মুর্তজা বশীর: ধ্রুপদি ধ্যানের শিল্পী

মুর্তজা বশীর: ধ্রুপদি ধ্যানের শিল্পী

তিনি প্রেরণাবাদী, তবু শক্ত কবজিতে লাগাম ধরে সৃষ্টির ধূম্রদেশে পঙ্খিরাজে উড্ডীন থেকেছেন। রেখা তার সর্পিল হলেও শিথিল হয়নি, রং তার বস্তুর সাদৃশ্যের অনুগামী নয়, জ্যামিতির নিগড় খোঁজে। বিশ্বাসের জগতে একটা দাপাদাপি আছে। সেই দাপাদাপি ব্যাপক ভুবনজুড়ে। জগৎ-সংসারে নানা আস্থা ও অনাস্থা, বস্তুগত ও বস্তু-উত্তীর্ণ, ধরা ও অধরা, আছে ও নেই, প্রাচ্য ও পশ্চিম, মিল ও অমিল—এমন অনেক ঠিকানা আছে তাঁর, তবে একক গন্তব্য নেই। তিনি আবারও ঘুরে দেখতে চান, নিজেকে খুঁড়ে দেখতে চান আরেকটু।

তিনি ‘দুরন্ত শিশু’, ফরাসিতে যাকে বলে ‘অফ তেরিবল’। বাবা বলেছিলেন, ‘আলীগড়ে যাও।’ তিনি বলেছিলেন, ‘না, আর্ট কলেজ।’ উত্তীর্ণ-কৈশোরেই তিনি কমিউনিজমের মন্ত্রণায় দুরন্ততর হয়ে উঠেছিলেন। তবে আরও অনেক প্রতিভাবান শিল্পীর মতো শিশুবেলা থেকেই তাঁর আঁকার হাত ভালো ছিল না, ইশকুলে ড্রয়িংয়ে গোল্লা পেতেন। তাঁর রাজনীতি তাঁকে নির্দেশ দিল—পোস্টার লেখো, মানুষের দুর্দশা আঁকো। ১৯৫২-এর ভাষাশহীদ বরকতের গুলিবিদ্ধ লাশ বুকে জড়িয়ে ধরেছিলেন আর্ট কলেজের তৃতীয় বর্ষের ছাত্র মুর্তজা বশীর। শহীদের রক্তমাখা দেহে পুত্র বাসায় ফিরলে জ্ঞানতাপস পিতা ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ গরীয়ান হয়ে যান। তাঁর কালো আচকান কেটে পুত্রকে তিনি বলেন, ‘আমার বাহুতে বেঁধে দাও শোকের কালো কাপড়।’ অনেক নাটকীয় সংঘাতে আহত-বিক্ষত হয়ে অনেক লোমহর্ষক ঘটনার মধ্য দিয়ে নিজেকে চালিত করে শিল্পী মুর্তজা বশীর বুঝেছেন, জীবন পরিণামে আশায় বেঁচে থাকে, স্বপ্ন ও স্বপ্নভঙ্গে অভিজ্ঞ হয়, কিন্তু আত্মরতিতে সব তুচ্ছ হয়ে যায়। শিল্পের আইডিয়া-অভিযানে তিনি জীবন সচল রেখেছেন; সরল পথের অভ্যস্ততা তাঁকে আকর্ষণ করেনি, বাঁক ফিরিয়ে নতুন জগৎ দেখেছেন, নিজেকে যে নতুন বিস্ময়ে নতুন শক্তিতে পরখ করা যায় এই ধ্রুবত্বে অচঞ্চল থেকেছেন।

Scroll to Top