টুথপেস্টে মাইক্রোপ্লাস্টিকের শঙ্কা, নতুন করে আলোচনায় নবীজির সুন্নাহ মিসওয়াক

টুথপেস্টে মাইক্রোপ্লাস্টিকের শঙ্কা, নতুন করে আলোচনায় নবীজির সুন্নাহ মিসওয়াক

আধুনিক জীবনকে সহজ ও আরামদায়ক করতে প্রতিনিয়ত যুক্ত হচ্ছে নতুন নতুন প্রযুক্তি ও পণ্য। কিন্তু এই অগ্রগতির সঙ্গে সঙ্গে সামনে আসছে নানা অদৃশ্য স্বাস্থ্যঝুঁকিও। সম্প্রতি বিশ্বের বিভিন্ন গবেষণা ও আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমে কিছু টুথপেস্টে মাইক্রোপ্লাস্টিকের উপস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে।

টুথপেস্টে মাইক্রোপ্লাস্টিক

অতি ক্ষুদ্র এই প্লাস্টিক কণাগুলো দীর্ঘমেয়াদে মানবস্বাস্থ্য ও পরিবেশের জন্য ক্ষতিকর হতে পারে বলে সতর্ক করছেন বিশেষজ্ঞরা। এমন বাস্তবতায় আবারও আলোচনায় এসেছে ইসলামে সুন্নাহ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত প্রাকৃতিক দাঁত পরিষ্কারের উপকরণ—মিসওয়াক। একজন মুসলমানের কাছে এটি শুধু দাঁত পরিষ্কারের মাধ্যম নয়; বরং পরিচ্ছন্নতা, ইবাদতের প্রস্তুতি এবং নবীজির সুন্নাহ অনুসরণের এক অনন্য নিদর্শন।

ইসলামে পরিচ্ছন্নতার মর্যাদা

ইসলাম পরিচ্ছন্নতা ও পবিত্রতাকে ইমানি জীবনের অপরিহার্য অংশ হিসেবে বিবেচনা করে। মহান আল্লাহ বলেন—

‘নিশ্চয়ই আল্লাহ তাওবাকারীদের ভালোবাসেন এবং ভালোবাসেন অধিক পবিত্রতা অর্জনকারীদের।’ (সুরা আল-বাকারা: আয়াত ২২২)

মুখ ও দাঁতের পরিচ্ছন্নতাও এই পবিত্রতারই একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। তাই রাসুলুল্লাহ (সা.) মিসওয়াক ব্যবহারে বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছেন এবং তার সাহাবিদেরও এতে উৎসাহিত করেছেন।

মিসওয়াক—প্রিয় নবী (সা.)-এর প্রিয় সুন্নাহ

হজরত আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘যদি আমার উম্মতের জন্য কষ্টকর না হতো, তবে আমি প্রত্যেক নামাজের সময় তাদের মিসওয়াক করার নির্দেশ দিতাম।’ (বুখারি ৮৮৭)

এই হাদিস থেকেই বোঝা যায়, মিসওয়াক কেবল দাঁত পরিষ্কারের উপায় নয়; এটি ইবাদতের প্রস্তুতি ও পরিচ্ছন্নতার এক গুরুত্বপূর্ণ সুন্নাহ।

আরেক হাদিসে তিনি বলেছেন,

‘মিসওয়াক মুখকে পবিত্র করে এবং রবের সন্তুষ্টি অর্জনের মাধ্যম।’ (ইবনে মাজাহ ২৮৯)

অর্থাৎ, মিসওয়াক ব্যবহার শুধু স্বাস্থ্যগত উপকারই নয়, বরং আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনেরও একটি আমল।

জীবনের শেষ মুহূর্তেও মিসওয়াকের প্রতি গুরুত্ব

রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর জীবনের অন্তিম সময়েও মিসওয়াকের গুরুত্ব কমেনি। হজরত আয়েশা (রা.) বর্ণনা করেন, শেষ অসুস্থতার সময় আবদুর রহমান ইবনে আবু বকর (রা.) একটি তাজা মিসওয়াক নিয়ে এলে নবীজি (সা.) সেটির দিকে তাকান। আয়েশা (রা.) তার ইচ্ছা বুঝে মিসওয়াকটি নরম করে হাতে তুলে দেন। তিনি বলেন, ‘তিনি এমন সুন্দরভাবে মিসওয়াক করলেন, এর আগে তাঁকে কখনো এভাবে দাঁত পরিষ্কার করতে দেখিনি।’ (বুখারি ৪৪৫১)

এ ঘটনা প্রমাণ করে, জীবনের শেষ মুহূর্তেও তিনি পরিচ্ছন্নতার এই সুন্নাহকে গুরুত্ব দিয়েছেন।

