নজরুল বনাম বৃটিশ সরকার: ধুমকেতুর আগুনে রাষ্ট্রদ্রোহের মামলা! | চ্যানেল আই অনলাইন

দ্রোহের কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিপ্লবে বিদ্রোহের ঝঞ্ঝাবায়ু হয়ে উঠেন সেই উনিশ শতকের দ্বিতীয় দশকে। বৃটিশ উপনিবেশিক শাসকদের বিরুদ্ধে তাঁর লেখনিতে সোচ্ছার হলে কারাগারের অন্ধকার প্রকোষ্ঠে নিক্ষেপিত হয়েছেন। কারণ তিনিই প্রথম ব্যক্তি নিজ সাহিত্যের সৃজনে লিখিতভাবে ভারতবর্ষের স্বাধীনতার দাবি তুলে ছিলেন। ভারতের পূর্ণ স্বাধীনতার জন্য সমগ্র জাতিকে সংগ্রামের পথে আহ্বান জানান।

তিনি তাঁর ‘আনন্দময়ীর অগমনে’ কবিতায় নানান মিথ ও পুরাণের কাল্পনিক শব্দের ব্যবহারে বৃটিশ শাসনে-শোষণে পিষ্ট ভারতবর্ষের স্বাধীনতার ডাক দিয়ে বৃটিশ শাসকদের রোষানলে পড়েন।

উনিশ শতকের বিশের দশক। বিশ্বময় তখন ব্যাপক অস্থিরতা। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের ডামাডোলে বৈশ্বিক রাজনীতিতে বিভক্তি। দেশে দেশে স্লোগান মূখরতায় জাতীয়তাবাদী চেতনার উত্থান। সুতরাং সেই বৈশ্বিক অগ্নিগর্ভ সময়ে সাম্রাজ্যবাদী উপনিবেশবাদের আগ্রাসী শাসক বৃটিশ বেনিয়ারা নজরুলের স্বাধীনতার দাবি তোলাটা ভালো চোখে দেখেনি। কেননা তারুণ্যের কবি নজরুল ইসলাম, তাঁর লেখনির শক্তিতে ক্ষমতায়-রাষ্ট্রক্ষমতার বলে পুরো ভারতবর্ষের অধিশ্বর ইংরেজ শাসককূলের এক প্রতিপক্ষ হয়ে উঠেন। সুতরাং তরুণ কবি সাংবাদিক নজরুলকে রাষ্ট্রদ্রোহের অপরাধে অভিযুক্ত করে কারারুদ্ধ করে। সেই দীর্ঘ কারাবাসে তাঁর জন্য নিশ্চিত ছিল না নিয়মমাফিক ফৌজাদারি বিচারপ্রক্রিয়া এমনকি জেল কোডের নিয়ম ও ন্যাযতাও যথাযথ বিবেচনা করা হয়নি।

যদিও সেই ১৯২০ সালে তাঁর আগের কর্মস্থল সান্ধ্য দৈনিক ‘নবযুগ’র সম্পাদকীয়তে চাঁচাছোলা ভাবেই তিনি ভারতের স্বাধীনতার প্রশ্নে খোলামেলা ভাবে কলম ধরেন। সেই সময়ে তাঁর সকল প্রবন্ধে পরাধীন ভারতবর্ষের স্বাধীনতার আন্দোলন নিয়ে গণমানুষদের জাগরণে মানুষের বোধে ধাক্কা দেওয়ার কাজটি তিনি অব্যাহতভাবেই করে আসছিলেন।

