সাহেদ এ বাড়ির বড় ছেলে। গোলাম কাদের ও নাসিমা সুলতানা দম্পতির একমাত্র পুত্রসন্তান। স্ত্রী-সন্তান নিয়ে সে বসবাস করে আমেরিকার ফ্লোরিডায়। দু-তিন বছর পরপর দিন কয়েকের জন্য বাংলাদেশে এসে বৃদ্ধ মা–বাবাকে দেখে আবার আমেরিকায় ফিরে যায়।
রুম্পা সাহেদের ছোট বোন। গোলাম কাদের ও নাসিমা সুলতানার একমাত্র কন্যা। সে বসবাস করে কানাডার ভ্যানকুভারে। স্বামী-সন্তান নিয়ে সে-ও বাংলাদেশে বেড়াতে আসে মাঝেমধ্যে। চার-পাঁচ বছর পরপর। এসে দিন কয়েক থেকে যায় মা–বাবার সঙ্গে। ওই কয়েকটা দিনের জন্য গোলাম কাদের ও নাসিমা সুলতানা অপেক্ষা করেন বছরের পর বছর। আনন্দের দিনগুলো যতটা দ্রুত ফুরিয়ে যায়, অপেক্ষার দিনগুলো ততটা দ্রুত ফুরায় না। অপেক্ষার দিনগুলো দীর্ঘ থেকে দীর্ঘতর হয়।
স্ত্রীর নীরবতায় গোলাম কাদের এবার শব্দ করে হেসে উঠলেন। ডানে-বাঁয়ে মাথা দুলিয়ে বললেন, ‘আমাকে জব্দ করতে গিয়ে নিজেই জব্দ হলে। আমি যদি তোমার আগে মরে যাই, তুমি চাইলে তোমার সন্তানদের কাছে গিয়ে থাকতে পারো।’
‘এ বাড়ি ছেড়ে আমি কোথাও যাব না। নিজেদের একটা বাড়ির জন্য দিনের পর দিন স্বপ্ন দেখেছি। ভাড়া বাসায় থাকার দিনগুলো আমি কখনো ভুলতে পারব না। পানি আছে তো গ্যাস নেই, গ্যাস আছে তো কারেন্ট বিল নিয়ে ঝামেলা, রাত এগারোটার পর গেট বন্ধ, ছাদে যাওয়া যাবে না, বেশি শব্দ করা যাবে না, বছর বছর ভাড়া বৃদ্ধি, বাড়তি ভাড়া না দিলে বাড়ি ছাড়ার নোটিশ! কী যে বিরক্তিকর সেসব দিন! আমাদের এখন স্বপ্ন পূরণ হয়েছে। নিজেদের একটা বাড়ি হয়েছে। সবকিছু নিজের মতো করে সাজিয়েছি। এ বাড়ি ছেড়ে অন্য কোথাও গিয়ে আমি থাকতে পারব না। তা ছাড়া ছেলেমেয়েরা ওদের মতো করে সংসার সাজিয়েছে। ওদের কাছে গিয়ে বোঝা হয়ে থাকতে চাই না। দু-একবার তো বেড়াতে গিয়ে দেখেছি। ওদের কত কাজ, কত ব্যস্ততা! আমাদের ঠিকমতো সময়ই দিতে পারে না। তার চেয়ে নিজের দেশে নিজের সংসারই ভালো। ওরা মাঝেমধ্যে বেড়াতে আসে, এ–ই ভালো। আমরা তো ওদের বৃদ্ধ মা–বাবাকে দেখাশোনার দায় থেকে মুক্তি দিয়েছি। থাকুক ওরা ওদের মতো। আমাদের দিন তো প্রায় শেষ হয়ে এল।’
‘হুম, বুঝলাম। কিন্তু আমি যদি তোমার আগে মরে যাই, এই একলা ঘরে একা একা কী করে থাকবে তুমি?’ আবারও স্ত্রীকে একই প্রশ্ন গোলাম কাদেরের।
‘আমি তোমাকে আগে প্রশ্ন করেছি। আমি যদি আগে মরে যাই, তুমি কী করে থাকবে? কে তোমাকে বিকেলবেলায় চা বানিয়ে খাওয়াবে? ওষুধ খাওয়ার কথাই বা কে মনে করিয়ে দেবে? কাজের লোকের হাতে তুমি তো কিছুই খেতে চাও না।’
গোলাম কাদের সহসা কোনো জবাব দিতে পারলেন না। চায়ের কাপে চুমুক দেওয়ার মতো অবশিষ্ট চা-টুকুও আর নেই। তিনি একবার উঠে দাঁড়ালেন। বসার ঘরে এলোমেলো হাঁটলেন কিছুক্ষণ। তারপর আবার বসলেন। তাকালেন স্ত্রীর দিকে। নাসিমা সুলতানাও তাকিয়ে রইলেন স্বামীর চোখে চোখ রেখে।
হঠাৎ গোলাম কাদের দারুণ কিছু আবিষ্কার করে ফেলেছেন, এমন ভঙ্গিতে বললেন, ‘আচ্ছা, একটা কাজ করলে কেমন হয়?’
‘কী কাজ?’ নাসিমা সুলতানার কণ্ঠে কৌতূহল।
‘আমরা যদি একটা চুক্তি করি, কেমন হয়?’
‘কী চুক্তি?’
‘ধরো, আমার আগে তোমার মৃত্যু হলো! একই দিন তোমার সঙ্গে আমিও যদি পৃথিবী থেকে বিদায় নিই, কেমন হবে?’
