প্রায় তিন দশক পর আবারও এক বিরল মহাজাগতিক দৃশ্যের সাক্ষী হলো যুক্তরাজ্য ও ইউরোপের বিভিন্ন অঞ্চল। সূর্য ও চাঁদের বিরল অবস্থানের কারণে সৃষ্ট এই সূর্যগ্রহণ দেখতে লাখো মানুষ বিভিন্ন পর্যবেক্ষণস্থলে জড়ো হন। কোথাও আংশিক, আবার কোথাও পূর্ণ সূর্যগ্রহণের দৃশ্য দেখা যায়।
বিবিসি জানিয়েছে, যুক্তরাজ্যের বিভিন্ন অঞ্চলে স্থানীয় সময় সন্ধ্যার দিকে শুরু হয় আংশিক সূর্যগ্রহণ। সন্ধ্যা ৭টার কিছু পর এটি সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছায়। এসময় দেশটির বেশিরভাগ এলাকায় চাঁদ সূর্যের ৯০ শতাংশের বেশি অংশ ঢেকে দেয়। কর্নওয়ালে সূর্যের প্রায় ৯৫ শতাংশ ঢেকে যায়। ১৯৯৯ সালের পর যুক্তরাজ্যে এটিকে সবচেয়ে নাটকীয় সূর্যগ্রহণ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
উত্তর স্কটল্যান্ডে সন্ধ্যা ৬টার দিকে গ্রহণ শুরু হয়। ইংল্যান্ডের দক্ষিণ উপকূলে শুরু হয় সন্ধ্যা ৬টা ২০ মিনিটের কিছু আগে। মধ্য ও দক্ষিণ ইংল্যান্ড এবং ওয়েলসের বেশিরভাগ এলাকায় আকাশ পরিষ্কার থাকায় প্রায় এক ঘণ্টা ধরে ধীরে ধীরে সূর্যের ওপর চাঁদের অগ্রসর হওয়ার দৃশ্য উপভোগ করেন মানুষ।
তবে উত্তর ইংল্যান্ড, স্কটল্যান্ড ও উত্তর আয়ারল্যান্ডের কিছু এলাকায় মেঘাচ্ছন্ন আবহাওয়ার কারণে দৃশ্যটি স্পষ্টভাবে দেখা যায়নি। তারপরও দেশটির বিভিন্ন দর্শনীয় স্থানে মানুষের ভিড় ছিল চোখে পড়ার মতো। অন্যদিকে গ্রিনল্যান্ড, আইসল্যান্ড ও স্পেনের কিছু এলাকায় দেখা যায় পূর্ণ সূর্যগ্রহণ। চাঁদ পুরোপুরি সূর্যকে ঢেকে দেওয়ার সময় কয়েক মিনিটের জন্য দিনের আলো অনেকটা রাতের মতো অন্ধকারে পরিণত হয়।

পূর্ণগ্রহণের পথ শুরু হয় রাশিয়ার সাইবেরিয়ার উত্তরাঞ্চল থেকে। সেখান থেকে ছায়াটি আর্কটিক মহাসাগর পেরিয়ে আইসল্যান্ডে পৌঁছায়। এরপর দক্ষিণ দিকে অগ্রসর হয়ে স্পেনের কিছু অঞ্চলে পূর্ণ সূর্যগ্রহণ সৃষ্টি করে। সূর্যগ্রহণ নিরাপদে দেখার জন্য বিশেষ চশমার চাহিদাও ছিল ব্যাপক। বিভিন্ন দোকানে এসব চশমার সংকট দেখা দেয়।
পূর্ণগ্রহণের সময় চাঁদের আড়াল থেকে সূর্যের করোনা দেখা যায়। সূর্যের অত্যন্ত উত্তপ্ত গ্যাসের এই বহিঃস্তর মহাকাশে হাজার হাজার মাইল পর্যন্ত বিস্তৃত। সূর্যের চৌম্বকক্ষেত্র অনুসরণ করে থাকা ছোট ছোট গোলাপি গ্যাসের লুপ বা প্রমিনেন্সও অভিজ্ঞ পর্যবেক্ষকদের চোখে পড়তে পারে।
জ্যোতির্বিজ্ঞানের ভাষায়, চাঁদ যখন সূর্য ও পৃথিবীর মাঝখানে এসে সূর্যের আলো আংশিক বা পুরোপুরি আটকে দেয়, তখন সূর্যগ্রহণ ঘটে। এবার যুক্তরাজ্যে সূর্য, চাঁদ ও পৃথিবী পুরোপুরি একই সরলরেখায় না থাকায় সেখানে আংশিক গ্রহণ দেখা যায়। বিপরীতে স্পেনের কিছু এলাকায় তিনটি জ্যোতিষ্ক প্রায় সরলরেখায় অবস্থান করায় দেখা যায় পূর্ণগ্রহণ।
পৃথিবীর কোনো না কোনো প্রান্তে প্রায় প্রতি ১৮ মাসে একবার পূর্ণ সূর্যগ্রহণ ঘটলেও নির্দিষ্ট কোনো স্থান থেকে এমন দৃশ্য দেখা অত্যন্ত বিরল। কোনো একটি নির্দিষ্ট এলাকায় পূর্ণ সূর্যগ্রহণ দেখার সুযোগ গড়ে প্রায় ৪০০ বছরে একবার আসে। এবার স্পেনে পূর্ণগ্রহণের পথে থাকা মানুষ সেই বিরল অভিজ্ঞতার সাক্ষী হন। পূর্ণগ্রহণের স্থায়িত্ব ছিল দুই মিনিটেরও কম। সময়ের হিসাবে মুহূর্তটি খুবই সংক্ষিপ্ত হলেও প্রত্যক্ষদর্শীদের কাছে এটি হয়ে থাকবে আজীবন মনে রাখার মতো ঘটনা।
পূর্ণ সূর্যগ্রহণকে মহাজাগতিক এক বিস্ময়কর কাকতালীয় ঘটনাও বলা হয়। পৃথিবী থেকে সূর্যের দূরত্ব প্রায় ১৫ কোটি কিলোমিটার, যা চাঁদের দূরত্বের প্রায় ৪০০ গুণ। আবার চাঁদের ব্যাস সূর্যের ব্যাসের তুলনায় প্রায় ৪০০ গুণ ছোট। ফলে পৃথিবী থেকে আকাশে সূর্য ও চাঁদকে প্রায় একই আকারের বলে মনে হয় আর সেই কারণেই চাঁদ কখনো কখনও পুরো সূর্যকে ঢেকে দিতে পারে।


