আগামীর বাংলাদেশের রাজনীতিতে নারীদের পথ বড় কন্টকময় | চ্যানেল আই অনলাইন

বাংলাদেশের রাজনীতিতে বর্তমানে একটা নতুন ধারা বিশেষভাবে লক্ষ্যণীয়, তা হলো- নারীদের রাজনীতি করাকে পরিবার, সমাজ খুব একটা পজিটিভ ভাবে গ্রহন করে না। এর জন্য সিনিয়র নারী রাজনীতিবিদের দূর্নীতি সহ কলেজ বিশ্ববিদ্যালয়ের হলগুলোর নানাধরনের অপকর্ম মানুষকে আতংকিত করে।

তাছাড়া জুলাই অভ্যুত্থানের পর নানাভাবে নারীদের রাজনীতিকে যথাযথ মূল্যায়ন করা হচ্ছে না। বরং নারীদের রাজনীতি করাকে অনেকটাই বাঁকা দৃষ্টিতে দেখে সমাজ। ফলস্বরূপ এবারের নির্বাচনে নারী প্রার্থীদের যোগ্যতা থাকা সত্ত্বেও মনোনয়ন দেয়নি দলগুলো। দেশের প্রধান দলগুলো তাদের বক্তৃতায়, নারীদের অধিকার ও অবস্থান নিয়ে যতটা উদারতা দেখায় বাস্তবে ঠিক ততটা নয়। দেশের সকল আন্দোলন সংগ্রামের মিছিলে মিটিংয়ে নারীরা থাকে সম্মুখ সারিতে। যার প্রমান মিলে ভাষা আন্দোলন থেকে শুরু করে জুলাই আন্দোলন অবধি।

অথচ দেশের সংকটময় পরিস্থিতিতে নারীরা কখনো পিছিয়ে থাকে না। বরং সহযোদ্ধা হয়ে পুরুষদের সাথে আন্দোলন সংগ্রাম করে। কারন দেশটা সকলের। তবে দিন শেষে নারী বলে তাকে সমভাবে বিচার করে না রাজনৈতিক দলে আর জাতীয় সংসদ নির্বাচনে। এটা নতুন কোন ঘটনা নয় বলে এবারের ভোটেও অনেক যোগ্য নারী নেত্রী সরাসরি দেশের প্রধান দল বিএনপি থেকে নির্বাচন করতে পারেনি।

ছবি: সংগৃহীত।

এক্ষেত্রে জামায়াতে ইসলামকে সেভাবে ধরা না হলেও এনসিপি নতুন রাজনৈতিক দল হিসাবে নারীদের যেভাবে বঞ্চিত করেছে তা মেনে নেয়া যায় না। কারণ জুলাই আন্দোলনে ছেলেদের পাশে মেয়েরা যেভাবে দাঁড়িয়েছে তা ছিল অবিশ্বাস্য। কিন্তু সে মেয়েদের বেলায় এতটাই তাল বাহনা করেছে যা কাম্য ছিল না তরুনদের কাছে।

তবে নারীরা এখন আর পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠী নেই। তারা নিজেদের শিক্ষিত করে স্বাবলম্বী করার পাশাপাশি দেশের অর্থনীতিতে বেশ শক্তিশালী ভূমিকা রাখে। তথাপি তাদেরকে অবদমিত করার জন্য প্রতিনিয়ত চেষ্টা করে। কখনো ধর্মের দোহাই দিয়ে, কখনো নিরাপত্তার শিকল দিয়ে।

যে নারী নিজের মেধা প্রজ্ঞা দিয়ে সমাজে নিজের অবস্থান তৈরী করে, সেই সমাজেই স্বাধীনচেতা নারীকে কটাক্ষ করে নানাভাবে। নারীদের ক্ষেত্রে এমন সব ভাষার ব্যবহার করা হয় তা শুনে বিধাতার ধরনীও কেঁপে উঠে। আর সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে গুজব আর বুলিংয়ের স্বীকার হতে হয় কম বেশি সকলকে। এত বাধা বিপত্তির পেরিয়ে যখন নারীরা রাজনৈতিকভাবে সমাজের কথা বলতে চায়, সেখানে নিজের রাজনৈতিক দলই তাকে জায়গা দিতে চায় না নারী বলে।

বাংলাদেশের ছাত্র রাজনীতিতে নারী নেত্রীরা, রাজনৈতিক কর্মীরা সঠিকভাবে মূল্যায়ন পায় না বিশেষ করে শিক্ষা জীবনের পর। তাই কাঠখড় পুড়িয়ে জাতীয় সংসদের সংরক্ষিত আসনে স্থান পাওয়াটাইকে বিশাল প্রাপ্তি মনে করে। কেন একজন নারী জনগণের সরাসরি ভোটে নির্বাচন করতে পারে না, সে ব্যাখ্যাটা সকল দলের মোটামুটি একই রকম হয়।

