দেশে হামের ব্যাপক সংক্রমণের মধ্যেই নতুন উদ্বেগ হিসেবে দেখা দিয়েছে প্রাণঘাতী সংক্রামক রোগ ডিপথেরিয়া। একসময় প্রায় বিলুপ্ত হয়ে যাওয়া এ রোগ এখন আবার দেশের বিভিন্ন এলাকায় শনাক্ত হচ্ছে। জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, টিকাদান কর্মসূচির দুর্বলতা, দীর্ঘদিনের অব্যবস্থাপনা এবং শিশুদের কমে যাওয়া রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতার কারণে পরিস্থিতি ধীরে ধীরে বিপজ্জনক দিকে যাচ্ছে।
বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা, চলমান হাম পরিস্থিতির মধ্যে ডিপথেরিয়ার বিস্তার শুরু হলে শিশুস্বাস্থ্য ব্যবস্থায় নতুন সংকট তৈরি হতে পারে। কারণ, হাম-পরবর্তী সময়ে শিশুদের রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা দুর্বল হয়ে পড়ে, যা অন্যান্য সংক্রামক রোগের ঝুঁকি বাড়িয়ে দেয়।
বিভিন্ন জেলায় শনাক্ত হচ্ছে রোগী
রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠান আইইডিসিআর সূত্রে জানা গেছে, সম্প্রতি সিলেট, হবিগঞ্জ, কামরাঙ্গীরচর, কিশোরগঞ্জ ও মুন্সীগঞ্জসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় ডিপথেরিয়ায় আক্রান্ত রোগী শনাক্ত হয়েছে। রাজধানীর একাধিক হাসপাতালেও এ রোগে আক্রান্তদের চিকিৎসা দেওয়া হয়েছে।
আইইডিসিআরের সার্ভিল্যান্স তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের ২২ জানুয়ারি সিলেট ও হবিগঞ্জে, ২২ ফেব্রুয়ারি রাজধানীর সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতাল (আইডিএইচ)-এ এবং ২৫ মার্চ কামরাঙ্গীরচরে ডিপথেরিয়া রোগী শনাক্ত হয়। এছাড়া ২০২৫ সালের আগস্ট ও সেপ্টেম্বর মাসে রাজধানীর বিভিন্ন হাসপাতালে আরও কয়েকজন রোগী চিকিৎসা নেন। ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসা নেওয়া এক রোগীর সংক্রমণের উৎস ছিল কিশোরগঞ্জ।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এগুলো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়; বরং দেশে ডিপথেরিয়ার নীরব বিস্তারের ইঙ্গিত বহন করছে।
রোহিঙ্গা ক্যাম্প থেকেই বড় প্রাদুর্ভাব
ডিপথেরিয়ার বড় আকারের প্রাদুর্ভাব প্রথম দেখা যায় ২০১৭ সালে কক্সবাজার রোহিঙ্গা ক্যাম্প এলাকায়। ওই বছরের নভেম্বর থেকে ডিসেম্বরের মধ্যে সেখানে ১৫ জনের মৃত্যুসহ ৮০৪ জন সন্দেহভাজন রোগী শনাক্ত হয়। প্রথম রোগী শনাক্ত হয় আন্তর্জাতিক মানবিক সংস্থা মেদসাঁ সঁ ফ্রঁতিয়ের (এমএসএফ) পরিচালিত একটি ক্লিনিকে।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা তখন জানিয়েছিল, আক্রান্তদের ৭৩ শতাংশের বয়স ছিল ১৫ বছরের নিচে এবং মারা যাওয়া ১৫ জনের মধ্যে ১৪ জনই ছিল শিশু। সংস্থাটি সতর্ক করেছিল, ঘনবসতি, অপুষ্টি এবং কম টিকাগ্রহণ পরিস্থিতিকে আরও ভয়াবহ করে তুলতে পারে।
বিশেষজ্ঞদের অভিযোগ, আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর সেই সতর্কবার্তার পরও দেশে দীর্ঘমেয়াদি প্রতিরোধমূলক পরিকল্পনা নেওয়া হয়নি।
হামের পর পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হতে পারে
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ডিপথেরিয়ার বিস্তার রোধে জরুরি ভিত্তিতে আক্রান্ত ও ঝুঁকিতে থাকা শিশুদের টিকাদান এবং বুস্টার ডোজ নিশ্চিত করতে হবে। বিশেষ করে যেসব শিশু নিয়মিত টিকাদান কর্মসূচির বাইরে রয়েছে, তাদের দ্রুত আওতায় আনতে হবে। একই সঙ্গে স্কুলভিত্তিক বিশেষ টিকাদান ক্যাম্পেইন পরিচালনার ওপরও গুরুত্বারোপ করেছেন তারা।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. আহমদ পারভেজ জাবীন চ্যানেল আই অনলাইনকে বলেন, ডিপথেরিয়া প্রতিরোধে আক্রান্ত শিশুদের টীকা ও বুস্টার ডোজের ব্যবস্থা করতে হবে। দেশে চলমান হাম পরিস্থিতি মোকাবিলায় একটি জাতীয় হাম প্রতিরোধ কমিটি গঠন করা প্রয়োজন। এই কমিটিতে জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ, শিশু বিশেষজ্ঞ, সংক্রামক রোগ বিশেষজ্ঞ এবং স্বাস্থ্য প্রশাসনের প্রতিনিধিদের অন্তর্ভুক্ত করে সমন্বিত পরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে।
উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স, জেলা সদর হাসপাতাল এবং দেশের সব সরকারি-বেসরকারি হাসপাতালে জাতীয় কমিটির গৃহীত একই ধরনের চিকিৎসা নির্দেশনা ও ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করতে হবে, যাতে আক্রান্ত শিশুরা দ্রুত ও সঠিক চিকিৎসাসেবা পায়।
পাশাপাশি প্রয়োজনীয় টিকা, অ্যান্টিটক্সিন, অ্যান্টিবায়োটিক ও আইসোলেশন সুবিধা পর্যাপ্ত রাখতে এখনই কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া জরুরি।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ও আইইডিসিআরের উপদেষ্টা ড. মুশতাক হোসেন বলেন, হাম-পরবর্তী দুর্বল রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতার কারণে ডিপথেরিয়া ছড়িয়ে পড়লে ভয়াবহ পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে। ঝুঁকি কমাতে জরুরি ভিত্তিতে বুস্টার ডোজ ও স্কুলভিত্তিক টিকাদান ক্যাম্পেইন চালু করা প্রয়োজন।
কী এই ডিপথেরিয়া?
