দুর্নীতি-অনিয়মের অভিযোগে জেরবার গণ-অভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকারের আলোচিত কৃষি যান্ত্রিকীকরণ প্রকল্পে এবার আউটসোর্সিংয়ের নামে ভুয়া নিয়োগ দিয়ে টাকা হাতানোর অভিযোগ উঠেছে। ভুক্তভোগী দাবি করেন, একাধিক ব্যক্তি প্রকল্প পরিচালক এবং কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের (ডিএই) মহাপরিচালকের কাছে অভিযোগ জানিয়েছেন। সম্প্রতি এ প্রকল্পের কার্যালয়ে হিসাবরক্ষকের কথিত ঘুষ লেনদেনের একটি ভিডিও বেশ সমালোচিত হয়েছে। এসব ঘটনায় উপপরিচালক পর্যায়ের একজন কর্মকর্তাকে তদন্ত করার নির্দেশ দিয়েছে অধিদপ্তর।
কৃষিকাজে আধুনিক যন্ত্রপাতির ব্যবহার বৃদ্ধির মাধ্যমে উৎপাদন বাড়ানোর লক্ষ্যে ৩ হাজার কোটি টাকার উচ্চাভিলাষী প্রকল্পটি শুরু থেকেই নানা সমস্যায় পড়েছে। এর আগে দুর্নীতি-অনিয়মে জড়িত থাকায় সাবেক প্রকল্প পরিচালকসহ (পিডি) আটজন কর্মকর্তাকে বহিষ্কার করা হয়েছে।
ভুয়া নিয়োগের সাম্প্রতিক অভিযোগ ওঠার পরিপ্রেক্ষিতে ১৭ অক্টোবর ডিএই কর্তৃপক্ষ এ বিষয়ে তদন্তের তাগিদ দিয়ে চিঠি দিয়েছে। এতে বলা হয়, অধিদপ্তরের আওতাধীন বিভিন্ন প্রকল্পে আউটসোর্সিং ও দৈনিক মজুরির ভিত্তিতে জনবল নিয়োগ দেওয়ার জন্য একাধিক ব্যক্তির কাছ থেকে ঘুষ গ্রহণের বিষয়ে কৃষি যান্ত্রিকীকরণ প্রকল্পের হিসাবরক্ষক মো. মাসুম রেজার বিরুদ্ধে অভিযোগ উত্থাপিত হয়েছে। এ অভিযোগের আলোকে তদন্ত করে প্রতিবেদন দেওয়ার জন্য তদন্ত কর্মকর্তা নিয়োগ করা হলো।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে ডিএইর উপপরিচালক মো. মুরাদুল হাসান বলেন, ‘১০ কর্মদিবসের মধ্যে তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেওয়ার জন্য বলেছি। আমরা চাই এ প্রকল্পের কার্যক্রমে স্বচ্ছতা আসুক।’
এর আগে ডিএইর মহাপরিচালক বরাবর একটি লিখিত অভিযোগ দেন সৌমিক আরাফাত নামে এক ভুক্তভোগী। অভিযোগে বলা হয়, কৃষি যান্ত্রিকীকরণ প্রকল্পের হিসাবরক্ষক মো. মাসুম রেজা ও এই প্রকল্পের পিডির গাড়িচালক শফিকুল ইসলামের
নেতৃত্বে একটি ‘শক্তিশালী সিন্ডিকেট’ তৈরি হয়েছে। সৌমিক আরাফাতকে আউটসোর্সিংয়ের মাধ্যমে অফিস সহায়ক নিয়োগ দেওয়ার জন্য মোট ২ লাখ ২০ হাজার টাকার চুক্তি হয়। সে অনুযায়ী গত ১৩ মে গাড়িচালক শফিকের স্ত্রী আকলিমা বেগমের সোনালী ব্যাংকের (২২১২৯……৯০৯) হিসাবে ১ লাখ টাকা পাঠান সৌমিক আরাফাত।
মাসুম রেজা কৃষি প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউট, গাইবান্ধায় কর্মরত ছিলেন। পিডি মঞ্জুর-উল-আলমের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা থাকায় ডেপুটেশনে তাঁকে এই প্রকল্পে আনা হয়েছে বলে অনেকের দাবি। অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে হিসাবরক্ষক মো. মাসুম রেজা বলেন, ‘পিডির কথায় নিয়োগের বিষয়ে তারা আমার কাছে আসছিল। যাদের কাছ থেকে টাকা নিয়েছি, ওই টাকা ফেরত দিয়েছি।’
