ইন্টারমিটেন্ট ফাস্টিং বা অন্তর্বর্তী উপবাস ওজন কমানো থেকে শুরু করে দীর্ঘায়ু, ডায়াবেটিস, ক্যানসার এমনকি স্মৃতিশক্তি ভালো রাখার নানা সম্ভাব্য উপকারের জন্য সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বেশ জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে। তবে এসব দাবির কতটা বৈজ্ঞানিকভাবে প্রমাণিত?
সাম্প্রতিক গবেষণাগুলো বলছে, ইন্টারমিটেন্ট ফাস্টিং ওজন কমাতে কার্যকর হতে পারে, কিন্তু অন্য খাদ্যাভ্যাসের তুলনায় এটি যে বিশেষভাবে বেশি কার্যকর এমন শক্ত প্রমাণ এখনো নেই। বরং এর দীর্ঘমেয়াদি স্বাস্থ্য উপকারিতা নিয়ে গবেষণার ফলাফল বেশ অসামঞ্জস্যপূর্ণ।
মঙ্গলবার (২৫ অগাস্ট) বিবিসি বাংলার এক প্রতিবেদনে এ তথ্য জানিয়ে আরও বলে, শিকাগোর ইউনিভার্সিটি অব ইলিনয়ের পুষ্টিবিজ্ঞানের অধ্যাপক ক্রিস্টা ভারাডির ভাষায়, “এটি কোনো যাদু নয়।”
ইন্টারমিটেন্ট ফাস্টিং কীভাবে কাজ করে?
ইন্টারমিটেন্ট ফাস্টিংয়ের মূল ধারণা হলো দিনের নির্দিষ্ট সময় বা সপ্তাহের নির্দিষ্ট কিছু দিনে খাবার গ্রহণ সীমিত রাখা। এর বিভিন্ন ধরন রয়েছে। কেউ দিনের নির্দিষ্ট কয়েক ঘণ্টার মধ্যে খাবার খান, আবার কেউ সপ্তাহে এক বা একাধিক দিন ক্যালরি গ্রহণ অনেকটা কমিয়ে দেন।
এই পদ্ধতির পেছনে একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈজ্ঞানিক ধারণা রয়েছে। দীর্ঘ সময় না খেলে শরীর ধীরে ধীরে গ্লুকোজ পোড়ানোর বদলে জমা চর্বিকে শক্তির উৎস হিসেবে ব্যবহার করতে শুরু করে।
এ সময় কোষের ভেতর ক্ষতিগ্রস্ত উপাদান পুনর্ব্যবহারের একটি প্রক্রিয়া সক্রিয় হতে পারে, যাকে বলা হয় অটোফ্যাজি। এ কারণেই ধারণা করা হয়, উপবাস কোষের স্বাস্থ্য ও দীর্ঘায়ুতে ভূমিকা রাখতে পারে।
তবে এই প্রক্রিয়া নিয়ে সবচেয়ে আকর্ষণীয় প্রমাণের বড় অংশ এসেছে ইঁদুর, মাছি ও কৃমির মতো প্রাণীর ওপর গবেষণা থেকে। মানুষের ক্ষেত্রে একই ফল পাওয়া গেছে এমন প্রমাণ তুলনামূলকভাবে দুর্বল।
ওজন কমাতে কতটা কার্যকর?
অধ্যাপক ক্রিস্টা ভারাডির মতে, ইন্টারমিটেন্ট ফাস্টিংয়ের ধরন অনুযায়ী মানুষের ওজন প্রায় ৫ শতাংশ পর্যন্ত কমতে পারে।
তবে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, এটি অন্যান্য কার্যকর ডায়েট পদ্ধতির তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি কার্যকর বলে প্রমাণিত হয়নি।
অর্থাৎ, ইন্টারমিটেন্ট ফাস্টিং ওজন কমাতে সাহায্য করতে পারে, কিন্তু এর বিশেষত্ব সম্ভবত ওজন কমানোর ফলাফলে নয়; বরং কারও জন্য খাবারের সময় নিয়ন্ত্রণের এই পদ্ধতি অনুসরণ করা তুলনামূলক সহজ হতে পারে।
ওজন কিছুটা কমলেও রক্তচাপ ও কোলেস্টেরলের মতো বিপাকীয় ঝুঁকির কিছু সূচকে উন্নতি দেখা যেতে পারে। কিছু গবেষণায় পলিসিস্টিক ওভারি সিনড্রোমের (পিসিওএস) উপসর্গ কমারও ইঙ্গিত পাওয়া গেছে।
তবে যারা একেবারেই সুস্থ নন, তাদের ক্ষেত্রে সম্ভাব্য উপকার তুলনামূলক বেশি হতে পারে বলে গবেষকদের ধারণা।
ইন্টারমিটেন্ট ফাস্টিং নিয়ে আশাবাদী হওয়ার বড় একটি কারণ প্রাণীর ওপর পরিচালিত গবেষণা।
ইঁদুরের ক্ষেত্রে দেখা গেছে, একই পরিমাণ ক্যালরি গ্রহণ করলেও খাবারের সময় সীমিত করে দিলে তারা তুলনামূলকভাবে সুস্থ ও ছিপছিপে থাকতে পারে। বিপরীতে অবাধে খাবার গ্রহণ করা ইঁদুর স্থূলতা ও বিভিন্ন বিপাকীয় সমস্যায় আক্রান্ত হতে পারে।
হার্ভার্ড স্কুল অব পাবলিক হেলথের পুষ্টিবিজ্ঞানের সহযোগী অধ্যাপক কোর্টনি পিটারসনের মতে, ইঁদুরের বিপাকীয় হার মানুষের তুলনায় অনেক বেশি। ফলে ইঁদুরের ১৬ ঘণ্টার উপবাসকে মানুষের ক্ষেত্রে একই সময়ের উপবাস হিসেবে সরাসরি তুলনা করা ঠিক নয়।
এ ছাড়া গবেষণাগারে ব্যবহৃত ইঁদুরগুলো সাধারণত জিনগতভাবে অনেক বেশি সাদৃশ্যপূর্ণ। মানুষের জিনগত ও জীবনযাত্রাগত বৈচিত্র্য অনেক বেশি।
ক্যানসার ও স্মৃতিশক্তি নিয়ে কী জানা গেছে?