বলা হয়ে থাকে, নির্বাচনকালীন প্রচারণায় যতটা সময়, কষ্ট, অর্থ ব্যয় করতে হয়, সেটা নারীদের পক্ষে করা সম্ভব হয় না। এখানে থাকে নিরাপত্তার খোড়া যুক্তি। সকল নারী রাজনীতিবিদ ব্যবসায়ী বা ছল চাতুরীতে সম্পদশালী হয় না। সাধারণত রাজনৈতিক নীতি ও বিশ্বাসকে পুঁজি করে তারা বেশির ভাগই রাজনীতিতে সময় দেয়।

অথচ বাংলাদেশের রাজনীতিতে নির্বাচন মানে টাকার খেলা। সত্যিকারের সাংবিধানিকভাবে নির্বাচন হলে নিরাপত্তার দোহাই ও অর্থের যোগান এ দুটি কারনের একটিও থাকার কথা নয় যোগ্য প্রার্থীর বেলায়। এ যুক্তিগুলো যে কতটা দূর্বল তা এবারের নির্বাচনে প্রমান করে দিয়েছেন রুমিন ফারহানা ভোটের মাঠে স্বতন্ত্র নির্বাচন করে।

ছবি: সংগৃহীত।

এছাড়া আরও লক্ষ্যনীয় মাননীয় প্রধানমন্ত্রী তারেক জিয়ার নির্বাচনের প্রচারণায় বিশেষ ভূমিকা রেখেছে তারেক জিয়ার স্ত্রী জোবাইদা রহমানসহ তার ভাইয়ের স্ত্রী শর্মিলা রহমান সিঁথি ও কন্যা জাইমা রহমান। এর পাশাপাশি দেখা গেছে এবারের নির্বাচনে স্বামীদের নির্বাচনের প্রচারণায় স্ত্রীরা রাতদিন জনগণের কাছে গিয়ে দৃষ্টি কেড়েছে মানুষের। তাহলে যে নারীদেরকে রাজনৈতিক কার্যক্রম পরিচালনায় কিংবা নির্বাচনের প্রচারণায় অংশ নেয়াকে অত্যাবশ্যক মনে করা হয়; সেই নারীকে সরাসরি নির্বাচনে যোগ্য না মনে করার কারন কি কেবলই অর্থনৈতিক অবস্থান আর নিরাপত্তাহীনতা?

বাংলাদেশের নির্বাচনে নির্বাচনী ব্যয় বাবদ যে বিধিনিষেধ দেয়া হয়, তা কেবলমাত্র কাগজে কলমে। নির্বাচন প্রার্থীরা তাদের পাল্লাভারী করে অর্থের মানদণ্ডে। সাধারণত রাজনৈতিক নীতি বিবেচনা করে মনোনয়ন দেয়া হয় না বলে সত্যিকারের রাজনৈতিক নেতা নেত্রীরা মূল্যায়িত হয় না। আর সে অংশে নারীদের সংখ্যা অনেক বেশি। ছাত্র রাজনীতি করা নারীরা হয়তো জীবনের ধারাবাহিকতায় সকলেই বিশাল বিত্তশালী হয়ে উঠতে পারে না কর্মজীবন ও সংসারের কারনে। সব কিছুকে সামলে রাজনীতিতে নিজেকে এগিয়ে নিতে বেশ কষ্ট করতে হয়। এ চিত্র সব কালের হলেও সময়ের পরিবর্তনে নারীদের অবস্থানের পার্থক্য হয়েছে। একজন নারী যখন রাজনীতি করার জন্য নিজেকে প্রস্তুত করে তখন তার প্রত্যাশা থাকে সংসদ সদস্য হয়ে জনগণের সেবা করা।

