্রধান হিসেবে। রবীন্দ্র ও নজরুল মেলা আয়োজন, ‘আবৃত্তি ছন্দে আনন্দে’র মতো অনুষ্ঠানসহ চ্যানেল আইয়ের নানা আয়োজনে রেখেছেন গুরুত্বপূর্ণ অবদান।
পরিবার ও বন্ধুমহলে কৌতুকপ্রিয়, আড্ডাবাজ, ভোজন রসিক ছিলেন আমীরুল ইসলাম। ঘুরেছেন পৃথিবীর প্রায় বিখ্যাত সব শহরে। বই পড়া, পুরনো বই ও চিত্রকলা সংগ্রহ, দাবা খেলা ও রবীন্দ্র সঙ্গীত শুনতে পছন্দ করতে তিনি। বিশিষ্ট শিশুসাহিত্যিক আমীরুল ইসলাম আজ ১০ সেপ্টেম্বর মৃত্যুবরণ করেছেন (ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন)। সৃষ্টির মধ্যদিয়েই পাঠকের হৃদয়ে দীর্ঘদিন বেঁচে থাকবেন শিশুসাহিত্যের বহুমুখী লেখক আমীরুল ইসলাম।
প্রতিবেদক
রিয়াজ ইসলাম
STAFF CORRESPONDENT
আরও পড়ুন
পরবর্তী সংবাদ প্রস্তুত হচ্ছে…