খামারবাড়িতে টাকা ছাড়া কোনো নিয়োগ হয় না বলেও মন্তব্য করেন মাসুম রেজা।
পিডির গাড়িচালক শফিককে অর্থ দেওয়ার মাধ্যমে অফিস সহায়ক হিসেবে কাজ পাওয়ার দাবি করেছেন পটুয়াখালীর বাউফলের জহিরুল ইসলামও। জহিরুলের অভিযোগ, নিয়োগপত্র ছাড়াই ২০২৫ সালের ডিসেম্বর থেকে প্রকল্প কার্যালয়ে কর্মরত রয়েছেন তিনি। গত রোববার প্রকল্প কার্যালয়ে কথা বলার সময় জহিরুল বলেন, গাড়িচালক শফিক চাকরি দেওয়ার জন্য তাঁর কাছ থেকে ২ লাখ টাকা নেন। কিন্তু তিনি এ পর্যন্ত কোনো বেতন-ভাতা ও নিয়োগপত্র পাননি। পিডির কাছে একাধিকবার অভিযোগ করেও চাকরির জন্য দেওয়া ২ লাখ টাকা ফেরত পাননি।
স্থবির প্রকল্পেও নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি
আধুনিক যন্ত্র ব্যবহারের মাধ্যমে কৃষির উৎপাদনশীলতা বাড়ানোর উদ্দেশ্যে ‘সমন্বিত ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে কৃষি যান্ত্রিকীকরণ’ প্রকল্প হাতে নিয়েছিল বিগত সরকার। মেয়াদ ছিল ২০২০ সালের জুলাই থেকে ২০২৫ সালের জুন পর্যন্ত পাঁচ বছর। শেষ বছরে অনিয়ম-দুর্নীতিসহ নানা কারণে প্রকল্পে অগ্রগতি হয়নি। প্রকল্পের অবশিষ্ট ৪০০ কোটি টাকা মন্ত্রণালয়ে ফেরত পাঠানো হয়। ভাগ্য-বিড়ম্বিত এ প্রকল্পের মেয়াদ শেষ হওয়ার মাত্র চার মাস আগে নতুন প্রকল্প পরিচালক হিসেবে নিয়োগ পান মঞ্জুর-উল-আলম। কৃষি মন্ত্রণালয়ের এক সভায় শর্তসাপেক্ষে প্রকল্পের মেয়াদ আরেক বছর বাড়িয়ে অবশিষ্ট টাকা ব্যয়ের সুপারিশ করা হয়েছিল। কিন্তু গত বছরের শুরুর দিকে প্রকল্প কার্যালয়ে অস্থিরতাসহ বিভিন্ন কারণে পরে আর এর মেয়াদ বাড়ানো হয়নি। আবার কার্যক্রমও শেষ করা হয়নি। এই স্থবিরতার মধ্যেই ২০২৫ সালের ২৩ জুলাই নিয়ম ভেঙে দৈনিক যুগান্তর ও ডেইলি স্টার পত্রিকায় আউটসোর্সিংয়ে কর্মী নিয়োগের বিজ্ঞপ্তি দেন প্রকল্প পরিচালক। ৫ লাখ টাকা জামানত দিয়ে কর্মী নিয়োগের কাজ পায় আয়াত সিকিউরিটি সার্ভিস লিমিটেড নামে একটি কোম্পানি। কার্যক্রম বন্ধ থাকলেও আয়াত সিকিউরিটি সার্ভিস চলতি বছর একাধিকবার এই প্রকল্পে ৭৭ জন কর্মী নিয়োগের জন্য প্রচারণা চালায়। প্রচারে আকর্ষণীয় বেতন, বৈশাখী ভাতাসহ বছরে তিনটি উৎসব ভাতা দেওয়ার কথা বলা হয়। এ বিষয়ে বক্তব্য জানতে চাইলে আয়াত সিকিউরিটি সার্ভিসের ফেসবুকে দেওয়া নম্বরে যোগাযোগ করলে মো. উজ্জ্বল পরিচয় দেওয়া এক ব্যক্তি ফোন ধরেন। মার্কেটিংয়ের দায়িত্বে আছেন জানিয়ে উজ্জ্বল বলেন, ‘কোম্পানির মালিক লেলিন সাহেব এসব জানেন।’