জুলাই আন্দোলনের পর রাজনৈতিক পট পরিবর্তন ঘটার সাথে সাথে নারীদের রাজনীতি করার সুযোগ যেখানে বৃদ্ধি পাবার সুযোগ ছিল তা কিন্তু হয়নি। এ আন্দোলনে নারীরা যেভাবে ছেলেদের সাথে সমতালে আন্দোলন করেছে, তা দেখে অনেক বিস্মিত হয়েছে। এদের  অবদমিত করার জন্য নানাভাবে হেনস্থা করার চেষ্টা করা হলেও তারা কিন্তু পিছু হটে নাই। বিশেষ করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মেয়েরা হলের তালা ভেঙে রাতের বেলায় রাস্তায় অবস্থান নিয়েছে অন্যায়ের প্রতিবাদ করতে। তখন  কিন্তু বলা হয়নি নারীদের রাস্তায় থাকা অনিরাপদ। এখানে বিশেষ ভাবে ইসলামপন্থী দলগুলোর অবস্থানটা বৈপরীত্য দেখিয়েছে আন্দোলন পরবর্তী নির্বাচনে। তাদের নির্বাচনী প্রচারণায় নারীরা সক্রিয় ভূমিকা রেখেছে। তথাপি তারা বলে তাদের নারী নেত্রী বা কর্মীরা এখনো প্রস্তুত হয়নি সরাসরি নির্বাচনে অংশগ্রহণ করার জন্য অথবা শরীয়তের বিধানের দোহাই দিয়ে বলা হয়, তারা মেনে নিয়েছে দলের নের্তৃত্বে নারী থাকবেনা। তাদের মত করেই বৈষম্য বিরোধী আন্দোলনের নারীদের সাইড লাইনে রেখে এনসিপি নামের রাজনৈতিক দল গঠনের মধ্য দিয়ে নির্বাচন করেছে জামায়াতে ইসলামীর শরিক হয়ে। যার ফলে এনসিপি নারীদেরকে সরাসরি নির্বাচনে রাখতে পারে নাই। যদিও জুলাই সনদ অনুসারে জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ৫ শতাংশ নারীদের অংশগ্রহণ থাকার কথা ছিল। তা কিন্তু কোন দলেই মেনে নেয়নি। বরং নানা ধরনের তালবাহানা দেখিয়েছে।

ছবি: সংগৃহীত।

বর্তমান সরকারের রাজনৈতিক দলে নারী নেতা কর্মীদের সংগ্রামের ইতিহাস পুরুষদের তুলনায় কিন্তু কম নয়। বিগত ১৬ বছরে তাদের উপর মামলা হামলা কম হয়নি। কিন্তু দলের বেশ কিছু ত্যাগী নেত্রীদের মূল্যায়ন এখন অবধি হয়নি। বরং বিগত সময়ের বেশ কিছু সাবেক নারী সাংসদকে আবার নির্বাচিত করেছে সাত্ত্বনা পুরুস্কার স্বরূপ। দেশের সংসদ নির্বাচনে যেহেতু নারীদের সরাসরি অংশগ্রহণকে বাধাগ্রস্ত করা হয়, সেক্ষেত্রে নারীদের সংরক্ষিত আসনে ইলেকশনের সিলেকশন খুবই হাস্যকর মনে হয় এখনকার সময়ে।

সারা দুনিয়াতে বলা হয় নারীরা এখন আর পিছিয়ে নেই। কিন্তু আমেরিকার রাজনীতিতে একটা অপ্রচলিত ধারণা রয়েছে। আমেরিকাবাসী মনে করে, একজন নারী তাদের দেশের রাষ্ট্রপতি হয়ে দেশ পরিচালনা করতে পারবে না। অথচ এ দেশের নারীরা কর্মক্ষেত্রে অনবদ্য ভূমিকা পালন করছে। তারা মনে করে পরিবার, সমাজ তথা দেশের সামগ্রিক উন্নয়নে নারী পুরুষের সম অংশগ্রহণ থাকতে হবে। তা না হলে উন্নয়ন ব্যাহত হবে। তবে রাষ্ট্রপতি হিসাবে তারা পুরুষকেই প্রাধান্য দেয়। বিগত নির্বাচনে খোদ নারীরাই কামলা হ্যারিসকে মানতে পারেনি। কিন্তু বাংলাদেশের চিত্র তা নয়। তার প্রমান বেগম খালেদা জিয়া ও শখ হাসিনা। যদিওবা পারিবারিক সূত্রে রাজনীতিতে এসেছে এ  দুই নারী বেগম খালেদা জিয়া ও শেখ হাসিনা। কিন্তু সরকার প্রধান হিসেবে দেশের মানুষ তাদেরকে ভোট দিয়ে নির্বাচন করেছিল। শাসন ব্যবস্থায় কার ভূমিকা কি ছিল সে হিসাব ভিন্ন। এখানে লক্ষ্যনীয় ছিল, তারা কিন্তু তাদের শাসন আমলে নারীদের সরাসরি নির্বাচনে অংশগ্রহণ করাকে প্রতিষ্ঠিত করতে পারেনি বলে নারীদের আসন এখন অবধি সংরক্ষিত আসন হিসাবেই রয়েছে।