ডিপথেরিয়া হলো করিনেব্যাকটেরিয়াম ডিপথেরিয়া নামের একটি গ্রাম-পজিটিভ ব্যাকটেরিয়া দ্বারা সৃষ্ট অত্যন্ত সংক্রামক রোগ। এটি মূলত গলা, নাক ও শ্বাসতন্ত্রকে আক্রান্ত করে।
রোগটি শরীরে টক্সিন বা বিষাক্ত পদার্থ তৈরি করে গলায় ধূসর রঙের পুরু আস্তরণ সৃষ্টি করে, যার ফলে শ্বাসকষ্ট, গিলতে সমস্যা, এমনকি হৃদ্যন্ত্র ও স্নায়ুতন্ত্রের জটিলতা দেখা দিতে পারে।
ঐতিহাসিকভাবে এই রোগকে “শিশুদের শ্বাসরোধকারী দেবদূত” নামেও অভিহিত করা হতো।
বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকরা বলছেন শিশুদের নিয়মিত টিকাদান কর্মসূচির অধীনে ডিপিটি ও পেন্টাভ্যালেন্ট টিকা প্রদান এবং হাঁচি-কাশির সময় মুখ ঢেকে রাখার মাধ্যমে এ রোগের ঝুঁকি এড়ানো সম্ভব।
ডিপথেরিয়ার প্রধান লক্ষণ
গলা ব্যথা, জ্বর, ঘাড় ফুলে যাওয়া, গলায় ধূসর আস্তরণ, শ্বাসকষ্ট এবং দুর্বলতা ও ক্লান্তি। রোগটি আক্রান্ত ব্যক্তির হাঁচি-কাশি, সরাসরি সংস্পর্শ কিংবা ব্যবহৃত জিনিসপত্রের মাধ্যমে ছড়ায়।
সবচেয়ে ঝুঁকিতে কারা?
বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের মতে, নিচের ব্যক্তিরা সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে রয়েছেন—টিকা না নেওয়া শিশু, অপুষ্টিতে ভোগা শিশু, জনাকীর্ণ এলাকায় বসবাসকারী মানুষ, রোহিঙ্গা ক্যাম্প ও বস্তি এলাকার বাসিন্দারা এবং স্বাস্থ্যকর্মী ও আক্রান্তের সংস্পর্শে আসা ব্যক্তি।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের রোগ নিয়ন্ত্রণ শাখার সাবেক পরিচালক অধ্যাপক ডা. বে-নজির আহমেদ বলেন, ডিপথেরিয়ার চিকিৎসার ওষুধ এখন বিরল। দ্রুত ব্যবস্থা না নিলে হামের পর নতুন সংক্রামক সংকটে পড়তে পারে বাংলাদেশ।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সুপারিশ
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ডিপথেরিয়া নিয়ন্ত্রণে কয়েকটি জরুরি পদক্ষেপের ওপর জোর দিয়েছে—দ্রুত রোগ শনাক্তকরণ, ডিপথেরিয়া অ্যান্টিটক্সিন নিশ্চিত করা, অ্যান্টিবায়োটিক সরবরাহ বাড়ানো, জরুরি টিকাদান কর্মসূচি চালু, আক্রান্তের সংস্পর্শে আসা ব্যক্তিদের পর্যবেক্ষণ এবং শিশু ও স্বাস্থ্যকর্মীদের অগ্রাধিকারভিত্তিতে টিকা প্রদান।
যা বললেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী
এ বিষয়ে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণমন্ত্রী সরদার সাখাওয়াত হোসেন বকুল বলেন, “ডিপথেরিয়ার বিষয়টি সম্পর্কে আমি অবগত। করণীয় নিয়ে আমরা ভাবছি।”
তবে জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধু চিন্তা নয়—এখন প্রয়োজন দ্রুত ও সমন্বিত উদ্যোগ। কারণ, হামের চাপের মধ্যেই যদি ডিপথেরিয়া ব্যাপক আকারে ছড়িয়ে পড়ে, তাহলে দেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থা নতুন এক বড় সংকটের মুখে পড়তে পারে।