‘সেটা কীভাবে সম্ভব?’ নাসিমা সুলতানার কণ্ঠে বিস্ময়।
‘চাইলেই সম্ভব। তোমাকে ছাড়া এই একলা জীবন বয়ে বেড়ানো সত্যিই আমার জন্য দুর্বিষহ হয়ে উঠবে। তার চেয়ে আমিও তোমার সঙ্গে চলে গেলাম একই দিনে। দুজন একসঙ্গে। সব সমস্যার সমাধান। ঘুমের ওষুধ তো আমাকে এমনিতেই রোজ খেতে হয়। সেদিন নাহয় একটু বেশি করে খেয়ে চিরতরে তোমার পাশাপাশি ঘুমিয়ে পড়ব। একইভাবে আমি যদি তোমার আগে মরে যাই, তুমিও একগাদা ঘুমের ওষুধ খেয়ে চিরতরে ঘুমিয়ে পড়লে। তাহলেই তো আর আমাদের কাউকে একলা থাকার দুর্বিষহ কষ্টটা সইতে হবে না।’
‘কিন্তু এটা তো আত্মহত্যা!’ নাসিমা সুলতানা রীতিমতো আঁতকে ওঠেন।
‘হুম, আত্মহত্যাও বলতে পারো। আবার স্বেচ্ছামৃত্যুও বলা যেতে পারে। দেখো, মানুষের জীবন কখনো কখনো এতটাই দুর্বিষহ হয়ে ওঠে যে তখন আত্মহত্যা বা স্বেচ্ছামৃত্যুর পথে পা বাড়ানো ছাড়া অন্য কোনো উপায় থাকে না। কত মানুষই তো আত্মহত্যা করে। ভেবে দেখো, এই শেষ বয়সে আমরা দুজন দুজনের ওপর এতটাই নির্ভরশীল হয়ে পড়েছি যে একজন আরেকজনকে ছাড়া একা বেঁচে থাকার কথা ভাবতেই পারি না। সুতরাং একজন চলে গেলে অন্যজন কতটা অসহায় হয়ে পড়ব, সেটা তো বুঝতেই পারছ। তার চেয়ে একই দিন চলে যাওয়াই ভালো না? তা ছাড়া এমনিতেই অনেক বয়স হয়েছে আমাদের। যেকোনো সময় পৃথিবী থেকে বিদায় নিতে হবে। নাহয় কয়েকটা দিন আগেই বিদায় নিলাম।’
নাসিমা সুলতানা চুপ হয়ে গেলেন এবার। সত্যিই তো, তারা দুজন দুজনের ওপর এতটাই নির্ভরশীল যে একজনকে ছাড়া অন্যজনের পক্ষে একাকী বেঁচে থাকা রীতিমতো অসম্ভব! রোজ যত্ন করে দুবেলা ইনসুলিন পুশ করা, বিকেল হলে স্বামীর সঙ্গে পার্কে হাঁটতে গিয়ে যতটা সম্ভব সুগারের লাগাম টেনে ধরা, অসুখ-বিসুখে চিকিৎসকের কাছে নিয়ে যাওয়া—এসব তো আছেই। সঙ্গে এত দিনের সংসার জীবনের মায়া-মমতা, দায়বদ্ধতা কোনো কিছুই তো নাসিমা সুলতানা অস্বীকার করতে পারেন না। সত্যিই তো, স্বামীকে ছাড়া কতটা দুর্বিষহ হয়ে উঠবে তাঁর একলা জীবন, ভাবতে গেলেই শিউরে ওঠেন তিনি। তার চেয়ে ঘুমের ওষুধ খেয়ে একই দিন চলে গেলেই বরং বেঁচে যান! এই শেষ বয়সে একা থাকার দুঃসহ দিনগুলো দেখতে হবে না আর।
স্ত্রীকে চুপ হয়ে যেতে দেখে গোলাম কাদের বললেন, ‘তোমার কাছে আমার প্রস্তাবটা অদ্ভুত মনে হতে পারে। পাগলামিও মনে হতে পারে। কিন্তু আমরা তো জানি, আমরা একজন আরেকজনকে ছাড়া কতটা অসহায়। তার চেয়ে এটাই তো ভালো। আমরা একই দিন চলে গেলাম! তুমি যদি আমার আগে মরে যাও, তাহলে আমি কিন্তু সত্যিই অনেকগুলো ঘুমের ওষুধ খেয়ে ঘুমিয়ে পড়ব চিরদিনের মতো। আর আমি যদি আগে মরে যাই, তবে তুমি চাইলে আরও কিছুদিন বেঁচে থাকতে পারো।’
‘আমাকে এতটা স্বার্থপর আর ভীতু ভেবো না। আমিও একসঙ্গে অনেকগুলো ঘুমের ওষুধ খেতে পারব। তোমাকে ছাড়া আমার পক্ষেও একাকী থাকা অসম্ভব। সুতরাং আমি তোমার চুক্তি মেনে নিলাম। যদিও আত্মহত্যা মহাপাপ। এ নিয়ে মনের মধ্যে কিছুটা দ্বিধা কাজ করছে। তবু আমাদের একজনকে ছাড়া অন্যজনের একা থাকার দুর্বিষহ দিনগুলো থেকে মুক্তি পেতে আমাদের সামনে এর চেয়ে ভালো কোনো পথ নেই।’ নাসিমা সুলতানার কণ্ঠ হঠাৎ যেন খানিকটা দৃঢ় হয়ে ওঠে। যেন সব রকম দ্বিধা তিনি তুড়ি মেরে উড়িয়ে দিয়েছেন এইমাত্র।