২০০১ সালের ১১ সেপ্টেম্বর যুক্তরাষ্ট্রে ভয়াবহ হামলার ২৫ বছর পূর্তি উপলক্ষে প্রতিবেদন তৈরির সময় সন্ত্রাস বা সন্ত্রাসী হামলা শব্দ ব্যবহার না করতে সাংবাদিকদের নির্দেশ দিয়েছে কানাডার সরকারি সম্প্রচারমাধ্যম সিবিসি। ওই হামলায় প্রায় ৩ হাজার মানুষ নিহত হন, যাদের মধ্যে ২৬ জন ছিলেন কানাডার নাগরিক।
সিবিসির জনসংযোগবিষয়ক পরিচালক কেরি কেলি বৃহস্পতিবার বলেন, সন্ত্রাসী ও সন্ত্রাসবাদ শব্দ ব্যবহারের ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠানটি অত্যন্ত সতর্কতা অবলম্বন করে। সাধারণত কোনো সূত্র বা সাক্ষাৎকারদাতা এসব শব্দ ব্যবহার করলে তার বক্তব্যের সূত্র ধরে শব্দগুলো প্রতিবেদনে ব্যবহার করা হয়।
সম্প্রতি টরন্টো সান-এর এক কলাম লেখক দাবি করেন, সিবিসির সাংবাদিকদের একটি মেমো পাঠিয়ে বলা হয়েছে, ১১ সেপ্টেম্বরের হামলাকে সন্ত্রাসী হামলা হিসেবে উল্লেখ করবেন না। এরপর বিষয়টি নিয়ে ব্যাপক সমালোচনা শুরু হয়।
নিউইয়র্ক সিটি কাউন্সিলের সদস্য ভিকি পালাদিনো সিবিসির বিরুদ্ধে হামলার নিহতদের এবং তাদের পরিবারের প্রতি অবজ্ঞা দেখানোর অভিযোগ করেন। তার দাবি, ২৫ বছর আগে ঘটে যাওয়া ঘটনার গুরুত্ব কমিয়ে দেখাতে এমন ভাষা ব্যবহার করা হচ্ছে।
২০০১ সালের ১১ সেপ্টেম্বর চারটি যাত্রীবাহী বিমান ছিনতাই করা হয়। এর মধ্যে দুটি নিউইয়র্কের ওয়ার্ল্ড ট্রেড সেন্টারের টুইন টাওয়ারে আঘাত হানে। একটি পেন্টাগনে বিধ্বস্ত হয় এবং অপরটি পেনসিলভানিয়ার শ্যাঙ্কসভিলে একটি মাঠে বিধ্বস্ত হয়।
পালাদিনো বলেন, সিবিসির এই নির্দেশনা অত্যন্ত আপত্তিকর ও অপমানজনক। এটি একটি সতর্কবার্তাও যে, জনআস্থার প্রতিষ্ঠানগুলো যখন বামপন্থী ও বিদেশি স্বার্থের প্রভাবে পরিচালিত হয় তখন কী ধরনের পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে।
তিনি আরও বলেন, এটি শুধু ৯/১১-তে নিহতদের স্মৃতির প্রতি নির্মম অবজ্ঞা নয়, বরং সেদিন কী ঘটেছিল সেই মৌলিক সত্যকে দুর্বল করার একটি পরিকল্পিত প্রচেষ্টা।
সিবিসির মেমোতে কী বলা হয়েছে?