তাঁর সেই প্রবন্ধের বিষয়বস্তু হতো: রুশ বিপ্লব, আয়ারল্যান্ডের স্বাধীনতা, আধুনিক তুরস্কের উত্থান। বৈশ্বিক এই রাজনৈতিক ঘটনা প্রবাহের সাথে ভারতবর্ষের জনমানুষের মুক্তির সংগ্রামকে একাকার করে তুলে ধরেন কাজী নজরুল ইসলাম। সুতরাং তাঁর ওই সকল সম্পাদকীয় প্রবন্ধের কারণে পত্রিকার ডিক্লেয়ারেশনের জন্য জামানত বাবদ এক হাজার টাকা বাজেয়াপ্ত করে বৃটিশ সরকার। ইন্টেলিজেন্স ব্রাঞ্চ নজরুলের লেখালেখির উপর নজরদারি করে রীতিমতো ফাইল খুলে। গোয়েন্দা নজরদারিতে চলে নজরুল ইসলামের লেখালেখির নিবিড় পর্যবেক্ষণ।

এরপর ১৯২২ সালে ২৬ সেপ্টেম্বর ২০২২ এর সাপ্তাহিক পত্রিকা ‘ধুমকেতুর’ ১২ আশ্বিন সংখ্যায় তাঁর ‘আনন্দময়ীর আগমনে’ একটি দীর্ঘ কবিতা প্রকাশিত হলে বৃটিশ সরকার তাঁর বিরুদ্ধে আরও কঠোর অবস্থান নেয়। ‘আনন্দময়ীর আগমনে’ কবিতাটি বিপ্লবীদের দারুণভাবে অনুপ্রাণিত করেছে। এই বিবেচনায় বৃটিশ শাসক-শোষকেদের এদেশীয় তাবেদার ও রাজকর্মচারিরা ইংরেজিতে অনুবাদ করে নজরুলের কবিতার ভাব গভীরতার বিষয়টি বৃটিশ শাসকদের কাছে তুলে ধরে। একারণে সহজেই বৃটিশ শাসক ভাইসরয় লর্ড রিডিংয়ের কার্যালয় সহজেই নজরুল ইসলামের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রদ্রোহ মামলার অনুমোদন দেয়।

তৎকালীন বাংলা সরকারের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রক “ধুমকেতুর” বিরুদ্ধে রাষ্ট্রদ্রোহ মামলা করে অনায়াসে। এই মামলা ফৌজদারি কার্যবিধির-১৮৯৮’র ১৫৩ধারা এবং ভারতীয় দণ্ডবিধির-১৮৬০’র ১২৪’ ক ধারার আওতায় কলকাতা চিপ প্রেসিডেন্সি ম্যাজিস্ট্রেটের কোর্টে মামলা দায়ের হয়।

কাজী নজরুল ইসলাম আত্মগোপনে গেলেও শেষ রক্ষা হয়নি। ১৯২২ সালের ২৩ নভেম্বর বিকেলে কুমিল্লার শহরের কান্দিরপাড় পুলিশ লাইন সড়ক থেকে গ্রেপ্তার হন কাজী নজরুল ইসলাম। তিনি ১৯২২ সালে ২৪ শে নভেম্বর থেকে ১৯২৩ সালের ১৭ জানুয়ারি নজরুল ইসলাম এক বছর ২৫ দিন বিচারাধীন কারাবন্দি হিসেবে রাজবন্দি ছিলেন। কারারুদ্ধ দিনে তিনি দফায় দফায় রাজবন্দি হিসেবে নানান নিয়মের ব্যত্যয়ের শিকার হন। সেই সময় জেলের নিয়মমত বিচারাধীন রাজবন্দিদের বিচার শেষে দণ্ডিত রাজবন্দিদের কলকাতার আলিপুর সেন্ট্রাল জেলে পাঠানোর নিয়ম ছিল। কারাবিধি অনুযায়ী নজরুল ইসলামকেও ১৮ই জানুয়ারি সকালে বিশেষ প্রথম শ্রেণীর কয়েদির মর্যাদায় আলিপুর জেলে সেন্ট্রাল জেলে স্থানান্তর করা হয়।