দৈনন্দিন জীবনে মিসওয়াকের চর্চা

রাসুলুল্লাহ (সা.) নিয়মিত মিসওয়াক ব্যবহার করতেন। হজরত হুজায়ফা (রা.) বলেন, ‘রাসুলুল্লাহ (সা.) রাতে তাহাজ্জুদের জন্য উঠলে প্রথমেই মিসওয়াক করতেন।’ (বুখারি ২৪৫)

আরেক বর্ণনায় এসেছে, তিনি ঘরে প্রবেশের সময়ও মিসওয়াক করতেন। (আবু দাউদ ৫১)

হজরত আবু মুসা আশআরি (রা.) বলেন, তিনি নবীজি (সা.)-কে এমনভাবে মিসওয়াক করতে দেখেছেন যে, তিনি মুখের ভেতর পর্যন্ত ভালোভাবে পরিষ্কার করতেন। (বুখারি ২৪৪)

এসব বর্ণনা প্রমাণ করে, মুখ ও দাঁতের পরিচ্ছন্নতা তার দৈনন্দিন জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ ছিল।

মিসওয়াক—পূর্ববর্তী নবীদেরও সুন্নাহ

মিসওয়াক শুধু রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর আমল নয়; এটি পূর্ববর্তী নবীদেরও সুন্নাহ।

হজরত আবু আইয়ুব আনসারি (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘চারটি বিষয় নবীদের সুন্নতের অন্তর্ভুক্ত— লজ্জাশীলতা, সুগন্ধি ব্যবহার, মিসওয়াক করা এবং বিবাহ।’ (তিরমিজি ১০৮০)

এ থেকেই বোঝা যায়, মিসওয়াকের ঐতিহ্য মানবজাতির বহু পুরোনো নববী শিক্ষার অংশ।

আধুনিক সময়ে মিসওয়াকের প্রাসঙ্গিকতা

বর্তমানে দাঁতের পরিচর্যায় টুথব্রাশ ও টুথপেস্টের ব্যবহার ব্যাপক। ইসলাম এগুলোর ব্যবহারকে নিষিদ্ধ করেনি। বরং পরিচ্ছন্নতা অর্জনের বৈধ সব উপায়ই গ্রহণযোগ্য।

তবে সাম্প্রতিক সময়ে কিছু টুথপেস্টে মাইক্রোপ্লাস্টিকের উপস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশের পর অনেকেই প্রাকৃতিক বিকল্পের দিকে আগ্রহী হচ্ছেন। সেই আলোচনায় মিসওয়াক আবারও গুরুত্ব পাচ্ছে। এটি প্রাকৃতিক, সহজলভ্য এবং শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে দাঁত ও মুখের পরিচ্ছন্নতায় ব্যবহৃত হয়ে আসছে।

তবে একটি বিষয় মনে রাখা জরুরি— সব টুথপেস্টে মাইক্রোপ্লাস্টিক থাকে, এমনটি নয়। বর্তমানে অনেক নির্মাতা প্রতিষ্ঠানও মাইক্রোপ্লাস্টিকমুক্ত পণ্য তৈরি করছে। তাই এ বিষয়ে নির্ভরযোগ্য তথ্য জেনে সচেতন সিদ্ধান্ত নেওয়াই উত্তম।

একজন মুসলমানের জন্য মিসওয়াকের বিশেষ মর্যাদা এখানেই যে, এটি ব্যবহার করলে একদিকে যেমন মুখ ও দাঁতের পরিচ্ছন্নতা বজায় থাকে, অন্যদিকে প্রিয় নবী (সা.)-এর একটি গুরুত্বপূর্ণ সুন্নাহও পালন করা হয়।

আরও পড়ুন : ২০২৬ সালে যে ৮ দক্ষতা আপনাকে সফলতা এনে দেবে

সময় বদলায়, প্রযুক্তি বদলায়, মানুষের জীবনযাত্রাও পরিবর্তিত হয়। কিন্তু পরিচ্ছন্নতা, স্বাস্থ্যসচেতনতা এবং আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের শিক্ষা কখনো পুরোনো হয় না। আধুনিক গবেষণা যখন প্রাকৃতিক বিকল্পের গুরুত্ব নতুন করে স্মরণ করিয়ে দিচ্ছে, তখন মুসলমানদের জন্য মিসওয়াক শুধু একটি কাঠি নয়; এটি সুন্নাহ, পরিচ্ছন্নতার প্রতীক এবং একটি বরকতময় জীবনধারার অংশ। আধুনিক উপকরণ ব্যবহার করা যেমন বৈধ, তেমনি সুযোগ থাকলে মিসওয়াকের এই মহান সুন্নাহকে জীবনে স্থান দেওয়া হতে পারে সুস্থতা, পরিচ্ছন্নতা ও সওয়াব অর্জনের এক সুন্দর সমন্বয়।

Scroll to Top