সিবিসির মেমোতে ৯/১১-এর ঘটনাকে বর্ণনা করতে সন্ত্রাসী হামলা শব্দের পরিবর্তে বলা হয়েছে, ছিনতাইয়ের ফলে যাত্রীবাহী বিমান বিধ্বস্ত হয়।
সমালোচকদের প্রশ্ন, চারটি বিমান ছিনতাই করে ইচ্ছাকৃতভাবে মানুষে ভরা ভবনে আঘাত হানার মতো ঘটনাকে শুধু বিমান বিধ্বস্ত হওয়া হিসেবে বর্ণনা করলে হামলাকারীদের উদ্দেশ্য ও ঘটনার ভয়াবহতা যথাযথভাবে তুলে ধরা হয় কি না।
তবে এ ধরনের নীতিমালা শুধু সিবিসির নয়। যুক্তরাষ্ট্রের অ্যাসোসিয়েটেড প্রেস (এপি), যারা নিজেদের পাশাপাশি বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের সাংবাদিক ও সম্পাদকের জন্য অ্যাসোসিয়েটেড প্রেস স্টাইলবুক-এর মাধ্যমে সম্পাদকীয় নির্দেশনা দেয়, তারাও সন্ত্রাসবাদ ও সন্ত্রাসী শব্দ ব্যবহারে সতর্ক থাকার পরামর্শ দেয়।
এপির মতে, সন্ত্রাসবাদ হলো ভয় সৃষ্টি করার জন্য বিশেষ করে বেসামরিক মানুষের বিরুদ্ধে পরিকল্পিতভাবে সহিংসতা। তবে সন্ত্রাসবাদ ও সন্ত্রাসী শব্দ এড়িয়ে যাওয়ার পরামর্শ দিয়ে এপি বলেছে, এসব শব্দ রাজনৈতিকভাবে বিতর্কিত হয়ে উঠেছে এবং অনেক ক্ষেত্রে অসামঞ্জস্যপূর্ণভাবে ব্যবহৃত হয়। তাই কী ঘটেছে তা বিস্তারিতভাবে তুলে ধরা বেশি নির্ভুল এবং পাঠকদের জন্য বেশি কার্যকর।
হামাসের হামলার পরও একই নীতি ব্যাখ্যা করেছিল সিবিসি
সন্ত্রাসী শব্দ ব্যবহারে সিবিসির এই নীতি নতুন নয়। ২০২৩ সালে ইসরায়েলে হামাসের হামলার পরও প্রতিষ্ঠানটি একই অবস্থান ব্যাখ্যা করেছিল।
সিবিসি তখন বলেছিল, কোনো গোষ্ঠীকে সন্ত্রাসী হিসেবে চিহ্নিত করার ক্ষেত্রে শব্দটির সূত্র উল্লেখ করা তাদের কয়েক দশকের নীতি। বিবিসি, এপি, এএফপি ও রয়টার্সসহ আরও অনেক সংবাদমাধ্যমও একই ধরনের নীতি অনুসরণ করে।
সিবিসির ভাষ্য অনুযায়ী, এ ধরনের ঘটনায় তাদের মূল লক্ষ্য হলো নির্ভুলতা, স্পষ্টতা ও বিস্তারিত তথ্যের মাধ্যমে নৃশংসতার ঘটনা তুলে ধরা, সহিংসতার ব্যাপ্তি ও মাত্রা জানানো এবং ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তি, কর্মকর্তা ও বিশেষজ্ঞদের বক্তব্য প্রকাশ করা। তবে কোনো নির্দিষ্ট গোষ্ঠীকে নিজেরা সন্ত্রাসী বা কোনো কর্মকাণ্ডকে নিজেরা সন্ত্রাসবাদ হিসেবে আখ্যা দেয় না সিবিসি। কারণ এসব শব্দের সঙ্গে রাজনীতি, আবেগ ও বিভিন্ন ধরনের অর্থ জড়িয়ে থাকায় তা সাংবাদিকতার পথে বাধা তৈরি করতে পারে।
তবে সমালোচকদের মতে, ৯/১১-এর মতো ঘটনার ক্ষেত্রে শুধু বিমান বিধ্বস্ত বা বিমান ছিনতাই শব্দ ব্যবহার করলে ঘটনার প্রকৃত উদ্দেশ্য ও ভয়াবহতা পুরোপুরি প্রকাশ পায় না।
৯/১১-এর স্মৃতিসৌধে নিহতদের স্বজনদের উপস্থিতিতে দাঁড়িয়ে ওই দিনের ঘটনা শুধু বিমান বিধ্বস্ত হওয়ার ঘটনা হিসেবে বর্ণনা করা কতটা যথাযথ হবে, তা নিয়েই মূল বিতর্ক তৈরি হয়েছে।