ইন্টারমিটেন্ট ফাস্টিং ক্যানসারের ঝুঁকি কমাতে পারে এমন দাবি প্রাণীর গবেষণায় কিছুটা সমর্থন পেয়েছে। কিছু গবেষণায় দেখা গেছে, উপবাস ক্যানসার কোষের বৃদ্ধি কমাতে এবং কেমোথেরাপির পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া মোকাবিলায় সুস্থ কোষকে সহায়তা করতে পারে।

কিন্তু মানুষের ওপর একই ধরনের ফল পাওয়া যায়নি।
একটি বড় গবেষণায় দীর্ঘমেয়াদি উপবাসের জৈবিক প্রভাব অনুকরণ করার জন্য বিশেষ খাদ্যপদ্ধতি ব্যবহার করা হলেও অংশগ্রহণকারীরা প্রত্যাশিত বিপাকীয় পরিবর্তনের পর্যায়ে পৌঁছাতে পারেননি।
স্মৃতিশক্তি ও মস্তিষ্কের স্বাস্থ্য নিয়েও একই ধরনের চিত্র দেখা যায়। প্রাণীর গবেষণায় ইতিবাচক ফল পাওয়া গেলেও মানুষের ক্ষেত্রে প্রমাণ এখনো যথেষ্ট শক্তিশালী নয়।
তাই ক্যানসার প্রতিরোধ বা স্মৃতিশক্তি বাড়ানোর উপায় হিসেবে ইন্টারমিটেন্ট ফাস্টিংকে নিশ্চিতভাবে সুপারিশ করার মতো পর্যাপ্ত মানব গবেষণা এখনো নেই।
গবেষণার সবচেয়ে বড় সমস্যা মানুষ আসলে কী খাচ্ছে?
ইন্টারমিটেন্ট ফাস্টিং নিয়ে গবেষণার ফলাফল কেন এত ভিন্ন এর একটি বড় কারণ হতে পারে তথ্য সংগ্রহের সীমাবদ্ধতা।
অধ্যাপক ক্রিস্টা ভারাডি বলেন, “মানুষ আসলে কী খাচ্ছে সে সম্পর্কে আমাদের কোনো ধারণাই নেই।”
প্রাণীর গবেষণায় গবেষকরাই খাবারের পরিমাণ ও সময় নিয়ন্ত্রণ করেন। ফলে তারা নিশ্চিতভাবে জানেন প্রাণীটি কী খাচ্ছে।
মানুষের ক্ষেত্রে গবেষকরা সাধারণত অংশগ্রহণকারীদের খাবারের ডায়েরি রাখতে বলেন। কিন্তু মানুষ অনেক সময় খাবারের হিসাব ভুলে যেতে পারেন, কোনো খাবার বাদ দিতে পারেন বা ভুল পরিমাণ লিখতে পারেন।
আবার কেউ কেউ ইচ্ছাকৃতভাবেও খাবারের পরিমাণ কম দেখাতে পারেন।
আবেরেস্টউইথ ইউনিভার্সিটির পুষ্টিবিষয়ক গবেষক থমাস উইলসনের মতে, প্রায় ৩০ শতাংশ মানুষ তাদের খাবার গ্রহণের পরিমাণ কম করে রিপোর্ট করেন।
কত ক্যালরি খাচ্ছি, সেটাও অনেক সময় ভুল জানা হয়, খাবার গ্রহণের পরিমাণ যাচাই করার ক্ষেত্রে “ডাবলি লেবেলড ওয়াটার” পদ্ধতিকে তুলনামূলকভাবে নির্ভরযোগ্য ধরা হয়।
এই পদ্ধতিতে বিশেষ ধরনের নিরাপদ আইসোটোপযুক্ত পানি পান করানো হয়। পরে প্রস্রাব ও ঘামের মাধ্যমে এসব আইসোটোপ শরীর থেকে কত দ্রুত বের হচ্ছে তা বিশ্লেষণ করে একজন ব্যক্তি কতটা শক্তি ব্যবহার করছেন, তা অনুমান করা যায়।
গবেষণায় দেখা গেছে, মানুষ গড়ে প্রতিদিন ৪০০ থেকে ৮০০ ক্যালরি পর্যন্ত কম করে রিপোর্ট করতে পারেন।
অধ্যাপক ভারাডির ভাষায়, একজন ব্যক্তি হয়তো দিনে ১,৬০০ থেকে ২,০০০ ক্যালরি খাওয়ার কথা জানাচ্ছেন, কিন্তু ডাবলি লেবেলড ওয়াটারের তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা যাচ্ছে প্রকৃত গ্রহণের পরিমাণ প্রায় ৩,৫০০ ক্যালরি।
ফলে শুধু খাবারের ডায়েরির ওপর নির্ভর করে পরিচালিত গবেষণার ফলাফল নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যায়।
প্রযুক্তি কি বদলে দিতে পারে পুষ্টি গবেষণা?