এক সময় এ সংরক্ষিত আসনকে উপহাস করে বলা হত, ‘ ৩০ সেট অলংকার। ‘ যদিও এখন আসন হয়েছে ৫০টি। এ সাংসদের স্বতন্ত্রভাবে কাজ করার মত তেমন কিছু নেই। একজন নারী সাংসদ নিজের এলাকার বাইরে গিয়ে যখন অন্য আসনের সাংসদের সাথে প্রতিনিধিত্ব করে তা কেবল পোষাকি পদবী ছাড়া আর কিছু না। কারন সেখানকার জনগণের সাথে তার কোন সম্পৃক্ততা থাকে না। তাই সংসদ যে নারী পুরুষের বৈষম্য তা চোখে আংগুল দিয়ে বলে দেয়, নারী আর পুরুষ সম পর্যায়ে নেই। মিছিলের সামনে থাকে নারীরা কেবল আন্দোলনের ঢাল হয়ে যুগের পর যুগ।

সংসদের বিরোধী দল জামায়েত ইসলামের নারীরা নিজেদেরকে কখনো দলের প্রধান হিসেবে দেখবে না এটা মেনে নিয়েছে শরীয়ত বিধান মনে করে। আবার এ দলের মহিলা বিভাগ ও ইসলামী ছাত্রী সংস্থা দলের প্রচার প্রচারণা কিন্তু পিছিয়ে নেই পুরুষের তুলনায়। তবে এ বিষয়ে জুলাই আন্দোলনের নারীদের বিষয় নানা আলোচনার পর জামায়াতে ইসলাম তাদের নারীদের সুযোগ করে দিয়েছে গন মাধ্যমে কথা বলার জন্য। এটা তারা করতে বাধ্য হয়েছে রাজনৈতিক চালের কারনে।

বৈষম্য বিরোধী আন্দোলনের মধ্য দিয়ে জন্ম নেয়া নতুন রাজনৈতিক দল নতুন বন্দোবস্তোর কথার নামে নারীদের নিয়ে চিন্তা চেতনার জায়গাতে পুরনো ধাঁচকেই অনুসরণ করছে। তাদের সাথে আন্দোলনে থাকা নারীরা হারিয়ে যাচ্ছে ক্রমশ। এ ক্ষেত্রে অনেক বলে থাকে, এরা আসলে জামায়াতে ইসলামের বি-টিম। তাই এদের দলে নারীদের মূল্যায়ন হবে না। এর পাশাপাশি বিগত সরকারের আমল থেকে শুরু করে এখন  অবধি  সামজিকমাধ্যম সহ রাস্তা ঘাটে নানা ভাবে নারীদের বুলিং বা হেনস্তা করা এতটাই প্রকট যে, এটা দেখে পরিবার চায় না নারীরা সমাজের প্রতিবাদের কন্ঠস্বর হোক। নিরাপত্তাহীনতার কাছে অসহায় হয়ে, নারীরা কখনো হয়ে যায় বাকরুদ্ধ কিংবা নিজেকে নিয়ে যায় লোকচক্ষুর অন্তরালে।

কন্যা জায়া জননী এ রূপের বাইরে একজন নারী সবার আগে একজন মানুষ। তার যেমন অধিকার আছে লড়াই করার ঠিক একইভাবে সে রাজনীতিতে ভোটের মাঠে জনগণের জন্য একজন সাধারণ সাংসদ হয়ে কথা বলতে পারে, তা প্রমান করার সুযোগ দিতে হবে দেশ ও সংবিধানকে। তবে এ বিষয়টা প্রতিষ্ঠা করতে হলে সংরক্ষিত আসনের এক সেট অলংকার হবার মনোবাসনাকে পরিত্যাগ করে রাজনৈতিক দলের নারী নেত্রী ও কর্মীদের সুসংগঠিত হয়ে কাজ করতে হবে। তা না হলে ক্রমশ নারীদের রাজনীতির পথ আরো বন্ধুর হয়ে যাবে। আর কাল গর্ভে হারিয়ে যাবে অনেক ত্যাগী সংগ্রামী রাজনৈতিক নারী নেত্রী ও কর্মীরা। যা প্রকৃতপক্ষে কোন সংগ্রামী নারী নেত্রী বা দলের জন্য কাম্য নয়। নারী তার রাজনৈতিক বিশ্বাস ও কর্ম দিয়ে জনগণের আস্থা অর্জন করতে পারে কিনা সেটা প্রমান করা সুযোগ দিয়ে সংসদের শো পিস আইটেম বানানোর ভাবনা দূর করতে হবে নারীদেরকেই। না হলে আগামীর পথ হবে কন্টকময়।

(এই বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আইএর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে)

Scroll to Top