টক শো’তে মারামারি: বিশ্বে নজির, বাংলাদেশের চিত্র | চ্যানেল আই অনলাইন

টেলিভিশনের টক শো সাধারণত মতের ভিন্নতা, যুক্তি ও জনস্বার্থের বিষয় নিয়ে আলোচনার জায়গা। কিন্তু বিশ্বের বিভিন্ন দেশে সেই বিতর্ক কখনও কখনও গড়িয়েছে হাতাহাতি, ঘুষি, চড়-থাপ্পড় এমনকি স্টুডিও ভাঙচুরেও। পাকিস্তান, জর্ডান, লেবানন, ইউক্রেন, জর্জিয়া ও ভারতসহ বিভিন্ন দেশে এমন ঘটনা সংবাদ শিরোনাম হয়েছে। সেই তুলনায় বাংলাদেশে টেলিভিশন টক শোতে শারীরিক সংঘাতের ঘটনা খুবই বিরল। তবে ‘কখনও ঘটেনি’—এমন দাবিও সঠিক নয়।

পাকিস্তানে রাজনৈতিক টক শোতে হাতাহাতির একাধিক নজির রয়েছে। ২০১৮ সালে একটি টেলিভিশন অনুষ্ঠানে পিটিআই নেতা নাঈমুল হক ও পিএমএল-এন নেতা দানিয়াল আজিজের উত্তপ্ত বিতর্ক একপর্যায়ে চড় মারার ঘটনায় গড়ায়। ২০২৩ সালে আরেকটি টিভি অনুষ্ঠানে ইমরান খানের আইনজীবী শের আফজাল খান মারওয়াত ও পিএমএল-এন সিনেটর আফনান উল্লাহ খানের বিতর্কও চড়-ঘুষির লড়াইয়ে পরিণত হয়। স্টুডিও ক্রুদের হস্তক্ষেপে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আসে।

জর্ডানে ২০১৪ সালে সিরিয়া সংকট নিয়ে সরাসরি টেলিভিশন বিতর্কে দুই সাংবাদিকের হাতাহাতিতে স্টুডিওর টেবিল পর্যন্ত ভেঙে যায়। লেবাননেও রাজনৈতিক টক শোতে সংঘাতের নজির রয়েছে। ২০২২ সালে একটি অনুষ্ঠানে অতিথি ও দর্শকদের সংঘর্ষ স্টুডিওর বাইরে গড়ায় এবং গুলির শব্দ শোনা যায়। ইউক্রেনে ২০২২ সালে রাশিয়া-ইউক্রেন উত্তেজনা নিয়ে এক টেলিভিশন বিতর্কে সাংবাদিক ইউরি বুটুসভ ও রাজনীতিক নেস্টর শুফরিচ শারীরিক সংঘাতে জড়িয়ে পড়েন। ভারতেও নির্বাচনী বিতর্কে রাজনৈতিক নেতাদের মধ্যে ধাক্কাধাক্কি ও হামলার ঘটনা ঘটেছে।

বাংলাদেশের ক্ষেত্রে সবচেয়ে আলোচিত নজির ২০১৫ সালের মে মাসে একটি টেলিভিশনের টক-শোতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের অধ্যাপক ড. শহীদুজ্জামান এবং অবসরপ্রাপ্ত মেজর জেনারেল আবদুর রশিদের মধ্যে সরাসরি সম্প্রচারের সময় উত্তপ্ত বাকবিতণ্ডা হাতাহাতিতে গড়ায়।

গণমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, একপর্যায়ে আবদুর রশিদ অধ্যাপক শহীদুজ্জামানের হাত সরিয়ে দেন এবং শহীদুজ্জামান পাল্টা প্রতিক্রিয়া দেখান। পরিস্থিতি সামাল দিতে গিয়ে অনুষ্ঠানের উপস্থাপককে সরাসরি সম্প্রচারের মধ্যেই প্রোডাকশন টিমের দিকে যেতে দেখা যায়। ফলে বাংলাদেশের টক শোতে শারীরিক সংঘাতের কোনো নজির নেই—এ কথা বলা যাবে না; বরং বলা যায়, এমন ঘটনা ব্যতিক্রমী।

বাংলাদেশে বরং বেশি দৃশ্যমান ‘বাকযুদ্ধ’। টক শোতে রাজনৈতিক পক্ষগুলোর তীব্র মতবিরোধ, পরস্পরের বক্তব্যে বাধা দেওয়া, অভিযোগ-পাল্টা অভিযোগ এবং ব্যক্তিগত প্রসঙ্গ টেনে আনার প্রবণতা দর্শকদের কাছে পরিচিত। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এসব মুহূর্তের ক্লিপ ছড়িয়ে পড়ায় একটি দীর্ঘ আলোচনার সবচেয়ে উত্তপ্ত অংশটিই অনেক সময় জনমনে আলোচনার কেন্দ্রে চলে আসে। এতে যুক্তিনির্ভর আলোচনার বদলে কে কাকে বেশি আক্রমণ করতে পারলেন, সেটিই যেন গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।

তবে এর সুনির্দিষ্ট কোনো সরকারি পরিসংখ্যান নেই। একইভাবে বিশ্বের কোন দেশে টক শোতে মারামারি সবচেয়ে বেশি—এমন নির্ভরযোগ্য বৈশ্বিক র‌্যাঙ্কিংও নেই।

টক শোর এই উত্তেজনার পেছনে অনুষ্ঠান পরিচালনার ধরন ও দর্শক আকর্ষণের বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ। একাধিক অতিথিকে একই সময়ে কথা বলার সুযোগ দেওয়া, পর্যাপ্ত সময় না রাখা কিংবা ব্যক্তিগত আক্রমণের ক্ষেত্রে দ্রুত হস্তক্ষেপ না করলে পরিস্থিতি উত্তপ্ত হওয়ার সুযোগ তৈরি হয়। অন্যদিকে সঞ্চালক যদি নিয়ম মেনে প্রত্যেক পক্ষকে কথা বলার সুযোগ দেন এবং সীমা অতিক্রম করলে সতর্ক করেন, তাহলে বিতর্ক অনেক বেশি গঠনমূলক রাখা সম্ভব।

উত্তপ্ত বিতর্কের ছোট ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে; ফলে অনেক সময় পুরো আলোচনার চেয়ে কয়েক সেকেন্ডের সংঘাতই বেশি আলোচিত হয়। গবেষণাতেও টেলিভিশনে অসৌজন্যমূলক রাজনৈতিক বিতর্ক দর্শকের রাজনৈতিক আস্থায় নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে বলে ইঙ্গিত পাওয়া গেছে।

সব মিলিয়ে, শারীরিক সংঘাতের বিচারে বাংলাদেশ তুলনামূলকভাবে শান্ত। কিন্তু যুক্তির বদলে চিৎকার, ব্যক্তিগত আক্রমণ ও অসহিষ্ণুতা যদি বাড়তে থাকে, তাহলে টক শোর মূল উদ্দেশ্যই ক্ষতিগ্রস্ত হবে। তাই সঞ্চালকের দৃঢ় নিয়ন্ত্রণ, অতিথিদের শালীনতা এবং টেলিভিশনের সম্পাদকীয় নীতিই পারে বিতর্ককে ‘শো’ নয়, সত্যিকারের জনআলোচনার জায়গা হিসেবে ধরে রাখতে।

Scroll to Top