ইরানের আরোপিত অবরোধের কারণে আরব উপসাগরে অন্তত ২ হাজার ১৯০টি বাণিজ্যিক জাহাজ আটকা পড়েছে। বুধবার (১ এপ্রিল) প্রকাশিত সামুদ্রিক তথ্য অনুযায়ী, এসব জাহাজের মধ্যে ৩২০টিরও বেশি তেল ও গ্যাসবাহী ট্যাংকার রয়েছে। গুরুত্বপূর্ণ এই নৌপথে সীমিত ও কঠোর নিয়ন্ত্রিতভাবে কিছু জাহাজ চলাচল করছে।
সংবাদমাধ্যম আরব নিউজ এক প্রতিবেদনে এই তথ্য জানিয়েছে।
আটকে পড়া জাহাজগুলোর মধ্যে রয়েছে ১২টি ভেরি লার্জ গ্যাস ক্যারিয়ার (ভিএলজিসি) এবং ৫০টি ভেরি লার্জ ক্রুড ক্যারিয়ার (ভিএলসিসি)। সামুদ্রিক গোয়েন্দা প্রতিষ্ঠান ‘কেপলার’-এর তথ্য অনুযায়ী, মঙ্গলবার (৩১ মার্চ) থেকে বুধবারের (১ এপ্রিল) মধ্যে মাত্র ছয়টি জাহাজ প্রণালিটি অতিক্রম করেছে, যেখানে স্বাভাবিক সময়ে প্রতিদিন প্রায় ১২০টি জাহাজ চলাচল করে।
যেসব জাহাজ প্রণালি পার হতে পেরেছে, সেগুলোকে ইরানের উপকূলের কাছে লারাক দ্বীপসংলগ্ন একটি নির্ধারিত করিডোর দিয়ে যেতে হয়েছে। লয়েডস লিস্টের হিসাব অনুযায়ী, গত সপ্তাহ থেকে অন্তত ৪৮টি জাহাজ এই পথ ব্যবহার করেছে, যাদের অধিকাংশই ইরান বা তেহরানের ঘনিষ্ঠ দেশগুলোর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট।
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলার পর থেকেই হরমুজ প্রণালিতে কড়াকড়ি আরোপ করে ইরান। বিশ্বে সরবরাহ হওয়া তেল ও গ্যাসের প্রায় ২০ শতাংশ এই প্রণালি দিয়ে পরিবাহিত হয়। অনুমতি পাওয়া জাহাজগুলোকে সর্বোচ্চ ২০ লাখ ডলার পর্যন্ত ফি দিতে হচ্ছে, যা ‘তেহরান টোল বুথ’ নামে পরিচিত। তবে মালয়েশিয়াসহ বন্ধুত্বপূর্ণ দেশগুলোর জাহাজের ক্ষেত্রে এই ফি মওকুফ করা হতে পারে বলে ইঙ্গিত দিয়েছে তেহরান।
মালয়েশিয়ার কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, পেট্রোনাস, সাপুরা এনার্জি ও এমআইএসসি’র মতো প্রতিষ্ঠানের মালিকানাধীন বেশ কয়েকটি ট্যাংকার প্রণালি পার হওয়ার অনুমতির অপেক্ষায় রয়েছে। তেহরান কুয়ালালামপুরকে আশ্বস্ত করেছে, দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের কারণে তাদের জাহাজে কোনো টোল আরোপ করা হবে না। তবে বিপুল সংখ্যক জাহাজ নোঙর করে অপেক্ষা করায় যাতায়াতে বিলম্ব হতে পারে বলে সতর্ক করেছেন কর্মকর্তারা।
চীন জানিয়েছে, সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর সঙ্গে সমন্বয়ের মাধ্যমে তাদের অন্তত তিনটি জাহাজ সম্প্রতি প্রণালি অতিক্রম করেছে। জাহাজ ট্র্যাকিং তথ্য অনুযায়ী, দুটি কনটেইনার জাহাজ দ্বিতীয় চেষ্টায় উপসাগর ত্যাগ করেছে এবং উচ্চ গতিতে কাছাকাছি অবস্থানে চলাচল করেছে। বিশ্লেষকদের মতে, সংঘাত শুরুর পর এগুলোই প্রথম অ-ইরানি কনটেইনার জাহাজ, যা উপসাগর ছাড়তে সক্ষম হয়েছে।
এ ছাড়া, সৌদি আরবের অপরিশোধিত তেলবাহী একটি গ্রিক পরিচালিত ট্যাংকার ভারতগামী হয়ে প্রণালি পার হয়েছে এবং ভারতীয় পতাকাবাহী কয়েকটি এলপিজি জাহাজও গুরুত্বপূর্ণ সরবরাহ নিয়ে বেরিয়ে যেতে পেরেছে। ঝুঁকি এড়াতে কিছু জাহাজ রাতের বেলা চলাচল বা ট্র্যাকিং ট্রান্সপন্ডার বন্ধ রাখার মতো কৌশলও নিয়েছে বলে জানিয়েছে শিপিং সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো।
তবে এসব সীমিত চলাচল সত্ত্বেও সৌদি আরব ও কাতারের মতো প্রধান উৎপাদক দেশগুলোর জ্বালানি রপ্তানি কার্যত বন্ধ রয়েছে। বর্তমানে উপসাগর এলাকায় শত শত জাহাজ এবং প্রায় ২০ হাজার নাবিক আটকা পড়ে আছেন।
বুধবার পাকিস্তানের একটি তেলবাহী জাহাজ প্রণালি অতিক্রম করে করাচি বন্দরে পৌঁছেছে। বিকল্প পথে আরেকটি জাহাজও বন্দরে এসেছে। আগামী সপ্তাহগুলোতে আরও কিছু চালান পৌঁছানোর আশা করছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।
এই সংকট মোকাবিলায় আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক তৎপরতা জোরদার হয়েছে। যুক্তরাজ্য প্রায় ৩৫টি দেশের সঙ্গে বৈঠক আয়োজনের প্রস্তুতি নিচ্ছে, যাতে নৌ চলাচল স্বাভাবিক করার উপায় খোঁজা যায়। চীন ও পাকিস্তান যৌথভাবে তাৎক্ষণিক যুদ্ধবিরতির আহ্বান জানিয়েছে এবং বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচলের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছে।
এদিকে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বুধবার আবারও তেহরানকে অবরোধ প্রত্যাহারের আহ্বান জানিয়েছেন। অন্যথায় কঠোর সামরিক পদক্ষেপ নেওয়া হতে পারে বলেও সতর্ক করেছেন তিনি।