তবে এর তিন মাস পরে ১৯২৩ সালের ১৪ এপ্রিল নজরুল ইসলামকে আলিপুর সেন্ট্রাল জেল থেকে বহরমপুর জেলে পাঠানোর নামে মিথ্যাচার করে কারা কর্তৃপক্ষ। মূলত তাকে সাধারণ কয়েদি হিসেবে পাঠানো হয় হুগলি জেলে তবে তা গোপন রাখা হয়। হুগলি জেলে স্থানন্তের সময় নজরুল ইসলামকে উত্তর চব্বিশ পরগনা জেলার নৈহাটি জংশন রেলওয়ে স্টেশনে ট্রেন থেকে নামিয়ে সাধারণ কয়েদির ইউনির্ফম ও খাটো কোর্তা পরানো হয়। বিষয়টি নজরুল ইসলামকে একজন রাজবন্দির মর্যদা থেকে জেল ও কারা বিধি অমান্য করে একেবারে সাধারণ কয়েদির মর্যদায় নামিয়ে আনে কারাকতৃর্পক্ষ। বিষয়টি নজরুল ইসলামকে গভীরভাবে বেদনাহত করে।

সেখান থেকে ব্যান্ডেলের ট্রেনে উঠিয়ে হুগলিঘাট রেলওয়ে স্টেশনে ট্রেন থেকে নামিয়ে দেওয়া হয় হুগলি জেলে। হুগলিঘাট রেলওয়ে স্টেশনটি ছিল খুব উঁচু ব্রিজের ওপরে। হুগলি ডিস্ট্রিক জেলে স্থানান্তিত করে কাজী নজরুল ইসলামসহ অন্যদের রাজবন্দির মর্যাদা কেড়ে নিয়ে সাধারণ কয়েদির খাবার, পোশাক, খাটো কুর্তা, লোহার থালায় খাবার দেওয়া ছাড়াও নানান নিপীড়ন করা হতে থাকে।

প্রথমত: রাজবন্দি হিসেবে মর্যদা কেড়ে নেওয়া হলো। উপরন্ত বন্দিদের স্বজনেরা জানলেন নজরুল ইসলামকে নেওয়া হয়েছে বহরমপুর জেলে। কিন্তু মিথ্যাচার করে তাঁকে পাঠানো হয়েছিল হুগলি জেলে। রাজবন্দির মর্যাদা কেড়ে নিয়ে দাগী অপরাধীর মত ডাণ্ডাবেড়ি, নানান শৃঙ্খল ও বন্ধন এবং ইচ্ছামত সাজার মেয়াদ বৃদ্ধি, নির্জন সেলে স্থানান্তর, পশু খাদ্যের মাড়ভাত সরবরাহ করার মত নানান ভাবে নজরুল ইসলামের উপর চালানো হয় নানান নির্যাতন।

সঙ্গত কারণেই নজরুলসহ আর সকল রাজবন্দিরা রাগে-ক্ষোভে পুষছিলেন। এর মধ্যে অত্যন্ত নির্দয় নিষ্ঠুর প্রকৃতির তোষামোদ প্রিয় হুগলি জেল সুপার সাদা চামড়ার বৃটিশ বেনিয়ার প্রতিনিধি থার্সটনের অত্যাচার মাত্রাছাড়া হয়ে উঠে। সুতরাং কাজী নজরুল ইসলাম অনশন শুরু করেন।

তাঁর আমরণ অনশনের খবরে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়, দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাশ, নলিনীকান্ত সরকার, পবিত্র গঙ্গোপাধ্যায়, প্রফুল্লচন্দ্র রায়ের মত দেশবরেণ্য ব্যক্তিরা বিচলিত হয়ে পড়েন। তাঁরা কাজী নজরুল ইসলামকে অনশণ ভাঙ্গতে অনুরোধ করেন। ওই অনশণের খবরে ওই সময়ের ইংরেজি, বাংলা পত্রপত্রিকা, সাময়িকীতে ব্যাপক প্রতিক্রিয়া হয়। সমগ্র দেশে উঠে তীব্র প্রতিবাদের ঝড়।

বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ১৯২৩ সালের মে’ মাসের তৃতীয় সপ্তাহে কাজী নজরুল ইসলামকে অনশণ ভাঙ্গতে অনুরোধ জানিয়ে টেলিগ্রাম করেন। তিনি লেখেন ‘Give up hunger strike, Our Literature claims you’ অনশণ বন্ধ করো, আমাদের সাহিত্যে তোমাকে দরকার’!

