নেপালের হিমালয় অঞ্চলে ভয়াবহ আকস্মিক বন্যা ও ভূমিধসে ১৬২ জনের বেশি মানুষ নিহত এবং অন্তত ৪০০ জন নিখোঁজ হওয়ার পর হিমবাহ ধস নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, হিমবাহের বড় কোনো অংশ হঠাৎ ভেঙে পড়া, নিচে নেমে যাওয়া বা ঢাল বেয়ে সরে যাওয়ার ঘটনাই হিমবাহ ধস। এমন ঘটনা পাহাড়ি এলাকায় ভয়াবহ বন্যা, ভূমিধস এমনকি সুনামিও সৃষ্টি করতে পারে।
বৃহস্পতিবার ২৭ আগস্ট ফক্স ওয়েদারের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মঙ্গলবার স্থানীয় সময় সকাল সাড়ে ৮টার দিকে নেপালের ভোতে কোশি নদী দিয়ে ভয়াবহ বন্যার স্রোত নেমে আসে। এতে ভবন ধ্বংসের পাশাপাশি সড়ক, সেতু, বিদ্যুৎ ও যোগাযোগ অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

প্রাথমিকভাবে ঘটনাটিকে ভূমিকম্প বলে ধারণা করা হলেও পরে যুক্তরাষ্ট্রের ভূতাত্ত্বিক জরিপ সংস্থা (ইউএসজিএস) বিশ্লেষণ করে জানায়, ভূমিকম্প নয়, একটি ভূমিধস থেকেই ভূকম্পন সৃষ্টি হয়েছিল। ভূমিধসের ফলে সৃষ্ট কম্পনের শক্তি ৫ দশমিক ২ মাত্রার ভূমিকম্পের সমান ছিল।
কীভাবে হিমবাহ ধস ঘটে?
হিমবাহের বড় একটি অংশ হঠাৎ ভেঙে পড়া বা ঢাল বেয়ে নিচে নেমে যাওয়াকে হিমবাহ ধস বলা হয়। বরফ গলে যাওয়া, হিমবাহের ভেতরে ফাটল তৈরি হওয়া এবং পাহাড়ি ভূখণ্ডের অস্থিতিশীলতা এ ধরনের ধসের অন্যতম কারণ হতে পারে।
হিমবাহের সঙ্গে বিপুল পরিমাণ পাথর, মাটি ও অন্যান্য ধ্বংসাবশেষ নিচে নেমে এলে সেগুলো নদী বা জলাধারে পড়ে পানির প্রবাহ কয়েক গুণ বাড়িয়ে দিতে পারে। এর ফলে অল্প সময়ের মধ্যে ভয়াবহ আকস্মিক বন্যা তৈরি হতে পারে।
ডান্ডি বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূবিজ্ঞানী ও জ্যেষ্ঠ প্রভাষক ড. সাইমন কুক বলেন, ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় আগাম সতর্কতাব্যবস্থা স্থাপন করা সম্ভব। এর মধ্যে টাইম-ল্যাপস ক্যামেরা, ভূকম্পন পরিমাপক যন্ত্র এবং মোবাইল ফোনের মাধ্যমে সতর্কবার্তা পাঠানোর ব্যবস্থা থাকতে পারে। তবে দুর্গম পাহাড়ি এলাকায় মোবাইল নেটওয়ার্ক না থাকায় এ ধরনের ব্যবস্থা বাস্তবায়ন কঠিন হতে পারে।
সুইজারল্যান্ডেও ঘটেছিল একই ধরনের ঘটনা
গত বছর দক্ষিণ-পশ্চিম সুইজারল্যান্ডে বার্চ হিমবাহ থেকে বরফ ও পাথরের বিশাল স্তূপ নিচের উপত্যকায় নেমে আসে। এতে ব্লাটেন গ্রাম প্রায় মাটি ও ধ্বংসাবশেষের নিচে চাপা পড়ে এবং লোনজা নদীর প্রবাহ বন্ধ হয়ে যায়।
নাসার তথ্য অনুযায়ী, একটি ভেঙে পড়া পাহাড়ের চূড়া থেকে পাথর গড়িয়ে হিমবাহের ওপর জমা হয়েছিল। পরে এসব ধ্বংসাবশেষ ক্লেইনার নেস্টহর্ন শৃঙ্গ থেকে উপত্যকার দক্ষিণ দিকে নেমে এসে ব্লাটেন এলাকায় আঘাত হানে। আগেই গ্রামের বাসিন্দাদের সরিয়ে নেওয়া হয়েছিল। তবে একজন ব্যক্তি নির্ধারিত নিরাপদ এলাকার বাইরে অবস্থান করায় মারা যান।
হিমবাহ ধস থেকে সুনামিও হতে পারে
শুধু বন্যা নয়, হিমবাহ বা ভূমিধসের বিপুল পরিমাণ ধ্বংসাবশেষ পানিতে আছড়ে পড়লে বিশাল ঢেউ বা মেগাসুনামিও সৃষ্টি হতে পারে।
যুক্তরাষ্ট্রের আলাস্কার ট্রেসি আর্ম এলাকায় এমন একটি ঘটনা ঘটে। সেখানে নরম হয়ে আসা একটি হিমবাহের ওপরের পাহাড় থেকে ভূমিধস হয়ে বিপুল পরিমাণ ধ্বংসাবশেষ পানিতে পড়ে। এতে প্রায় ৪৮১ মিটার বা ১ হাজার ৫৭৮ ফুট উচ্চতার একটি বিশাল ঢেউ সৃষ্টি হয়।
গবেষকদের মতে, ওই ঢেউ ছিল রেকর্ড করা ইতিহাসের দ্বিতীয় বৃহত্তম সুনামি তরঙ্গ।
জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে হিমবাহ ও পাহাড়ি ভূপ্রকৃতিতে পরিবর্তন বাড়ছে। ফলে বিজ্ঞানীরা হিমবাহ, পাহাড়ের ঢাল এবং আশপাশের ভূখণ্ডে অস্থিতিশীলতার লক্ষণগুলো পর্যবেক্ষণ করছেন। তবে দুর্গম পাহাড়ি এলাকায় হিমবাহ ধসের মতো আকস্মিক ঘটনা শনাক্ত করা এবং দ্রুত মানুষকে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়া এখনও বড় চ্যালেঞ্জ।