গবেষকেরা এখন এই সমস্যার সমাধানে প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়াচ্ছেন।
কিছু গবেষণায় অংশগ্রহণকারীদের খাবারের ছবি তুলতে বলা হচ্ছে। আবার কোথাও চশমা বা নেকলেসে ক্যামেরা বসিয়ে তারা কী খাচ্ছেন তা পর্যবেক্ষণের চেষ্টা করা হচ্ছে। তবে এতে ব্যক্তিগত গোপনীয়তা নিয়ে নতুন প্রশ্ন তৈরি হচ্ছে।
এ ছাড়া তৈরি হচ্ছে চর্বণ শনাক্তকারী নেকলেস, খাবারের পরিমাণ ও সময় শনাক্ত করতে সক্ষম স্মার্ট ফর্ক এবং দাঁতে বসানো নিউট্রিয়েন্ট সেন্সর।
এসব প্রযুক্তি এখনো প্রাথমিক পর্যায়ে। তবে ভবিষ্যতে এগুলো মানুষের প্রকৃত খাদ্যাভ্যাস সম্পর্কে আরও নির্ভরযোগ্য তথ্য দিতে পারে।
বর্তমানে রক্ত ও প্রস্রাবের নমুনা বিশ্লেষণ করেও শরীর কী ধরনের পুষ্টি প্রক্রিয়াজাত করছে, সে সম্পর্কে তুলনামূলকভাবে বস্তুনিষ্ঠ তথ্য পাওয়ার চেষ্টা করা হচ্ছে।
তাহলে কি ইন্টারমিটেন্ট ফাস্টিং অতিরঞ্জিত?
গবেষণার বর্তমান চিত্র থেকে বলা যায়, ইন্টারমিটেন্ট ফাস্টিং পুরোপুরি ভুয়া বা অকার্যকর নয়। এটি ওজন কমাতে সাহায্য করতে পারে এবং কিছু মানুষের ক্ষেত্রে রক্তচাপ, কোলেস্টেরল ও অন্যান্য বিপাকীয় সূচকে উন্নতি আনতে পারে।
কিন্তু দীর্ঘায়ু বাড়ানো, ক্যানসার প্রতিরোধ, স্মৃতিশক্তি বৃদ্ধি কিংবা অন্য সব ডায়েটের তুলনায় এটি অসাধারণভাবে কার্যকর এমন দাবি করার মতো শক্ত প্রমাণ এখনো নেই।
বরং প্রাণীর ওপর পাওয়া চমকপ্রদ ফলাফলকে মানুষের ক্ষেত্রে সরাসরি প্রয়োগ করাই সমস্যার বড় একটি কারণ।
সোশ্যাল মিডিয়ায় ইন্টারমিটেন্ট ফাস্টিং নিয়ে অনেক বড় বড় দাবি দেখা গেলেও গবেষকদের বার্তা তুলনামূলকভাবে সতর্ক।
ইন্টারমিটেন্ট ফাস্টিং একটি সম্ভাবনাময় খাদ্যপদ্ধতি হতে পারে, কিন্তু এটিকে কোনো “জাদুকরী” স্বাস্থ্যসমাধান হিসেবে দেখার কারণ এখনো নেই।
ভবিষ্যতে মানুষের প্রকৃত খাদ্যাভ্যাস নির্ভুলভাবে পরিমাপের প্রযুক্তি উন্নত হলে ইন্টারমিটেন্ট ফাস্টিংয়ের প্রকৃত উপকারিতা সম্পর্কে আরও পরিষ্কার ধারণা পাওয়া যেতে পারে।