মঈনুল আহসান সাবেরের (জন্ম–১৯৫৮) ছোট কলেবরের উপন্যাস ‘আমাদের খনজনপুর’ (২০০৪), যার পৃষ্ঠা সংখ্যা মাত্র ৮৭। মফস্সল–জীবনের স্নিগ্ধ আবেগকে ধারণ করে চিরায়ত ‘না-বলা প্রেম’কে মহিমান্বিত করতে চাওয়া এক বিষণ্ন ও কাব্যিক রোমান্টিক আখ্যান এই উপন্যাসটি। উপন্যাসের কাহিনি সরলরৈখিকভাবে অগ্রসর না হয়ে বরং কাব্যিকতার এক মন্থর ঘোরে মফস্সলি জীবনের সুখ, দুঃখ, অনুভূতিতে গ্রাস করে। কাহিনির কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে নোমান এবং রেবেকা, যারা শৈশবের সুন্দর ও মায়াময় ছোট শহর ‘খনজনপুর’ এবং তার রোদ-ছায়ামাখা পাড়া ‘রোদভাঙা’র স্মৃতিতে বাঁধা। নোমানের সাহস না হওয়ায় সে রেবেকাকে কখনো মুখ ফুটে ভালোবাসার কথা বলতে পারেনি। যদিও রেবেকা বর্তমানে একটি ‘সফল’ বৈবাহিক জীবন যাপন করছে, তাদের স্মৃতিবিজড়িত খনজনপুর অবশ্য দুজনের কাছেই মধুর, যার অলিগলি, চেনা পরিচিত মুখগুলো যেন তারা আজও হাতড়ে বেড়ান। খনজনপুর যেন কিছু চরিত্র, কিছু অতীত স্মৃতি কিংবা সম্পর্কের টানাপোড়েনের সাক্ষী হয়ে আছে।
প্রধান চরিত্র নোমান ও রেবেকা ছাড়াও এই আখ্যানে পুশকিন ভাই, নায়লা, নাঈমা, শামীম, অন্তু, সবুজ, ফরিদসহ বেশ কিছু চরিত্র পাওয়া যায়, যারা প্রত্যেকেই খনজনপুরের সঙ্গে জড়িত। কেন্দ্রীয় চরিত্রদের মনোজগতে এক গভীর দ্বন্দ্ব কাজ করে—নোমান একজন ‘অতি সাধারণ’ রূপে উপস্থাপিত নায়ক, যে প্রথাগত উচ্চাকাঙ্ক্ষার প্রতি বিতৃষ্ণ, আর রেবেকা তার বৈবাহিক জীবনে থেকেও সেই ‘সাধারণ’ প্রেমিকের কথাই স্মরণ করে। লেখকের ‘একটা দুইটা লাইন দিয়া স্কেচ আঁকার মতন’ মসৃণ ও সংক্ষিপ্ত শৈলী এবং প্রমিত গদ্যের বিপরীতে কাব্যিক ও কথ্যভঙ্গির মিশ্রণ এটিকে একটি স্বতন্ত্র শিল্পরূপ দেয়। এই গ্রন্থ এক নিভৃতচারী লেখকের প্রথাবিরোধী মনোভাব এবং মফস্সলি প্রেমের চিরন্তন কাব্যিকতাকে আধুনিক সাহিত্যের প্রেক্ষাপটে প্রতিষ্ঠিত করে, যা পাঠককে মনে করিয়ে দেয় যে সত্যিকারের আবেগ মফস্সলের নিভৃত কোণেই সবচেয়ে খাঁটি রূপে বিরাজ করে।



