
ঢাকা, ১০ জুন – দেশের আর্থিক খাতে এক নজিরবিহীন ও বড় ধরনের ধাক্কা! দীর্ঘদিন ধরে চরম তারল্য সংকট, নজিরবিহীন লুটপাট এবং গ্রাহকদের টাকা ফেরত দিতে ব্যর্থ হওয়া ৫টি আর্থিক প্রতিষ্ঠান (এনবিএফআই) চিরতরে বন্ধ বা অবসায়ন করার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক।
গতকাল মঙ্গলবার (৯ জুন, ২০২৬) কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নর মোস্তাকুর রহমানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত পরিচালনা পর্ষদের হাইভোল্টেজ সভায় এই ঐতিহাসিক কিন্তু নির্মম সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। একই সাথে জানানো হয়েছে, এই প্রতিষ্ঠানগুলোর সাধারণ আমানতকারীরা তাদের জমানো টাকার অঙ্কে যতই হোক না কেন, সর্বোচ্চ মাত্র ১০ লাখ টাকা পর্যন্ত ফেরত পাবেন!
বাংলাদেশ ব্যাংকের তালিকায় থাকা ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে পৌঁছানো এই ৫টি প্রতিষ্ঠান হলো:
১. পিপলস লিজিং অ্যান্ড ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিসেস
২. ইন্টারন্যাশনাল লিজিং অ্যান্ড ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিসেস
৩. এফএএস (FAS) ফাইন্যান্স
৪. ফারইস্ট ফাইন্যান্স
৫. আভিভা ফাইন্যান্স
কেন্দ্রীয় ব্যাংক জানিয়েছে, প্রথম ধাপে এই ৫ প্রতিষ্ঠানের পরিচালনা পর্ষদ (Board) ভেঙে দিয়ে সরকারি প্রশাসক নিয়োগ করা হবে। এরপর তাদের মোট সম্পদ বিক্রি ও দায়-দেনা মূল্যায়ন করে আমানতকারীদের টাকা ফেরত দেওয়ার প্রক্রিয়া শুরু হবে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের অফিসিয়াল তথ্য অনুযায়ী, এই প্রতিষ্ঠানগুলোর আর্থিক অবস্থা এতটাই শোচনীয় যে এগুলোকে আর বাঁচিয়ে রাখা অসম্ভব। গত ডিসেম্বর শেষে প্রতিষ্ঠানগুলোর খেলাপি ঋণের হার ছিল চোখ কপালে তোলার মতো।
- এফএএস ফাইন্যান্স: ৯৯.৯৯% (অর্থাৎ ১০০ টাকার মধ্যে ১০০ টাকাই খেলাপি!)
- ইন্টারন্যাশনাল লিজিং: ৯৯.৪৪%
- ফারইস্ট ফাইন্যান্স: ৯৮.৫০%
- পিপলস লিজিং: প্রায় ৯৫%
- আভিভা ফাইন্যান্স: ৯৩.৯৩%
“লুটেরা টাকা নিয়ে পালাল, আর মরল সাধারণ মানুষ। সারা জীবনের সঞ্চয় রেখে এখন ১০ লাখ টাকার বেশি পাওয়া যাবে না— এই বিচার কার কাছে দেব?” — এক ক্ষুব্ধ আমানতকারী।
আর্থিক খাতের সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এই ধ্বংসযজ্ঞের পেছনে রয়েছে বিগত বছরগুলোর অনিয়ম, সুশাসনের অভাব এবং বড় বড় ঋণ কেলেঙ্কারি। বিশেষ করে বহুল আলোচিত পি কে হালদারের চক্র একাই পিপলস লিজিং, ইন্টারন্যাশনাল লিজিং, এফএএস ফাইন্যান্স ও বিআইএফসি থেকে প্রায় সাড়ে তিন হাজার কোটি টাকা আত্মসাৎ করে বিদেশে পাচার করেছে। যার ফলশ্রুতিতে আজ প্রায় ২৭ হাজার ব্যক্তি আমানতকারীর ২ হাজার ৭০০ কোটি টাকার আমানত চরম অনিশ্চয়তায় পড়েছে।
কেবল এই ৫টিই নয়, আরও ৪টি প্রতিষ্ঠানকে লাইফ সাপোর্টে রাখা হয়েছে। এগুলো হলো— বিআইএফসি (BIFC), প্রিমিয়ার লিজিং, জিএসপি ফাইন্যান্স এবং প্রাইম ফাইন্যান্স। এদের আগামী ৩ মাস সময় দেওয়া হয়েছে। এই ৯০ দিনের মধ্যে যদি তারা সাধারণ গ্রাহকদের মূল টাকা ফেরত দেওয়ার সক্ষমতা দেখাতে না পারে, তবে এদেরও একই ভাগ্য বরণ করতে হবে— অর্থাৎ চিরতরে বন্ধ করে দেওয়া হবে।
এনএন/ ১০ জুন ২০২৬





