
ঢাকা, ৬ মে – দেশে হাম ও হামের উপসর্গ নিয়ে মৃত্যুর মিছিল থামছেই না। গত ২৪ ঘণ্টায় সারা দেশে আরও ৭ জন শিশুর প্রাণহানি ঘটেছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সর্বশেষ প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত ১৫ মার্চ থেকে ৬ মে পর্যন্ত—অর্থাৎ মাত্র দেড় মাসে এই রোগে মোট ৩২৪ জন শিশু মৃত্যুবরণ করেছে। সংক্রমণের এই ঊর্ধ্বগতি জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের কপালে চিন্তার ভাঁজ ফেলেছে।
বুধবার (৬ মে) স্বাস্থ্য অধিদপ্তর থেকে প্রকাশিত বুলেটিনে জানানো হয়, গত একদিনে মৃত ৭ জনের মধ্যে ২ জনের ক্ষেত্রে নিশ্চিতভাবে হাম শনাক্ত করা হয়েছিল। বাকি ৫ জন মারা গেছে হামের উপসর্গ নিয়ে। একই সময়ে নতুন করে আক্রান্ত ও উপসর্গ নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে ১ হাজার ৬৫৪ জন শিশু।
গত ১৫ মার্চ থেকে ৬ মে সকাল ৮টা পর্যন্ত সংগৃহীত তথ্য বিশ্লেষণ করলে সংক্রমণের এক ভয়াবহ চিত্র ফুটে ওঠে:
- মোট মৃত্যু: ৩২৪ জন (এর মধ্যে ল্যাব পরীক্ষায় নিশ্চিত হামে ৫৬ জন এবং উপসর্গ নিয়ে ২৬৮ জন)।
- আক্রান্তের ধরন: নিশ্চিতভাবে হামে আক্রান্ত হয়েছে ৬ হাজার ৯৯ জন। অন্যদিকে, হামের লক্ষণ বা উপসর্গ নিয়ে চিকিৎসা নিয়েছে ৪৪ হাজার ২৬০ জন।
- বিভাগীয় প্রকোপ: সংক্রমণের হটস্পট হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে ঢাকা বিভাগ। মোট মৃত্যুর অর্ধেকের বেশি অর্থাৎ ১৬৩টি প্রাণহানি ঘটেছে এই বিভাগেই। সংক্রমণের হারও এখানে সর্বোচ্চ; প্রায় ২৪ হাজার ৫৭ জন শিশু এই বিভাগে আক্রান্ত বা উপসর্গযুক্ত হিসেবে শনাক্ত হয়েছে।
চিকিৎসকদের মতে, আক্রান্তের তুলনায় মৃত্যুর বড় একটি অংশ (প্রায় ৮২ শতাংশ) ঘটছে ‘হামের উপসর্গ’ নিয়ে। এটি ইঙ্গিত দেয় যে, অনেক শিশু হাসপাতালে পৌঁছানোর আগেই বা সঠিক রোগ নির্ণয়ের আগেই জটিল পর্যায়ে চলে যাচ্ছে। সাধারণত প্রচণ্ড জ্বর, সর্দি-কাশি এবং শরীরে লালচে দানার মতো র্যাশ হামের প্রধান লক্ষণ হলেও, জটিলতা বাড়লে তা নিউমোনিয়া বা মারাত্মক ডায়রিয়ার রূপ নিতে পারে, যা মূলত শিশুদের মৃত্যুর প্রধান কারণ হয়ে দাঁড়াচ্ছে।
বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, টিকাদানের ক্ষেত্রে কোনো ধরনের শিথিলতা বা নির্দিষ্ট কিছু এলাকায় টিকাদান কর্মসূচির আওতা কম থাকায় এই প্রাদুর্ভাব দেখা দিতে পারে। বিশেষ করে ঢাকা বিভাগে জনঘনত্ব বেশি হওয়ায় ভাইরাসের বিস্তার দ্রুত ঘটছে। এছাড়া আবহাওয়া পরিবর্তন এবং শিশুদের অপুষ্টিজনিত সমস্যার কারণে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমে যাওয়াও একটি বড় প্রভাবক হতে পারে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তর পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে নজরদারি বাড়িয়েছে। বিশেষ করে ঢাকা বিভাগে টিকাদান জোরদার এবং জনসচেতনতা বৃদ্ধিতে কাজ চলছে। স্বাস্থ্য কর্মকর্তাদের মতে, যদি কোনো শিশুর প্রচণ্ড জ্বরের সাথে শরীরে দানা দেখা দেয়, তবে দেরি না করে নিকটস্থ হাসপাতালে নেওয়া জরুরি।
গত ৪৫ দিনে ৩২৪ শিশুর মৃত্যু কেবল একটি সংখ্যা নয়, বরং জনস্বাস্থ্যের জন্য এটি একটি বড় সতর্কবার্তা। টিকাদান নিশ্চিত করার পাশাপাশি অভিভাবকদের সচেতনতাই পারে এই অনাকাঙ্ক্ষিত মৃত্যুর মিছিল থামাতে। বর্তমান পরিস্থিতিতে শিশুদের পুষ্টিকর খাবার নিশ্চিত করা এবং আক্রান্তদের অন্যদের থেকে আলাদা রেখে চিকিৎসা প্রদান করা অপরিহার্য হয়ে পড়েছে।
এনএন/ ০৬ মে ২০২৬