প্রকল্প-সংশ্লিষ্ট এক কর্মকর্তা জানান, নির্ধারিত মেয়াদ ২০২৫ সালের জুনের পর এই প্রকল্প নিয়ে মন্ত্রণালয়ের কোনো প্রশাসনিক আদেশ হয়নি। সে কারণে লোক নিয়োগের জন্য কোনো কোম্পানিকে দায়িত্ব দেওয়া বা অর্থ লেনদেন করা সম্পূর্ণ অনৈতিক। এ বিষয়ে জানতে চাইলে প্রকল্প পরিচালক মঞ্জুর-উল-আলম বলেন, ‘নিয়োগপ্রক্রিয়া শেষ করতে অনেক সময় লাগে, তাই প্রকল্পের মেয়াদ বাড়ানোর আগেই আউটসোর্সিংয়ে লোক নিয়োগের জন্য পত্রিকায় আমরা দরপত্র আহ্বান করেছিলাম।’
পিডির কক্ষে তালা, বেতনহীন ১৬ মাস
সম্প্রতি কৃষি মন্ত্রণালয়ে আয়োজিত প্রকল্পের মূল্যায়ন সভায় মেয়াদ এক বছর বাড়ানোর বিষয়ে সুপারিশ করা হয়েছে। জানা গেছে, ১৬ মাস ধরে বেতন পাচ্ছেন না প্রকল্পটির ৭৭ কর্মকর্তা-কর্মচারী। ২০২৫ সালের জুলাই থেকে বেতন বন্ধ রয়েছে। ১৯ অক্টোবর রাজধানীর খামারবাড়ির কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরে প্রকল্পটির দপ্তরে গিয়ে দেখা যায়, কর্মীরা কর্মহীন বসে আছেন। খোঁজ নিয়ে জানা যায়, দুর্নীতির অভিযোগ থাকায় বিশেষ নিরীক্ষা চলছে। প্রকল্প পরিচালকের কক্ষ তালাবদ্ধ। প্রকল্প-সংশ্লিষ্ট কয়েকজন বলেছেন, পিডি মঞ্জুর-উল-আলমের চাকরি শেষ হয়েছে ২৩ আগস্ট। চাকরি শেষ হলেও তিনি তালা মেরে কক্ষ দখলে রেখেছিলেন। সম্প্রতি প্রকল্পের একজন ডিপিডির নেতৃত্বে সেই তালা ভেঙে কক্ষে নতুন তালা লাগানো হয়।
সাবেক পিডি হাল ছাড়েননি
জানা গেছে, প্রকল্পের মেয়াদ বাড়লে সদ্য সাবেক পিডি মঞ্জুর-উল-আলম এবার চুক্তিভিত্তিকভাবে পরিচালক হতে সরকারের বিভিন্ন পর্যায়ে তদবির চালিয়ে যাচ্ছেন। অন্যদিকে ডিপিডি মাজহারুল ইসলামও পিডি হতে কৃষক দলের এক শীর্ষ নেতার মাধ্যমে তদবির চালাচ্ছেন বলে আলোচনা রয়েছে।
কক্ষ দখলের অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে মঞ্জুর-উল-আলম বলেন, ‘আনুষ্ঠানিকভাবে বিদায় নিইনি। এখনো ওই কক্ষে আমার ফাইলপত্র আছে।’ সদ্য সাবেক পিডি আরও বলেন, ‘প্রকল্পের ডিপিপি সংশোধন করেছি। নতুন করে যাতে দুর্নীতি না হয়।…কিছু দুর্নীতিগ্রস্ত লোক দুর্নীতিতে অভিযুক্ত যন্ত্র সরবরাহকারী কোম্পানির টাকা খেয়ে প্রকল্পটি বন্ধের চেষ্টা চালাচ্ছে।’
আরও পড়ুন : ২০২৬ সালে যে ৮ দক্ষতা আপনাকে সফলতা এনে দেবে
সার্বিক বিষয়ে জানতে চাইলে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক আব্দুর রহিম বলেন, ‘কৃষি যান্ত্রিকীকরণ প্রকল্পটি নিয়ে অনেক দুর্নাম রয়েছে। প্রকল্পটির মেয়াদ বাড়ানোর বিষয়ে সিদ্ধান্ত এখনো চূড়ান্ত হয়নি। প্রকল্পের কার্যক্রমে অনিয়মের সুনির্দিষ্ট প্রমাণ পেলে আমরা ব্যবস্থা নেব। আগে যেসব কর্মকর্তা দুর্নীতিতে জড়িত ছিলেন, তাঁদের বিচার চলমান রয়েছে। স্বচ্ছতার বিষয়ে আমাদের অবস্থান কঠোর।’