রাজবন্দি নজরুল ইসলামকে নোবেল বিজয়ী কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তাঁর ‘বসন্ত’ নাটকটি উৎসর্গ করেন। আনন্দে আপ্লুত নজরুল ইসলাম লেখেন, ‘তাঁর এই আর্শীবাদ মালা পেয়ে আমি জেলের সব জ্বালা, যন্ত্রণা, অনশন, ক্লেশ ভুলে যাই। আমার মত নগন্য তরুণ কবিতা লেখককে কেন তিনি এত অনুগ্রহ ও আনন্দ দিয়েছিলেন তিনিই জানেন।’

পরবর্তীতে কাজী নসজরুল ইসলাম তাঁর জেল জীবনের স্মৃতি নিয়ে এব প্রবন্ধে এমন অভিব্যক্তির কথা তুলে ধরেন। সেই প্রবন্ধের শিরোনাম ছিল-‘বড়র পিরীতি বালির বাঁধ’ কেন দিয়েছিলেন।

মনে হতেই পারে সৃজনশীল কবি তাঁর প্রবন্ধের নাম কেন বাংলা বাকধারার গভীর মর্মস্পর্শী এমন এক বাক্যে লিখলেন? এই প্রশ্নের উত্তর খুজতে গিয়ে বাংলা বাকধারাটির ভাবার্থ দাঁড়ায় কি সেদিকে দৃষ্টি দিলে এর উত্তর মেলে। মূলত ‘বড়র পিরীতি বালির বাঁধ’ বাক্যটির মানে হলো ‘ক্ষমতাবান বা বড় মানুষের সাথে স্বার্থের কারণ গড়ে উঠা সম্পর্ক বিপদের সময়ে টেকে না। সেই বাস্তবতার কথায় মনে করিয়ে দেয় বাক্যটি।

‘বড়র পিরীতি বালির বাঁধ’ প্রবন্ধে কাজী নজরুল ইসলাম তাঁর আরেকটি স্মৃতি চারণে কি লিখেছেন তা উল্লেখ্য করাই যায়।
তিনি লিখছেন, ‘তখন আমি আলিপুর সেন্ট্রাল জেলে রাজবন্দি। এরই মধ্যে একদিন এসিট্যান্ট জেলার এসে খবর দিলেন, কি মশাই, আপনি তো নোবেল প্রাইজ পেয়ে গেলেন। আপনাকে রবি ঠাকুর তাঁর “বসন্ত” নাটক উৎসর্গ করেছেন।’

কবি আরও লিখছেন, আমার পাশেই দাঁড়িয়েছিলেন আরও দু-একজন কাব্য বাতিকগ্রস্ত রাজকয়েদী। সেদিন আমার চেয়েও বেশি হেসেছিলেন তারা। আনন্দে নয়, বরং যা নয় তাই শুনে। কিন্তু ঐ আজগুবী গল্পও সত্যি হয়ে গেল। বিশ্বকবি সত্যিই আমার ললাটে অলক্ষুণের তিলকরেখা এঁকে দিলেন। এরপর থেকে আমার অতি অন্তরঙ্গ রাজবন্দি বন্ধুরাও আমার দিক থেকে মুখ ফিরিয়ে বসলেন। জেলের ভেতরে থেকেই শুনতে পেলাম, বাইরেও একটা বিপুল ঈর্ষা সিন্ধু ফেনায়িত হয়ে উঠেছে।

কবি আরও লিখেছেন, ‘পুলিশের জুলুম আমার গা সওয়া হয়ে গেছে। ওদের জুলুমের তবু একটা সীমারেখা আছে। কিন্তু সাহিত্যিক যদি জুলুম করতে শুরু করে, আর তার পারাপার নেই। এরা তখন হয়ে উঠে, টিকটিকে পুলিশের চেয়েও রুঢ়, অভদ্র।”

(এই বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)

Scroll to Top