যুক্তরাষ্ট্র ও সৌদি আরব একটি যুগান্তকারী বেসামরিক পারমাণবিক সহযোগিতা চুক্তিতে স্বাক্ষর করেছে। এই চুক্তির মাধ্যমে সৌদি আরবের পারমাণবিক জ্বালানি কর্মসূচি গড়ে তোলার পথ খুলে যাবে এবং দেশটির পারমাণবিক খাতে মার্কিন কোম্পানিগুলোর বড় ধরনের বিনিয়োগের সুযোগ সৃষ্টি হবে।
বৃহস্পতিবার (২৩ জুলাই) এ তথ্য জানিয়েছে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম বিবিসি।
মার্কিন জ্বালানি বিভাগ চুক্তিটিকে ‘শান্তিপূর্ণ পারমাণবিক সহযোগিতা চুক্তি’ হিসেবে উল্লেখ করে জানিয়েছে, এটি সৌদি আরবের বেসামরিক পারমাণবিক কর্মসূচিতে মার্কিন প্রযুক্তি ও বিনিয়োগের ভিত্তি তৈরি করবে। একই সঙ্গে একটি পৃথক ‘দ্বিপক্ষীয় নিরাপত্তা চুক্তি’ও স্বাক্ষর হয়েছে। বিভাগটির ভাষ্য মতে, দুটি চুক্তি মিলিয়ে আগামী এক দশকের জন্য বহু বিলিয়ন ডলারের অংশীদারত্বের আইনি কাঠামো তৈরি হয়েছে, যা জ্বালানি, অর্থনীতি, নিরাপত্তা এবং পারমাণবিক অস্ত্র বিস্তার রোধে সহযোগিতা জোরদার করবে। যদিও চুক্তির পূর্ণাঙ্গ পাঠ প্রকাশ করা হয়নি, মার্কিন সংবাদমাধ্যমগুলোর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ভবিষ্যতে সৌদি আরবকে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধ করার অনুমতি দেওয়া হতে পারে। এই প্রযুক্তি বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য প্রয়োজনীয় পারমাণবিক জ্বালানি তৈরিতে ব্যবহৃত হলেও একই সঙ্গে পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির সক্ষমতার সঙ্গে সম্পর্কিত হওয়ায় বিষয়টি নিয়ে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, যুক্তরাষ্ট্র এর আগে কোনো দেশকে নিজস্ব ভূখণ্ডে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধ করার সক্ষমতা গড়ে তুলতে সহযোগিতা করেনি। ফলে এই চুক্তি কার্যকর হলে তা মধ্যপ্রাচ্যে পারমাণবিক অস্ত্র বিস্তারের ঝুঁকি বাড়াতে পারে। সৌদি সরকার এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, এই চুক্তি দুই দেশের বিদ্যমান জ্বালানি সহযোগিতার সম্প্রসারণ। গত নভেম্বরে সৌদি নেতৃত্বের ওয়াশিংটন সফরের ধারাবাহিকতায় এটি চূড়ান্ত হয়েছে বলে উল্লেখ করা হয়। চুক্তির ঘোষণা এমন সময়ে এলো, যখন যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে সামরিক উত্তেজনা তীব্র আকার ধারণ করেছে। একই সময়ে ইরান-সমর্থিত ইয়েমেনের হুথি বিদ্রোহীরা সৌদি আরবের বিরুদ্ধে সামুদ্রিক অবরোধ ঘোষণা করেছে।
মার্কিন জ্বালানি সচিব ক্রিস রাইট বলেন, এই চুক্তিতে পারমাণবিক নিরাপত্তা ও অস্ত্র বিস্তার রোধের সর্বোচ্চ মান বজায় রাখা হয়েছে। পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্রের উন্নত প্রযুক্তি ও বৈজ্ঞানিক দক্ষতা সৌদি কর্মসূচিতে ব্যবহার করা হবে। তবে ইসরায়েলের কয়েকজন সাবেক কর্মকর্তা ও পারমাণবিক বিশেষজ্ঞ আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন, ভবিষ্যতে সৌদি আরব পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির সক্ষমতা অর্জন করতে পারে। যদিও তাদের মতে, এমন সক্ষমতা অর্জনে কয়েক দশক সময় লাগতে পারে এবং আন্তর্জাতিক পর্যায়ে নানা বাধার মুখে পড়তে হবে।
যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান ডিফেন্স প্রায়োরিটিজের মধ্যপ্রাচ্য কর্মসূচির পরিচালক রোজমেরি কেলানিক বলেন, চুক্তিতে যদি ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধ করার অনুমতি থাকে, তাহলে সেটি হবে অত্যন্ত ব্যতিক্রমী সিদ্ধান্ত। কারণ নিজস্ব পারমাণবিক জ্বালানি উৎপাদনের সক্ষমতা ভবিষ্যতে অস্ত্র তৈরির ঝুঁকিও বাড়ায়। চুক্তিটি এখন মার্কিন কংগ্রেসের অনুমোদনের জন্য পাঠানো হবে। রিপাবলিকানরা কংগ্রেসের উভয় কক্ষে সংখ্যাগরিষ্ঠ হলেও ডেমোক্র্যাটদের পাশাপাশি কয়েকজন রিপাবলিকান আইনপ্রণেতাও এর বিরোধিতা করতে পারেন বলে ধারণা করা হচ্ছে। মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও সমালোচনার জবাবে বলেন, যুক্তরাষ্ট্র এমন কোনো চুক্তি করবে না, যা পারমাণবিক অস্ত্র বিস্তারের ঝুঁকি তৈরি করে।
অন্যদিকে ম্যাসাচুসেটসের ডেমোক্র্যাট সিনেটর এডওয়ার্ড মার্কি ট্রাম্প প্রশাসনের সমালোচনা করে বলেন, একদিকে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচির বিরোধিতা করা হচ্ছে, অন্যদিকে সৌদি আরবকে এমন প্রযুক্তি দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে, যা ভবিষ্যতে অস্ত্র তৈরির সক্ষমতা বাড়াতে পারে।
বিশ্লেষকদের মতে, এই চুক্তির মাধ্যমে সৌদি আরব কৌশলগতভাবে বড় সুবিধা পেলেও এর প্রভাব শুধু জ্বালানি খাতেই সীমাবদ্ধ থাকবে না। মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা, আঞ্চলিক শক্তির ভারসাম্য এবং বৈশ্বিক পারমাণবিক অপ্রসারণ ব্যবস্থার ওপরও এর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব পড়তে পারে।


